বর্তমান সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ড ও বিরোধী দলগুলোর ভূমিকা দুটোরই মূল্যায়ন দরকার বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন। সাথে সাথে গত ছয় মাসে বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে ছড়ানো হয়েছে বলে তিনি যে গুজব, অপতথ্য ও প্রচারণার অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে, সেসব গুলোরও মূল্যায়ন হওয়া উচিত বলে রাশেদ খাঁন দাবি করেছেন।
রাশেদ খাঁন সোমবার (২৪ আগস্ট) তার নিজের ফেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে এসব মন্তব্য করেন। তিনি বিশেষ করে জামায়াত ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের শরিকদের বক্তব্য নিয়ে পোষ্টে প্রশ্ন তোলেন। রাশেদ খাঁনের অভিযোগ, বিরোধী দলের বেশ কিছু বক্তব্যে যাচাইহীন ও বিভ্রান্তিকর তথ্য তুলে ধরা হচ্ছে।
রাশেদ খাঁনের বক্তব্যের মূল বিষয় হলো, সরকারের ছয় মাসের কাজ যেমন জনসম্মুখে পর্যালোচনা হওয়া দরকার, তেমনি একই সময়ে বিরোধী দলগুলো কী ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছে, সেগুলোরও মূল্যায়ন হওয়া উচিত।
তিনি মনে করেন, একটি সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতা বিচার করার পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করাও জরুরি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুললেই হবে না; বিরোধী দলের প্রচারিত তথ্যও কতটা নির্ভরযোগ্য, সেটি জনগণের সামনে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
রাশেদ খাঁনের দাবি, গত ছয় মাসে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্যের একটি অংশে গুজব, অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের উপস্থিতি দেখা গেছে। এ কারণে তিনি বিরোধী দলের ১৮০ দিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও প্রচারণার একটি পৃথক মূল্যায়নের কথা বলেছেন।
ফেসবুক পোস্টে রাশেদ খাঁন জামায়াত নেতা হামিদুর রহমান আজাদের একটি বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, বিএনপি সরকারের ছয় মাসে ৫১২ জন গুম হয়েছেন এমন একটি দাবি করা হয়েছে।
রাশেদ খাঁনের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই বক্তব্য দেওয়ার সময় নাহিদ ইসলামসহ ১১ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এত গুরুতর একটি দাবি করা হলেও সেখানে উপস্থিত নেতাদের কেউ কেন আপত্তি জানাননি।
তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ৫১২ জন গুম হওয়ার দাবিটি রাশেদ খাঁনের বক্তব্যে উত্থাপিত অভিযোগ হিসেবে এসেছে। এটিকে স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা তথ্য হিসেবে ধরে নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, মানবাধিকার সংস্থার তথ্য এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
রাশেদ খাঁন অবশ্য তাঁর পোস্টে দাবিটিকে সরাসরি মিথ্যাচার হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, এ ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
রাশেদ খাঁনের পোস্টের বড় একটি অংশজুড়ে ছিল জামায়াতের সমালোচনা। তিনি অভিযোগ করেন, জামায়াতের নেতারা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল তথ্য প্রচার করছেন।
এ প্রসঙ্গে তিনি ধর্মীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে একটি বৈপরীত্য তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, কোনো রাজনৈতিক নেতা ধর্মীয় মূল্যবোধের কথা বললেও তাঁর বক্তব্যে যদি তথ্যগত অসঙ্গতি থাকে, তাহলে সেটি নিয়েও প্রশ্ন তোলা উচিত।
রাশেদ খাঁনের এই মন্তব্য মূলত রাজনৈতিক সমালোচনার অংশ। তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, রাজনৈতিক বক্তব্যের ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয় বা ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে তথ্যের সত্যতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
জামায়াতের পাশাপাশি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নিয়েও সরাসরি মন্তব্য করেছেন রাশেদ খাঁন। তাঁর দাবি, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে যাওয়ার পর এনসিপিও একই ধরনের বক্তব্য ও রাজনৈতিক প্রচারণার ধারায় যুক্ত হয়েছে।
রাশেদ খাঁনের অভিযোগ, এনসিপির নেতাদের বক্তব্যেও এমন কিছু তথ্য থাকে, যেগুলো তাঁর ভাষায় অপতথ্য বা বিভ্রান্তিকর। এ কারণে তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য আরও কঠোরভাবে যাচাই করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
তাঁর মতে, জনগণের সামনে কোনো তথ্য তুলে ধরার আগে সেটির সত্যতা নিশ্চিত করা রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব। বিশেষ করে গুম, মানবাধিকার, প্রশাসন কিংবা সরকারের ব্যর্থতার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে কোনো দাবি করলে তার পেছনে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও প্রমাণ থাকা প্রয়োজন।
রাশেদ খাঁনের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি সরকারের পাশাপাশি বিরোধী দলেরও ছয় মাসের কার্যক্রম মূল্যায়নের দাবি তুলেছেন।
সাধারণত একটি সরকারের নির্দিষ্ট সময়ের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিরোধী দল, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ নানা ধরনের মূল্যায়ন করে। সরকারের কোথায় সাফল্য, কোথায় ব্যর্থতা, কোন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়েছে এবং কোনগুলো হয়নি এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
রাশেদ খাঁন মনে করেন, একইভাবে বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক ভূমিকারও হিসাব থাকা দরকার। তারা গত ১৮০ দিনে কী ধরনের কর্মসূচি দিয়েছে, কী বক্তব্য দিয়েছে এবং জনগণের সামনে কী তথ্য উপস্থাপন করেছে এসবও আলোচনায় আসা উচিত।
তিনি বিশেষভাবে গুজব, অপপ্রচার ও ঘৃণামূলক বক্তব্যের অভিযোগের বিষয়টি সামনে এনেছেন। তাঁর মতে, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার নামে যাচাইহীন তথ্য ছড়িয়ে দিলে সেটি শেষ পর্যন্ত জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।
রাজনীতিতে সরকারের জবাবদিহিতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বিরোধী দলগুলোর বক্তব্যের জবাবদিহিতাও গুরুত্বপূর্ণ। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের কাছে তাদের বক্তব্য ও কর্মসূচির জন্য দায়বদ্ধ থাকে।
রাশেদ খাঁনের বক্তব্য সেই জায়গাটিকেই সামনে নিয়ে এসেছে। তিনি বলছেন, সরকারের ১৮০ দিনের মূল্যায়ন অবশ্যই হতে হবে। তবে সেই মূল্যায়ন যেন একতরফা না হয়। একই সময়ে বিরোধী দলগুলোর কর্মকাণ্ড, বক্তব্য এবং প্রচারণারও নিরপেক্ষ পর্যালোচনা প্রয়োজন।
বিশেষ করে কোনো রাজনৈতিক দল সরকারের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুললে তার প্রমাণ কতটা শক্তিশালী, তথ্যের উৎস কী এবং দাবিটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব কি না এসব প্রশ্ন সামনে আসা স্বাভাবিক।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রাজনৈতিক বক্তব্য ছড়িয়ে দেওয়ার অন্যতম বড় মাধ্যম। একটি বক্তব্য প্রকাশের পর অল্প সময়ের মধ্যেই সেটি হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে কোনো ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্যও দ্রুত জনমনে প্রভাব ফেলতে পারে।
এ কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্যের ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সরকার, বিরোধী দল কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক সংগঠন যে পক্ষই কোনো দাবি করুক না কেন, সেটির সত্যতা যাচাই করা গণমাধ্যম ও নাগরিকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
রাশেদ খাঁনের ১৮০ দিনের মূল্যায়নের দাবি মূলত এই বৃহত্তর বিতর্ককেই সামনে এনেছে। সরকারের কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বিরোধী দলের রাজনৈতিক বক্তব্য ও প্রচারণাও যদি তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়, তাহলে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও দায়িত্বশীল হতে পারে।

