সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের আকাশসীমায় তুরস্কের সামরিক বিমানের আনাগোনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তিন দিনের ব্যবধানে পাকিস্তানের দুটি বিমান ঘাঁটিতে তুরস্কের সামরিক বিমান সি-১৩০ একাধিকবার ওঠানামা করেছে বলে জানা গেছে। এ বিষয়টি ঘিরে পাকিস্তান ও তুরস্কের সামরিক সহযোগিতা নিয়ে নানা রকমের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
‘ইন্ডিয়া টুডে’ নামে ভারতীয় একটি সংবাদমাধ্যম গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছেন, বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত এই তিন দিনে তুরস্কের সামরিক বিমান পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডি এবং করাচির মসুর বিমানঘাঁটিতে বেশ কয়েকবার ওঠানামা করেছে। তবে এই সামরিক বিমানগুলোতে কী ধরনের সামরিক সরঞ্জাম আনা হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কোন তথ্য জানায়নি পাকিস্তান বা তুরস্ক।
তুরস্কের সি-১৩০ মূলত একটি সামরিক পরিবহন বিমান। বিভিন্ন ধরনের সেনা সরঞ্জাম, সামরিক যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ পরিবহনে এই ধরনের বিমান ব্যবহার করা হয়। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে পাকিস্তানের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক বিমানঘাঁটিতে এসব বিমানের একাধিকবার অবতরণকে স্বাভাবিক পরিবহন কার্যক্রম হিসেবে দেখছেন না অনেক পর্যবেক্ষক।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, তুরস্কের ওই বিমানগুলোর মাধ্যমে পাকিস্তানে ড্রোন এবং ড্রোন-সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম পাঠানো হয়ে থাকতে পারে। পাশাপাশি পাকিস্তান তুরস্কের এইচকিউ সিরিজের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরঞ্জামও পেয়ে থাকতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব তথ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি। সামরিক পরিবহন বিমানে ঠিক কী আনা হয়েছে, সেটি প্রকাশ্যে না আসা পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে নানা ধরনের অনুমান চলতেই পারে।
পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে ড্রোন, যুদ্ধবিমান কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় আধুনিক এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ব্যবহার করা হয়।
তুরস্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিজস্ব প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নয়নে বড় ধরনের অগ্রগতি করেছে। ড্রোন প্রযুক্তির পাশাপাশি দেশটি বিভিন্ন ধরনের আকাশ প্রতিরক্ষা ও সামরিক সরঞ্জামও তৈরি করছে। ফলে পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের সামরিক সহযোগিতা বাড়লে ইসলামাবাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় তার প্রভাব পড়তে পারে।
তবে তুরস্কের সামরিক বিমানে পাকিস্তানে কোনো নির্দিষ্ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পৌঁছেছে কি না, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়। তাই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে আনুষ্ঠানিক তথ্যের অপেক্ষা করা প্রয়োজন।
পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। দুই দেশের মধ্যে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা খাতেও সহযোগিতা রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সেই সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হয়েছে।
সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ক্ষেত্রে দুই দেশ বিভিন্ন সময়ে একসঙ্গে কাজ করেছে। পাকিস্তান তুরস্কের কাছ থেকে বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহ করেছে। অন্যদিকে তুরস্কও দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে থাকে।
সম্প্রতি সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়টি আরও আলোচনায় এসেছে। তিন দেশের মধ্যে এমন একটি প্রতিরক্ষা কাঠামো তৈরির কথা বলা হয়েছে, যেখানে কোনো একটি দেশ বাইরের আগ্রাসনের শিকার হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর অভিন্ন আঘাত হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
এই ধরনের সহযোগিতা দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
পাকিস্তান ও তুরস্কের ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক ভারতের জন্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। কারণ, পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা শুধু রাজনৈতিক সমর্থনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নিয়েও দুই দেশের যোগাযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার সময় তুরস্কের অবস্থান নয়াদিল্লির নজরে এসেছে। গত বছরের ‘অপারেশন সিঁদুর’-পরবর্তী সংঘাতের সময় পাকিস্তানের পাশে তুরস্ক, চীন ও আজারবাইজানের অবস্থান নিয়ে ভারতীয় মহলে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল।
সে সময় পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী তুরস্কের তৈরি ড্রোন ব্যবহার করেছে বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। অ্যাসিসগার্ড সোনগার এবং বায়রাকতার টিবি২-এর মতো তুর্কি ড্রোন পাকিস্তানের নজরদারি ও সামরিক অভিযানে ব্যবহারের অভিযোগ সামনে আসে।
এর ফলে পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে তুরস্কের ভূমিকা ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
পাকিস্তানের দুই সামরিক বিমানঘাঁটিতে মাত্র তিন দিনে তুরস্কের সি-১৩০ বিমানের একাধিকবার অবতরণ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলেছে। এটি কি নিয়মিত সামরিক সরবরাহ, নাকি নতুন কোনো প্রতিরক্ষা সহযোগিতার অংশ তা এখনো পরিষ্কার নয়।
যদি সত্যিই ড্রোন বা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সরঞ্জাম পাকিস্তানে পাঠানো হয়ে থাকে, তাহলে দুই দেশের সামরিক সহযোগিতা আরও গভীর হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাবে। বিশেষ করে পাকিস্তানের বিমান প্রতিরক্ষা ও ড্রোন সক্ষমতা বাড়াতে তুরস্কের প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে, বিষয়টি কেবল সামরিক সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলে ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশকেও নতুন নিরাপত্তা হিসাব করতে হতে পারে।
তুরস্কের সামরিক বিমান পাকিস্তানের দুই বিমানঘাঁটিতে একাধিকবার অবতরণ করেছে এমন খবর সামনে এলেও এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে এখনো স্পষ্ট কোনো সরকারি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ফলে ড্রোন, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিংবা অন্য কোনো সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনের বিষয়টি আপাতত গোয়েন্দা সূত্রের দাবির মধ্যেই রয়েছে।
পাকিস্তান ও তুরস্ক আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কী বলে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সামরিক বিমান চলাচল অনেক সময় প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, যৌথ মহড়া কিংবা সরঞ্জাম পরিবহনের মতো বিভিন্ন কারণে হতে পারে।

