ধমনীর ভেতরের দেয়ালে চর্বি, কোলেস্টেরল, ক্যালশিয়ামসহ নানা পদার্থ জমে তৈরি হতে পারে প্লাক। এই অবস্থাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বলা হয় অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস। সময়ের সঙ্গে প্লাক জমতে থাকলে ধমনীর ভেতরের পথ সরু হয়ে যায়। এতে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হতে পারে। গুরুতর অবস্থায় এই সমস্যা হৃদ্রোগ বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
ধমনীতে প্লাক ধরা পড়ার পর অনেকেই জানতে চান, এটি কি কোনো ঘরোয়া উপায়ে গলিয়ে ফেলা সম্ভব? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে নানা ধরনের দাবি দেখা গেলেও বাস্তবতা হলো, তৈরি হয়ে যাওয়া প্লাক দ্রুত গলিয়ে ফেলার কোনো প্রমাণিত ঘরোয়া পদ্ধতি নেই। তবে সঠিক জীবনযাপন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং ঝুঁকির কারণগুলো নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্লাকের অগ্রগতি ধীর করা এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
প্লাক তৈরির সঙ্গে রক্তে অতিরিক্ত এলডিএল বা ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। ধমনীর দেয়ালে দীর্ঘদিন ধরে কোলেস্টেরল ও অন্যান্য পদার্থ জমতে থাকলে ধীরে ধীরে প্লাক তৈরি হতে পারে।
প্লাক বড় হয়ে গেলে ধমনীর ভেতরের জায়গা সংকুচিত হতে পারে। আবার কিছু ক্ষেত্রে প্লাকের ওপরের আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে রক্ত জমাট বাঁধার পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। তখন রক্ত চলাচল হঠাৎ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ধমনীর অবস্থান অনুযায়ী এর ফলে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের মতো গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তাই ধমনীতে প্লাক শনাক্ত হলে শুধু কোনো ঘরোয়া উপায়ের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
প্লাক একবার তৈরি হলেই তা দ্রুত বা রাতারাতি গলে যাবে এমন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। তবে চিকিৎসার মাধ্যমে প্লাকের বৃদ্ধি ধীর করা, ঝুঁকি কমানো এবং কিছু ক্ষেত্রে প্লাকের পরিমাণে উন্নতি আনা সম্ভব হতে পারে।
চিকিৎসার অন্যতম লক্ষ্য হলো প্লাককে স্থিতিশীল রাখা, যাতে সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি তৈরি না করে। এজন্য রক্তে এলডিএল কোলেস্টেরল কম রাখা, রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ করা এবং ধূমপান থেকে দূরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু মোট কোলেস্টেরলের মাত্রা দেখলেই সবসময় হৃদ্রোগের ঝুঁকি বোঝা যায় না। চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী এলডিএল, এইচডিএল, ট্রাইগ্লিসারাইডসহ বিভিন্ন পরীক্ষার ফল বিবেচনা করতে পারেন।
যাঁদের ইতিমধ্যে ধমনীতে প্লাক শনাক্ত হয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে শুধু খাবার পরিবর্তন করে অপেক্ষা করা যথেষ্ট নাও হতে পারে। ব্যক্তির সামগ্রিক ঝুঁকি বিবেচনা করে চিকিৎসক কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ দিতে পারেন।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়। একইভাবে ওষুধের পরিবর্তে কোনো অপ্রমাণিত ‘প্রাকৃতিক’ চিকিৎসার ওপর নির্ভর করাও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে খাদ্যাভ্যাসে নিয়মিত পরিবর্তন আনা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের খাবারে শাকসবজি, ফল, গোটা শস্য, ডাল, বাদাম ও বীজজাতীয় খাবার রাখার চেষ্টা করা যায়।
ডাল, ছোলা ও রাজমার মতো ডালজাতীয় খাবারে ফাইবার থাকে, যা স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। ওটসসহ বিভিন্ন গোটা শস্যও খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
অন্যদিকে অতিরিক্ত ভাজাভুজি, বেশি চর্বিযুক্ত খাবার, ফ্যাটযুক্ত মাংস, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত মাংস এবং বেশি চিনি থাকা খাবার নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস কমানো দরকার।
এখানে মূল বিষয় হলো কোনো একটি ‘সুপারফুড’ খেয়ে ধমনীর প্লাক গলানোর চেষ্টা নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা।
শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার বা উপযুক্ত অন্যান্য ব্যায়াম শরীরের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। এর পাশাপাশি ওজন, রক্তচাপ, রক্তে শর্করা এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণেও উপকার পাওয়া যেতে পারে।
তবে যাঁদের ধমনীতে উল্লেখযোগ্য প্লাক রয়েছে, আগে থেকেই হৃদ্রোগের সমস্যা আছে, অথবা ব্যায়ামের সময় বুকে ব্যথা কিংবা শ্বাসকষ্ট হয়, তাঁদের হঠাৎ কঠোর ব্যায়াম শুরু করা উচিত নয়। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে উপযুক্ত ব্যায়ামের মাত্রা ঠিক করা নিরাপদ।
ধমনীর স্বাস্থ্য ভালো রাখতে শুধু কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করলেই হবে না। জীবনযাপনের আরও কিছু বিষয়েও নজর দিতে হবে।
ধূমপান বন্ধ করুন: ধূমপান রক্তনালীর ক্ষতির সঙ্গে সম্পর্কিত এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন: স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখলে হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে এবং অন্যান্য ঝুঁকিও নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়।
পর্যাপ্ত ঘুমান: নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ঘুম সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
মানসিক চাপ সামলান: দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত মানসিক চাপ স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই বিশ্রাম, নিয়মিত ঘুম এবং স্বাস্থ্যকর দৈনন্দিন অভ্যাস বজায় রাখা দরকার।
এ প্রশ্নের উত্তর সবার ক্ষেত্রে এক নয়। প্লাকের ধরন, কতটা জমেছে, কোন ধমনীতে জমেছে এবং ব্যক্তির সামগ্রিক হৃদ্রোগের ঝুঁকির ওপর বিষয়টি নির্ভর করে।
তবে চিকিৎসার লক্ষ্য শুধু প্লাক ‘গলিয়ে দেওয়া’ নয়। বরং এর বৃদ্ধি থামানো বা ধীর করা এবং প্লাককে স্থিতিশীল রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানোও চিকিৎসার বড় উদ্দেশ্য।
তাই ধমনীতে প্লাক শনাক্ত হলে ভয় না পেয়ে নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ, এলডিএল কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ, রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা ঠিক রাখা, ধূমপান বন্ধ করা, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এবং নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা সব মিলিয়েই হৃদ্স্বাস্থ্য রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর পথ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ধমনীর প্লাক কমানোর নামে কোনো অপ্রমাণিত ঘরোয়া পদ্ধতি বা ‘প্রাকৃতিক চিকিৎসা’কে ওষুধ ও চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার না করা। হৃদ্রোগের ঝুঁকি ব্যক্তিভেদে আলাদা, তাই নিজের পরিস্থিতি অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
Discover more from News Bangla24x7
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

