খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিওপেন এআইঅস্বাভাবিক কিছু ঘটলেই জেগে উঠবে এআই চিপ, ১০ হাজার গুণ কম গণনায়...

অস্বাভাবিক কিছু ঘটলেই জেগে উঠবে এআই চিপ, ১০ হাজার গুণ কম গণনায় নজির

চারপাশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে চিপটি তুলনামূলকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকে। কিন্তু তথ্যের মধ্যে হঠাৎ কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে সেটি দ্রুত সক্রিয় হয়ে ওঠে। অর্থাৎ চিপটির মূল লক্ষ্য হলো প্রতিটি মুহূর্তের তথ্য বিশ্লেষণ করা নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন বা অস্বাভাবিক ঘটনাকে দ্রুত শনাক্ত করা।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে আমরা সাধারণত এমন প্রযুক্তি হিসেবেই চিনি, যা নিরন্তর তথ্য বিশ্লেষণ করে, নতুন তথ্য থেকে সিদ্ধান্ত নেয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া জানায়। কিন্তু ভবিষ্যতের এআই হয়তো সব সময় সক্রিয় থাকবে না। বরং চারপাশে সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে সেটি অনেকটা নীরব অবস্থায় থাকবে। আর কোনো অস্বাভাবিকতা বা বিপদের সংকেত পেলেই মুহূর্তের মধ্যে সক্রিয় হয়ে উঠবে।

গবেষকেরা এমনই একটি নতুন ধরনের নিউরোমরফিক এআই চিপ তৈরি করেছেন। মানুষের মস্তিষ্ক কীভাবে প্রয়োজনীয় সংকেতকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায়, সেই ধারণা থেকেই প্রযুক্তিটির নকশা তৈরি করা হয়েছে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, চিপটি সব তথ্য সমানভাবে বিশ্লেষণ করে না। বরং পরিচিত ও স্বাভাবিক পরিস্থিতিকে পাশ কাটিয়ে অপ্রত্যাশিত পরিবর্তনের দিকে বেশি নজর দেয়।

মানুষের মস্তিষ্ক প্রতি মুহূর্তে চারপাশ থেকে অসংখ্য তথ্য গ্রহণ করে। চোখ, কান, ত্বকসহ বিভিন্ন ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সংকেত মস্তিষ্কে পৌঁছায়। কিন্তু মস্তিষ্ক প্রতিটি সংকেতকে একই গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করে না।

ধরুন, আপনি প্রতিদিন একই রাস্তায় হাঁটছেন। চারপাশের পরিচিত দৃশ্য আপনার কাছে স্বাভাবিক। হঠাৎ রাস্তার পাশে কোনো অস্বাভাবিক শব্দ হলো বা সামনে কোনো বস্তু দ্রুত আপনার দিকে এগিয়ে এল। তখন মস্তিষ্ক মুহূর্তের মধ্যে সেই পরিবর্তনকে গুরুত্ব দেয় এবং শরীরকে প্রতিক্রিয়ার জন্য প্রস্তুত করে।

নতুন নিউরোমরফিক চিপের কাজের পদ্ধতিতেও রয়েছে এমন ধারণা। মানুষের চলাফেরা, ভারসাম্য এবং সমন্বয়ের মতো কাজ নিয়ন্ত্রণকারী মস্তিষ্কের কার্যপ্রক্রিয়া থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে গবেষকেরা চিপটির নকশা করেছেন।

প্রচলিত অনেক এআই ব্যবস্থা নতুন নতুন তথ্য পেলেই সেগুলো বিশ্লেষণ করতে থাকে। এতে বিপুল পরিমাণ গণনা প্রয়োজন হয়। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও কম্পিউটিং শক্তি ব্যবহার করতে হয়। ফলে শক্তি খরচ বাড়ে এবং ছোট আকারের ডিভাইসে দীর্ঘ সময় এ ধরনের এআই চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।

আরও পড়ুন :  ইরানের আবিস্কার বিশ্ব প্রযুক্তিতে এক বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে

নতুন চিপটি এই জায়গাতেই ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করে।

চারপাশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে চিপটি তুলনামূলকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকে। কিন্তু তথ্যের মধ্যে হঠাৎ কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে সেটি দ্রুত সক্রিয় হয়ে ওঠে। অর্থাৎ চিপটির মূল লক্ষ্য হলো প্রতিটি মুহূর্তের তথ্য বিশ্লেষণ করা নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন বা অস্বাভাবিক ঘটনাকে দ্রুত শনাক্ত করা।

এ ধরনের পদ্ধতিকে এআই প্রযুক্তিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ ভবিষ্যতের অনেক ডিভাইসে সব সময় পূর্ণমাত্রায় গণনা চালানোর প্রয়োজন নাও থাকতে পারে।

নতুন এই নিউরোমরফিক চিপের কার্যকারিতা যাচাই করতে গবেষকেরা ইসিজি বা হৃদ্‌যন্ত্রের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপের সিমুলেশন ব্যবহার করেছেন। হৃদ্‌স্পন্দনের স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক ধরন আলাদা করতে চিপটি কতটা দ্রুত কাজ করতে পারে, সেটিই ছিল পরীক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

পরীক্ষার ফল গবেষকদের আশাবাদী করেছে। চিপটি একটি অনিয়মিত হৃদ্‌স্পন্দন শনাক্ত করতে পেরেছে একটি হৃদ্‌স্পন্দনের সময়ের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের মধ্যেই। গবেষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শনাক্তকরণের নির্ভুলতা ছিল প্রায় ৯৮ শতাংশ।

তবে শুধু দ্রুততা বা নির্ভুলতাই এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য নয়। একই কাজ করতে প্রচলিত এআই পদ্ধতির তুলনায় চিপটির প্রায় ১০ হাজার গুণ কম গণনার প্রয়োজন হয়েছে বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন।

অর্থাৎ একই ধরনের সমস্যা শনাক্ত করতে যেখানে প্রচলিত এআইকে বিপুল পরিমাণ গণনা করতে হয়, সেখানে নতুন প্রযুক্তি তুলনামূলকভাবে অনেক কম কম্পিউটিং শক্তি ব্যবহার করতে পারে।

এই প্রযুক্তির সম্ভাব্য ব্যবহার শুধু গবেষণাগার বা পরীক্ষামূলক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। বিশেষ করে স্বাস্থ্য প্রযুক্তিতে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকতে পারে।

বর্তমানে বিভিন্ন পরিধানযোগ্য স্বাস্থ্য ডিভাইস মানুষের হৃদ্‌স্পন্দন, শারীরিক কার্যকলাপসহ নানা ধরনের তথ্য সংগ্রহ করে। এসব ডিভাইসকে দীর্ঘ সময় চালু রাখতে হলে ব্যাটারি শক্তির ওপর চাপ পড়ে।

নতুন ধরনের এআই চিপ সেখানে ভিন্ন সমাধান দিতে পারে। স্বাভাবিক হৃদ্‌স্পন্দন চলতে থাকলে চিপটি কম শক্তি ব্যবহার করে অপেক্ষা করতে পারে। কিন্তু হঠাৎ হৃদ্‌স্পন্দনে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে সেটি দ্রুত সক্রিয় হয়ে সতর্কতা তৈরি করতে পারে।

আরও পড়ুন :  টিকটকের বিরুদ্ধে শিশুদের তথ্য চুরির অভিযোগ, ৪০ কোটি ডলারের সমঝোতা

ফলে ভবিষ্যতের স্মার্টওয়াচ, স্বাস্থ্য মনিটর বা অন্যান্য পরিধানযোগ্য ডিভাইস আরও দীর্ঘ সময় ব্যাটারি ব্যাকআপ দিতে সক্ষম হতে পারে।

রোবট প্রযুক্তিতেও এই চিপের সম্ভাবনা রয়েছে। একটি রোবট যদি প্রতিটি মুহূর্তে তার চারপাশের সব তথ্য একই মাত্রায় বিশ্লেষণ করতে থাকে, তাহলে তার প্রসেসিং শক্তি ও বিদ্যুৎ খরচ দুটোই বাড়বে।

কিন্তু যদি রোবট স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে কম শক্তি ব্যবহার করে এবং কেবল অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা ঘটলে দ্রুত সক্রিয় হয়, তাহলে তার কাজের দক্ষতা বাড়তে পারে।

উদাহরণ হিসেবে একটি শিল্প কারখানার রোবটের কথা ধরা যাক। যন্ত্রটি নিয়মিতভাবে একই কাজ করছে। সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে তার প্রতিটি তথ্য বিশ্লেষণের প্রয়োজন নেই। কিন্তু কোনো যন্ত্রাংশ হঠাৎ নির্ধারিত গতির চেয়ে দ্রুত ঘুরতে শুরু করলে বা কোনো বস্তু অস্বাভাবিকভাবে সামনে চলে এলে তখন দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। নতুন এআই চিপ এ ধরনের পরিস্থিতিতে কার্যকর হতে পারে।

স্বচালিত গাড়ির ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি শনাক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাস্তার স্বাভাবিক দৃশ্যের পাশাপাশি হঠাৎ পথচারী সামনে চলে আসা, কোনো গাড়ি ভুল পথে এগিয়ে আসা বা রাস্তায় কোনো বাধা তৈরি হওয়ার মতো ঘটনা দ্রুত শনাক্ত করতে হয়।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রতি মুহূর্তে বিপুল তথ্য বিশ্লেষণের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনকে দ্রুত আলাদা করে শনাক্ত করতে পারলে গাড়ির প্রতিক্রিয়ার সময় কমানো সম্ভব হতে পারে।

বিশেষ করে কম শক্তি খরচ করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ভবিষ্যতের স্বচালিত যানবাহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

এই আবিষ্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত এর দর্শন। এতদিন এআইকে আরও শক্তিশালী করার অর্থ ছিল আরও বেশি তথ্য প্রক্রিয়াকরণ, আরও বড় মডেল এবং আরও বেশি কম্পিউটিং ক্ষমতা।

আরও পড়ুন :  ইউটিউবের নতুন নিয়মে বিপাকে ক্রিয়েটররা, মনিটাইজেশনে বড় পরিবর্তন

নতুন নিউরোমরফিক চিপ সেই ধারণাকে কিছুটা উল্টে দিতে পারে। এখানে প্রশ্ন শুধু ‘কত দ্রুত এআই কাজ করতে পারে’ নয়। বরং প্রশ্ন হচ্ছে, ‘কখন এআইয়ের কাজ করা দরকার?’

স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে অপ্রয়োজনীয় গণনা বন্ধ রেখে প্রয়োজনের মুহূর্তে দ্রুত সক্রিয় হওয়া গেলে এআই আরও দক্ষ হয়ে উঠতে পারে। এতে বিদ্যুৎ খরচ কমানোর পাশাপাশি ছোট ও বহনযোগ্য ডিভাইসেও উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা সহজ হতে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় সাধারণত আরও শক্তিশালী প্রসেসর, বড় ডেটাসেট কিংবা উন্নত অ্যালগরিদমের কথা উঠে আসে। কিন্তু এই নতুন প্রযুক্তি দেখাচ্ছে, দক্ষ এআইয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হতে পারে ‘অপ্রয়োজনে কাজ না করা’।

মানুষ যেমন চারপাশের প্রতিটি শব্দ বা দৃশ্য নিয়ে সারাক্ষণ চিন্তা করে না, প্রয়োজন হলেই মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে, ভবিষ্যতের এআইও হয়তো একইভাবে কাজ করবে।

স্বাভাবিক অবস্থায় থাকবে শান্ত। অস্বাভাবিকতা দেখা দিলেই দ্রুত সক্রিয় হবে। আর সেই কাজও করবে তুলনামূলকভাবে কম শক্তি ও কম গণনা ব্যবহার করে।

ইসিজি সিমুলেশনে প্রায় ৯৮ শতাংশ নির্ভুলতা এবং প্রচলিত এআইয়ের তুলনায় প্রায় ১০ হাজার গুণ কম গণনার দাবি সত্যিই এই প্রযুক্তির সম্ভাবনাকে সামনে নিয়ে এসেছে। তবে বাস্তব জগতের জটিল পরিস্থিতিতে এর কার্যকারিতা কতটা থাকে, সেটিই হবে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

সবকিছু ঠিকঠাক এগোলে ভবিষ্যতের স্মার্ট ডিভাইস, রোবট, স্বাস্থ্য প্রযুক্তি এবং স্বচালিত যানবাহনে এমন এআই দেখা যেতে পারে, যা সব সময় কথা বলবে না বা কাজ করবে না। বরং প্রয়োজনের মুহূর্তে জেগে উঠে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটিই করবে।

অর্থাৎ ভবিষ্যতের বুদ্ধিমান যন্ত্র হয়তো শুধু বেশি জানবে না, কখন চুপ থাকতে হবে আর কখন দ্রুত জেগে উঠতে হবে—সেটাও শিখবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আর্কাইভ