আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন করে ৫০ শতাংশ শুল্কের জবাবে মার্কিন পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আদায়ের ঘোষণা দিয়েছে কানাডা সরকার। আগামী সেপ্টেম্বর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হওয়া স্টিল, ইলেকট্রনিকসসহ নানা রকমের পণ্যে নতুন করে শুল্ক বসানোর ঘোষনা দিয়েছেন দেশটি। এর ফলে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক অংশীদার উভয় দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা নতুন করে তৈরি হয়েছে।
শনিবার (২২ আগস্ট) অটোয়ায় এক সংবাদ সম্মেলনে পাল্টা শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত জানান,কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি । প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেন, কানাডার শ্রমিক, কৃষক, পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষা দিতে কানাডা সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে নতুন বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে শুক্রবার রাত পর্যন্ত আলোচনা চললেও কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি দুই দেশ। আলোচনার ব্যর্থতার পর কানাডার পণ্যের ওপর নতুন করে ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করেন ট্রাম্প।
নতুন শুল্কের আওতায় কানাডার ওয়াইন, আসবাবপত্র, দুগ্ধজাত পণ্য, সিমেন্ট, পোশাক, মাছ ধরার সরঞ্জাম এবং হকি সরঞ্জামসহ বিভিন্ন পণ্য রয়েছে। এতে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের কানাডীয় রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কার্নি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব কানাডার অর্থনীতি ও স্বার্থের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র যে শর্ত দিয়েছে, কানাডা তা মেনে নেবে না এবং দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো ছাড়ও দেবে না।
তিনি আরও বলেন, কানাডা কোনো বাণিজ্যযুদ্ধে যেতে চায়নি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা সিদ্ধান্তের কারণে কানাডাকে পাল্টা ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে।
কানাডার পাল্টা শুল্কের আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের স্টিল, দুগ্ধজাত পণ্য, গৃহস্থালি সামগ্রী, কৃষিযন্ত্র, মণ্ড ও কাগজ এবং ইলেকট্রনিকসসহ বিভিন্ন পণ্য আসতে পারে।
কানাডা সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পাল্টা শুল্কের আওতাভুক্ত পণ্যগুলোর বিস্তারিত তালিকা প্রকাশ করা হবে।
দেশটির জন্য সিদ্ধান্তটি সহজ নয়। কারণ কানাডার মোট রপ্তানির বড় একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারনির্ভর। দেশটির মোট রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রে যায়। ফলে পাল্টা শুল্ক আরোপ করলে কানাডার ব্যবসা-বাণিজ্যেও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবুও অটোয়া মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া জরুরি।
ট্রাম্পের নতুন শুল্কে কানাডার মোট রপ্তানির প্রায় ৫ শতাংশ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে নরম কাঠ, ওয়াইনসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাত বড় ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে পারে।
শুল্ক বাড়লে কানাডার পণ্যের দাম যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বেড়ে যেতে পারে। এতে ক্রেতাদের চাহিদা কমার পাশাপাশি কানাডীয় উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের ওপর আর্থিক চাপ বাড়তে পারে।
এর প্রভাব কর্মসংস্থানেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমাতে বা ব্যবসা সংকুচিত করতে বাধ্য হতে পারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পগুলোর জন্য আগামী সপ্তাহে সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী কার্নি।
প্রয়োজন হলে এই সহায়তা কয়েক বছর পর্যন্ত চালু রাখার কথাও বিবেচনা করছে কানাডা সরকার।
কানাডার পাল্টা শুল্ক ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও কঠোর প্রতিক্রিয়া এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিয়সন গ্রিয়ার জানিয়েছেন, কানাডার সঙ্গে নতুন করে আলোচনার কোনো পরিকল্পনা আপাতত নেই।
তিনি বলেন, কানাডা পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রও এর উপযুক্ত জবাব দেওয়ার পথে এগোচ্ছে।
ফলে দুই দেশের মধ্যে শুল্ক নিয়ে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে শক্তিশালী বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকলেও সাম্প্রতিক শুল্কনীতি সেই সম্পর্কে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।
প্রধানমন্ত্রী কার্নির দাবি, আলোচনার শেষ পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র এমন কিছু নতুন শর্ত দিয়েছিল, যা কানাডার কাছে অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক ও অন্যায্য মনে হয়েছে।
এসব শর্তের মধ্যে ভবিষ্যতে কানাডার অন্য দেশের সঙ্গে নতুন বাণিজ্যচুক্তি করার সক্ষমতা সীমিত করার বিষয়ও ছিল বলে জানান তিনি।
কানাডা মনে করছে, এমন কোনো চুক্তি দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই শেষ মুহূর্তে সমঝোতায় না গিয়ে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অটোয়া।
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বাণিজ্য আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিরোধগুলোর একটি ছিল গাড়ি শিল্পকে ঘিরে।
কানাডা চেয়েছিল, হালকা গাড়ির ক্ষেত্রে যে সুবিধাজনক শুল্কনীতি প্রস্তাব করা হয়েছিল, তা মাঝারি ও ভারী ট্রাকের ক্ষেত্রেও কার্যকর করা হোক। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সেই প্রস্তাবে রাজি হয়নি।
কার্নির দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব মেনে নিলে কানাডায় উৎপাদিত ফোর্ডের এফ-৩৫০, এফ-৪৫০ ও এফ-৫৫০ ট্রাক এবং জেনারেল মোটরসের সিলভেরাডোর মতো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মডেল বাণিজ্যচুক্তির সুবিধা থেকে বাদ পড়ত।
এতে কানাডার গাড়ি উৎপাদন শিল্প আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ত। বিশেষ করে অন্টারিওর গাড়ি ও উৎপাদন খাতের ওপর এর বড় প্রভাব পড়তে পারত।
কানাডার অন্টারিও প্রদেশের সরকারপ্রধান ডগ ফোর্ড প্রধানমন্ত্রী কার্নির পাল্টা শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত চুক্তি অন্টারিওর গাড়ি, স্টিল ও উৎপাদন খাতের জন্য ক্ষতিকর হতে পারত। ফলে কানাডার স্বার্থ রক্ষায় কঠোর অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন ছিল।
অন্টারিও কানাডার শিল্প ও গাড়ি উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হওয়ায় এই প্রদেশের অবস্থান বাণিজ্য আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
বাণিজ্য আলোচনায় শুধু শুল্ক বা পণ্য আমদানি-রপ্তানি নয়, কানাডার সংস্কৃতি, ভাষা ও সার্বভৌমত্ব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কার্নি।
তাঁর অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু প্রস্তাব কানাডার নিজস্ব সাংস্কৃতিক ও জাতীয় স্বার্থের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এসব প্রস্তাবের বিস্তারিত তিনি প্রকাশ করেননি।
কার্নি এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায় শক্ত অবস্থান নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন পেয়েছিলেন। কানাডায় বিভিন্ন জনমত জরিপেও দেখা গেছে, দেশটির অনেক নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাণিজ্যিক বিষয়ে বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার বিপক্ষে।
এই পরিস্থিতিতে কানাডার প্রধান বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টির নেতা পিয়েরে পোইলিভ্রে সরকারের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে দেশের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
সূত্র: রয়টার্স

