মশার উৎপাত থেকে বাঁচতে বহু বছর থেকে মানুষ মশারি, কয়েল, স্প্রে কিংবা বৈদ্যুতিক মশা নিধনযন্ত্রের ওপরই ভরসা করে আসছে। এখন সেই তালিকায় যুক্ত হতে যাচ্ছে আরও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি লেজারভিত্তিক মশা নিধন ব্যবস্থা। ‘ফটোন মেট্রিক্স’ নামের চীনে তৈরি একটি ডিভাইস স্বয়ংক্রিয়ভাবে মশার গতিপথ শনাক্ত করতে পারে। পরে লক্ষ্য নির্ধারণ করে লেজার রশ্মির দ্বারা পোকাটিকে নিষ্ক্রিয় করার দাবি করছে।
মশা মারার প্রযুক্তিটির নকশা দেখতে ছোট আকারের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মতো। চারপাশ পর্যবেক্ষণ ও উড়ন্ত পোকামাকড় শনাক্ত করার সাথে সাথে নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিল থাকলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লেজার ব্যবহারের ব্যবস্থা রয়েছে এই ডিভাইসটিতে । যার ফলে মশা নিয়ন্ত্রণে প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে নতুন এই প্রযুক্তিনির্ভর সমাধানের সম্ভাবনা তৈরি করা হযেছে।
ফটোন মেট্রিক্স মূলত লিডার প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। স্বচালিত গাড়িসহ বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তিতে লিডার ব্যবহার করা হয় আশপাশের পরিবেশ শনাক্ত ও বিশ্লেষণের জন্য। একই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই ডিভাইস চারপাশের এলাকা স্ক্যান করে উড়ন্ত পোকামাকড়ের অবস্থান, দূরত্ব এবং আকার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।
নির্মাতাদের তথ্য অনুযায়ী, উন্নত সংস্করণটি প্রায় ২০ ফুট বা ৬ মিটার দূর থেকেও মশা শনাক্ত করতে সক্ষম। কোনো পোকা নির্ধারিত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিলে গেলে ডিভাইসের ভেতরের দ্রুত ঘূর্ণনশীল একটি বিশেষ আয়না লেজার রশ্মির দিক পরিবর্তন করে। এর মাধ্যমে লেজারকে শনাক্ত করা পোকাটির দিকে লক্ষ্য করার চেষ্টা করা হয়।
অর্থাৎ, ব্যবহারকারীকে প্রতিটি মশা আলাদাভাবে খুঁজে নিয়ে ব্যবস্থা নিতে হয় না। ডিভাইসটির মূল বৈশিষ্ট্যই হলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে পোকা শনাক্ত ও লক্ষ্য নির্ধারণ করা।
প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের দাবি, ফটোন মেট্রিক্স নির্দিষ্ট আকার ও গতির উড়ন্ত পোকা শনাক্ত করতে পারে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২ থেকে ২০ মিলিমিটার আকারের এবং প্রতি সেকেন্ডে সর্বোচ্চ ৩.৩ ফুট গতিতে চলা পোকামাকড় এই ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারে।
এখানে শুধু মশা নয়, একই ধরনের আকার ও গতির অন্য পোকাও শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই প্রযুক্তিটির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো—কোন পোকাকে লক্ষ্য হিসেবে নির্বাচন করা হবে।
প্রস্তুতকারকের বক্তব্য অনুযায়ী, ডিভাইসটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে তারপর লেজার ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে জোনাকি বা অন্য কোনো উপকারী পোকা ইচ্ছেমতো লক্ষ্যবস্তু হবে না এমনটাই তাদের দাবি। তবে বাস্তব পরিবেশে বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড়ের মধ্যে প্রযুক্তিটি কতটা নির্ভুলভাবে পার্থক্য করতে পারে, সেটি ব্যবহারের অভিজ্ঞতা ও স্বাধীন পরীক্ষার মাধ্যমে আরও পরিষ্কার হওয়ার বিষয়।
ফটোন মেট্রিক্সের একাধিক সংস্করণ বাজারে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাধারণ সংস্করণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৮৮ ডলার। অন্যদিকে ঘরের বাইরে ব্যবহারের জন্য ঘূর্ণায়মান বেজসহ সংস্করণটির দাম ১ হাজার ১১৮ ডলার বলে জানানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে এর আগাম বুকিংও শুরু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দাম বিবেচনায় এটি সাধারণ মশা নিধন পণ্যের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল। ফলে প্রযুক্তিটি সাধারণ পরিবারের দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য কতটা জনপ্রিয় হবে, সেটি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন রয়েছে।
তবে মশা নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিনির্ভর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার প্রতি আগ্রহ বাড়লে ভবিষ্যতে এ ধরনের পণ্যের আরও উন্নত ও তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী সংস্করণ বাজারে আসতে পারে।
ফটোন মেট্রিক্স দৃশ্যমান নীল লেজার এবং অদৃশ্য ইনফ্রারেড লেজার দুই ধরনের সংস্করণে পাওয়া যাচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। নীল লেজারের তরঙ্গদৈর্ঘ্য ৪৫০ ন্যানোমিটার এবং ইনফ্রারেড লেজারের তরঙ্গদৈর্ঘ্য ৯৭৬ ন্যানোমিটার।
তবে লেজার ব্যবহারের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ঝুঁকিও রয়েছে। বিশেষ করে অদৃশ্য ইনফ্রারেড লেজার খালি চোখে দেখা যায় না। ফলে সরাসরি চোখে পৌঁছালে গুরুতর ক্ষতির আশঙ্কা থাকতে পারে। এ কারণে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় সনদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এই পণ্যের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সনদ ও স্বাধীন পরীক্ষার প্রক্রিয়া চলছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে প্রযুক্তিটি বাণিজ্যিকভাবে কতটা নিরাপদ এবং বাস্তব পরিবেশে এর কার্যকারিতা কেমন এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে স্বাধীন পরীক্ষার ফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিশেষ করে শিশু, পোষা প্রাণী এবং ঘরে থাকা অন্যান্য মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি এখানে গুরুত্ব পাওয়া স্বাভাবিক। কারণ লেজারভিত্তিক কোনো স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র মানুষের আশপাশে কাজ করলে ভুল শনাক্তকরণ বা অনাকাঙ্ক্ষিত লেজার নির্গমনের ঝুঁকি যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
মশাবাহিত বিভিন্ন রোগের কারণে বিশ্বজুড়েই মশা নিয়ন্ত্রণ একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য বিষয়। এত দিন মশা দমনে রাসায়নিক স্প্রে, কয়েল, মশারি কিংবা অন্যান্য প্রচলিত পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়েছে। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এখন স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ও লক্ষ্যভিত্তিক নিয়ন্ত্রণের ধারণাও সামনে আসছে।
ফটোন মেট্রিক্স সেই পরিবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হতে পারে। মশা শনাক্ত করা, তার অবস্থান নির্ধারণ করা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখানোর মতো কাজ যদি নির্ভুলভাবে করা সম্ভব হয়, তাহলে ভবিষ্যতে মশা নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তিতে এটি নতুন দিক খুলে দিতে পারে।

