রাতের আকাশ মানেই আমাদের চোখে সাধারণত কালো অন্ধকার, তারার ঝিকিমিকি আর কখনও চাঁদের আলো। কিন্তু পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের অনেক ওপরে এমন কিছু দৃশ্য তৈরি হয়, যা মাটি থেকে খালি চোখে দেখা প্রায় অসম্ভব। এবার তেমনই এক বিস্ময়কর দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন নভোশ্চর ডন পেটিট।
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন থেকে তোলা তাঁর ছবিতে দেখা গেছে, কালো আকাশের নিচে সাদা মেঘের স্তরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে চোখধাঁধানো বেগুনি আলো। যেন অন্ধকার আকাশের বুক চিরে হঠাৎ জ্বলে উঠেছে কোনো রহস্যময় আলোর রেখা। ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে আসতেই মহাকাশপ্রেমীদের মধ্যে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা।
পৃথিবীর মাটি থেকে আমরা যে আকাশ দেখি, মহাকাশ থেকে সেই একই আকাশ সম্পূর্ণ অন্য রকম দেখাতে পারে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন থেকে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল পর্যবেক্ষণ করলে এমন অনেক আলোকচ্ছটা দেখা যায়, যা সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালেই থেকে যায়।
ডন পেটিটের তোলা ছবিটিও তেমনই একটি বিরল মুহূর্তের সাক্ষী। ছবিতে নিচে রয়েছে মেঘের সাদা স্তর। তার ওপরে বিস্তৃত অন্ধকার আকাশ। সেই অন্ধকারের মাঝেই মেঘের ওপর ফুটে উঠেছে বেগুনি রঙের উজ্জ্বল আলোর খেলা।
দৃশ্যটি এতটাই অস্বাভাবিক যে প্রথম দেখায় অনেকের কাছেই এটি কোনো বিশেষ আলোকসজ্জা বা সম্পাদিত ছবি বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঘটে যাওয়া একটি বিরল আলোকীয় ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত।
জানা গেছে, পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫০ হাজার ফুট উচ্চতার আশপাশে এই ধরনের আলোর ঘটনা দেখা যেতে পারে। এই উচ্চতা সাধারণ মানুষের পরিচিত পৃথিবীর অনেকটাই ওপরে। সেখানে বায়ুমণ্ডলের আচরণও মাটির কাছাকাছি অঞ্চলের তুলনায় ভিন্ন।
বিমান চলাচলের পরিচিত উচ্চতার ওপরের এই অঞ্চলে বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন স্তরে বিদ্যুৎ, মেঘ ও আলোর মিথস্ক্রিয়ায় অদ্ভুত সব দৃশ্য তৈরি হতে পারে। এগুলোর অনেকটাই এত ক্ষণস্থায়ী যে পৃথিবী থেকে সেগুলো পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত কঠিন।
ডন পেটিটের মতো মহাকাশচারীদের কাছে অবশ্য এমন দৃশ্য দেখার সুযোগ অনেক বেশি। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন পৃথিবীর চারদিকে ঘুরতে ঘুরতে বিভিন্ন অঞ্চলের ওপর দিয়ে যায়। ফলে মহাকাশচারীরা একেবারে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলকে দেখতে পারেন।
ডন পেটিট মহাকাশে থাকাকালীন নিয়মিত পৃথিবী ও মহাকাশের ছবি তুলতে পছন্দ করেন। তাঁর ক্যামেরায় এর আগেও পৃথিবীর এমন বহু দৃশ্য ধরা পড়েছে, যা সাধারণ মানুষের কাছে ছিল প্রায় অদেখা।
এবার তাঁর ক্যামেরার লেন্সে ধরা পড়েছে মেঘের ওপর বেগুনি আলোর অপূর্ব ছটা। নিজের এক্স হ্যান্ডলে ছবিটি প্রকাশ করে তিনি জানান, মেঘের মধ্য দিয়ে উজ্জ্বল বেগুনি রঙের এক অসাধারণ আলোর খেলা ক্যামেরায় ধরা পড়েছে।
এই ছবির বিশেষত্ব শুধু এর সৌন্দর্যে নয়। এর মাধ্যমে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের এমন একটি দিক সামনে এসেছে, যা সাধারণত আমাদের চোখের আড়ালেই থাকে।
মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে দেখলে বোঝা যায়, আমাদের গ্রহের চারপাশের বায়ুমণ্ডল কতটা সক্রিয় এবং বৈচিত্র্যময়। মেঘ, বিদ্যুৎ, সূর্যের আলো এবং বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে নানা ধরনের মিথস্ক্রিয়া তৈরি হয়। তারই কোনো কোনো মুহূর্তে জন্ম নেয় এমন রহস্যময় আলোকচ্ছটা।
ডন পেটিটের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ছবিতে ধরা পড়া আলোর ঘটনাটি বায়ুমণ্ডলের অনেক ওপরের স্তরে তৈরি হওয়া ক্ষণস্থায়ী আলোকচ্ছটার সঙ্গে সম্পর্কিত। মেঘের ওপর বা তার আশপাশে বিদ্যুৎ ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রক্রিয়ার কারণে এমন আলো তৈরি হতে পারে।
এই ধরনের ঘটনা খুব অল্প সময়ের জন্য দেখা যায়। ফলে পৃথিবীর মাটি থেকে দাঁড়িয়ে তা দেখা বা ক্যামেরায় ধরে রাখা কঠিন। মহাকাশ থেকে পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে অবশ্য বিষয়টি অনেক সহজ হয়ে যায়।
মহাকাশ স্টেশনের অবস্থান পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে অনেক ওপরে হওয়ায় মহাকাশচারীরা মেঘের স্তরের ওপর দিয়ে বিস্তৃত অঞ্চল একসঙ্গে দেখতে পান। ফলে বায়ুমণ্ডলের ক্ষণস্থায়ী আলোর ঘটনাগুলিও তাঁদের ক্যামেরায় ধরা পড়ার সুযোগ তৈরি হয়।
ডন পেটিটের ছবিটি তাই শুধু একটি সুন্দর ছবি নয়। এটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল নিয়ে আগ্রহী মানুষদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ একটি দৃশ্য।
ডন পেটিট নতুন কোনো দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করলেন, এমন নয়। মহাকাশে অবস্থানকালে পৃথিবীর নানা প্রান্তের ছবি তোলার জন্য তাঁর আলাদা পরিচিতি রয়েছে।
মহাকাশ থেকে পৃথিবীর শহর, নদী, উপকূল, মরুভূমি কিংবা রাতের আলোকসজ্জা—সবকিছুকেই অন্য এক রূপে দেখা যায়। ডন পেটিট সেই ভিন্ন রূপগুলো নিয়মিত ক্যামেরায় ধরে রাখেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেন।
কয়েক দিন আগেও তিনি আলোয় সাজানো বেনারসের ছবি প্রকাশ করেছিলেন। মহাকাশ থেকে তোলা সেই ছবিতেও পৃথিবীর একটি পরিচিত শহরকে সম্পূর্ণ অন্য রূপে দেখা গিয়েছিল। ছবিটি প্রকাশ্যে আসার পর সেটিও মহাকাশপ্রেমীদের মধ্যে প্রশংসা পেয়েছিল।
এবার অবশ্য শহরের আলো নয়, নজর কেড়েছে প্রকৃতির তৈরি বেগুনি আলোর রহস্য।
ডন পেটিটের প্রকাশ করা ছবিটি সামনে আসার পর অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। কারও কাছে এটি অপূর্ব, কারও কাছে রহস্যময়। আবার অনেকেই মন্তব্য করেছেন, মহাবিশ্ব এবং পৃথিবীর প্রকৃত সৌন্দর্যের কতটাই না মানুষের চোখের আড়ালে রয়ে গেছে, এই ছবিই তার প্রমাণ।
আসলে পৃথিবী থেকে আমরা আমাদের গ্রহকে যেভাবে দেখি, মহাকাশ থেকে সেটি সম্পূর্ণ আলাদা। রাতের অন্ধকারে শহরের আলো, মেঘের স্তর, বজ্রপাত কিংবা বায়ুমণ্ডলের ক্ষণস্থায়ী আলোকচ্ছটা—সবকিছু মিলে তৈরি হয় এক অসাধারণ দৃশ্যপট।
ডন পেটিটের ক্যামেরা সেই অদেখা দৃশ্যগুলোর কিছু মুহূর্ত আমাদের সামনে এনে দেয়। ফলে মহাকাশচারীদের তোলা ছবি শুধু সৌন্দর্য দেখায় না, পৃথিবীকে নতুন করে চিনতেও সাহায্য করে।
বেগুনি রঙের আলোর এই দৃশ্য সাধারণ রাতের আকাশে দেখা যায় না। তাই ছবিটি দেখার পর মানুষের কৌতূহল তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
মেঘের সাদা স্তরের ওপর বেগুনি আলোর বিস্তার ছবিটিকে আরও নাটকীয় করে তুলেছে। নিচে পৃথিবীর মেঘ, তার ওপর অন্ধকার আকাশ এবং তার মাঝখানে হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে ওঠা আলো—সব মিলিয়ে দৃশ্যটি যেন কোনো কল্পবিজ্ঞানের সিনেমার অংশ।
কিন্তু এই সৌন্দর্য বাস্তব। প্রকৃতি নিজের নিয়মেই এমন দৃশ্য তৈরি করেছে। শুধু সেটিকে দেখার জন্য প্রয়োজন ছিল সঠিক জায়গা, সঠিক সময় এবং উপযুক্ত ক্যামেরা।
ডন পেটিটের হাতে সেই তিনটিই ছিল। তাই সাধারণ মানুষের চোখে অদৃশ্য থাকা একটি ক্ষণস্থায়ী আলোকচ্ছটা এবার পৌঁছে গেল গোটা বিশ্বের মহাকাশপ্রেমীদের সামনে।
মহাকাশ থেকে তোলা প্রতিটি পৃথিবীর ছবি আমাদের একটি বিষয় মনে করিয়ে দেয়—আমরা যে গ্রহে বাস করি, তার সৌন্দর্য আমাদের পরিচিত দৃশ্যের চেয়েও অনেক বেশি বিস্তৃত।
মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকা আলো, রাতের শহরের ঝলমলে দৃশ্য কিংবা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের রহস্যময় আলোকচ্ছটা—সবই প্রকৃতির নিজস্ব শিল্পকর্মের মতো।
ডন পেটিটের ক্যামেরায় ধরা পড়া বেগুনি আলোর এই ছবি সেই অদেখা পৃথিবীরই একটি ঝলক। মহাকাশ থেকে দেখা কয়েক মুহূর্তের এই দৃশ্য হয়তো খুব দ্রুত মিলিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ক্যামেরায় বন্দি হওয়ার কারণে সেটি এখন মানুষের স্মৃতিতে থেকে যাবে।
আকাশের এই রহস্যময় বেগুনি খেলা তাই শুধু একটি সুন্দর ছবি নয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবী এবং তার বায়ুমণ্ডলের কত অসাধারণ দৃশ্য এখনও আমাদের দৃষ্টির বাইরে। আর সেই অদেখা সৌন্দর্যকে মানুষের সামনে তুলে ধরতেই মহাকাশচারীদের ক্যামেরা হয়ে উঠছে এক অনন্য জানালা।

