খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeবিশ্ব সংবাদবাংলাদেশবিচারের আগে দীর্ঘ আটক বন্ধে বাংলাদেশকে দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান এইচআরডব্লিউর

বিচারের আগে দীর্ঘ আটক বন্ধে বাংলাদেশকে দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান এইচআরডব্লিউর

সংস্থাটির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকেই প্রবীণ। তাঁদের কেউ কেউ গুরুতর অসুস্থ এবং নিয়মিত চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে। পরিবারের সদস্য ও আইনজীবীদের অভিযোগ, অনেক বন্দী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন না। একই সঙ্গে জামিন পাওয়ার ক্ষেত্রেও নানা জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন তাঁরা।

বিচার শুরুর আগেই রাজনৈতিক বিরোধীসহ শত শত মানুষকে দীর্ঘ সময় কারাগারে আটকে রাখার অবসান চায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটির মতে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণ না থাকলে বছরের পর বছর কারাগারে রাখা ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশেষ করে বয়স্ক ও অসুস্থ বন্দীদের চিকিৎসা ও জামিনের অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।

নিউইয়র্কভিত্তিক এই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনটি সোমবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বহু নেতা-কর্মী, সাবেক সংসদ সদস্য, সরকারি কর্মকর্তা, সাংবাদিক, অধিকারকর্মী এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের কারও বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে, আবার অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও এখনো বিচার বা অভিযোগ গঠনের পর্যায়ে পৌঁছানো হয়নি।

এইচআরডব্লিউর বক্তব্য অনুযায়ী, অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে অনির্দিষ্টকাল আটক রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একইভাবে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে হত্যা, গুম, নির্যাতন বা অন্য গুরুতর অপরাধের অভিযোগ থাকলেও সেই অভিযোগের বিচার হতে হবে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাপক গ্রেপ্তার

২০২৪ সালের আগস্টে কয়েক সপ্তাহের তীব্র বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার পর শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান। এরপর দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ এবং তৎকালীন সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে মামলা ও গ্রেপ্তার শুরু হয়।

এইচআরডব্লিউ বলছে, এসব মামলার কিছুতে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বিক্ষোভের সময় সহিংসতা, হত্যাকাণ্ড, গুম এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের মতো বিষয় তদন্তের দাবি রাখে। তবে একই সময়ে এমন অনেক মানুষও গ্রেপ্তার হয়েছেন, যাঁদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অপরাধের প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।

সংস্থাটির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকেই প্রবীণ। তাঁদের কেউ কেউ গুরুতর অসুস্থ এবং নিয়মিত চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে। পরিবারের সদস্য ও আইনজীবীদের অভিযোগ, অনেক বন্দী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন না। একই সঙ্গে জামিন পাওয়ার ক্ষেত্রেও নানা জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন তাঁরা।

নতুন মামলা দিয়ে জামিন ঠেকানোর অভিযোগ

এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হলো, কোনো কোনো ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পরও তাঁকে মুক্তি না দিয়ে নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিম্ন আদালত ও জেলা আদালতে বারবার জামিন আবেদন নাকচ করা হচ্ছে। আবার কোনো ক্ষেত্রে উচ্চ আদালত জামিন মঞ্জুর করলেও নতুন মামলা দিয়ে সেই জামিন কার্যকর করার সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।

এ ধরনের পরিস্থিতি বিচারপ্রক্রিয়ার ওপর মানুষের আস্থা দুর্বল করতে পারে বলে মনে করছে মানবাধিকার সংগঠনটি। কারণ একজন বন্দী যদি আদালতের মাধ্যমে জামিন পাওয়ার পরও নতুন মামলায় আটক থাকেন, তাহলে তাঁর জন্য আইনি প্রতিকার পাওয়ার পথ কার্যত দীর্ঘ হয়ে যায়।

এই পরিস্থিতির উদাহরণ হিসেবে ৮২ বছর বয়সী সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের ঘটনা উল্লেখ করেছে এইচআরডব্লিউ।

এ বি এম খায়রুল হকের মামলা

এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ২৪ জুলাই বিক্ষোভে অংশ নেওয়া একজনকে হত্যার অভিযোগে সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর কয়েক মাসের মধ্যে দুর্নীতিসহ আরও একাধিক মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

তাঁর বয়স ও শারীরিক অবস্থার বিষয়টিও প্রতিবেদনে গুরুত্ব পেয়েছে। পরিবারের সদস্যদের দাবি, কারাগারে থাকার সময় তিনি একবার হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হন। এরপরও বিভিন্ন মামলায় তাঁর জামিন আবেদন নিম্ন আদালতে নাকচ করা হয়।

পরবর্তীতে হাইকোর্ট তাঁর জামিন মঞ্জুর করলেও মুক্তির আগেই তাঁকে আরও দুটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ফলে আগের জামিন আদেশ কার্যকর হয়নি।

পরে ওই মামলাগুলোতেও নিম্ন আদালত জামিন নাকচ করে দেয়। তবে হাইকোর্ট আবারও জামিন মঞ্জুর করে। এরপর তাঁর মুক্তির আগেই নতুন একটি হত্যা মামলা করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এইচআরডব্লিউর দাবি, নতুন মামলার ঘটনাস্থল ও আগের মামলার ঘটনাস্থলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও একই সময়ে দুটি ঘটনায় তাঁর উপস্থিতি দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। পরবর্তীতে আবারও নতুন মামলা করা হয়। শেষ পর্যন্ত আপিল বিভাগের হস্তক্ষেপের পর ১৯ আগস্ট তিনি মুক্তি পান।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দীর্ঘ সময় আটক থাকার পরও পুরো সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন হয়নি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

আইনজীবীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে হতাশা

দীর্ঘদিন ধরে আটক থাকা ব্যক্তিদের কয়েকজনের আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। আইনজীবীরা জানিয়েছেন, অনেক সময় তাঁরা তাঁদের মক্কেলদের জামিনের আবেদন করতেও নিরুৎসাহিত করছেন।

এর কারণ হিসেবে তাঁরা বলছেন, কোনো বন্দী জামিন পেলে পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে নতুন মামলা দায়ের করতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে। ফলে একটি মামলা থেকে জামিন পেলেও কারাগার থেকে বের হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে না।

আইনজীবীদের এমন বক্তব্য বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। আদালত যদি একজন ব্যক্তিকে জামিন দেন, কিন্তু অন্য একটি মামলার মাধ্যমে তাঁকে আবার আটক রাখা হয়, তাহলে আদালতের জামিন আদেশ বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে—সেই প্রশ্ন সামনে আসে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়েও প্রশ্ন

এইচআরডব্লিউ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অধীনে আটক ব্যক্তিদের বিষয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে।

সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইন অনুযায়ী অভিযোগ গঠনের আগে কাউকে এক বছরের বেশি সময় আটক রাখার সুযোগ কেবল ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে থাকার কথা। কিন্তু বর্তমানে আটক থাকা ১৬০ জনের বেশি ব্যক্তির কারও জামিন এখন পর্যন্ত মঞ্জুর হয়নি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

এ ধরনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে মানবাধিকার সংগঠনটি।

এইচআরডব্লিউর মতে, বিচার শুরুর আগে আটক রাখার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নির্দিষ্ট আইনি প্রয়োজন পূরণ করা। এটি যেন শাস্তির বিকল্প হয়ে না যায়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।

২২ মাস ধরে অভিযোগ ছাড়াই কারাগারে

প্রতিবেদনে কয়েকজন প্রবীণ বন্দীর পরিস্থিতি তুলে ধরে দীর্ঘমেয়াদি আটকের মানবিক দিকটি সামনে আনা হয়েছে।

শেখ হাসিনার সাবেক উপদেষ্টা ৮১ বছর বয়সী তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীকে ২০২৪ সালের অক্টোবরে আটক করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর প্রায় ২২ মাস পার হলেও তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন হয়নি বলে দাবি করেছে এইচআরডব্লিউ।

২০২৬ সালের এপ্রিলে তিনি জামিনের আবেদন করেন। তবে ট্রাইব্যুনাল জামিন মঞ্জুর করেননি। একই সঙ্গে তাঁকে এত দীর্ঘ সময় আটকে রাখার ক্ষেত্রে কোনো ‘ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি’র ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়নি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। শুনানি একাধিকবার পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং সর্বশেষ আগস্টের শেষ সময় পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করা হয়।

এ ধরনের দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংগঠনটি।

গুরুতর অসুস্থ বন্দীদের নিয়েও উদ্বেগ

সাবেক সংসদ সদস্য ৭৫ বছর বয়সী কামাল আহমেদ মজুমদারের বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তাঁর পরিবার জানিয়েছে, কারাগারে থাকা অবস্থায় তাঁর পায়ে গ্যাংগ্রিন হয়। পরে তাঁর পায়ের তিনটি আঙুল কেটে ফেলতে হয়েছে। একই সময়ে পড়ে গিয়ে তাঁর কোমরের হাড়ও ভেঙে যায়।

এত গুরুতর শারীরিক সমস্যার মধ্যেও তাঁর জামিন আবেদন নাকচ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ৭৫ বছর বয়সী শাহরিয়ার কবিরের শারীরিক অবস্থার কথাও তুলে ধরেছে এইচআরডব্লিউ। তাঁর চলাচলের জন্য হুইলচেয়ারের প্রয়োজন হয়। অধিকারকর্মীরা তাঁর মুক্তির দাবি জানিয়েছেন।

৭১ বছর বয়সী র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীও দীর্ঘ সময় ধরে আটক রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তাঁর হৃদ্‌যন্ত্রের গুরুতর সমস্যা রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

এসব ঘটনা দেখিয়ে এইচআরডব্লিউ বলছে, প্রবীণ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি আটক বিশেষভাবে মানবিক সংকট তৈরি করতে পারে।

কারাগারে মৃত্যুর ঘটনাও উদ্বেগজনক

দীর্ঘদিন আটক থাকা অবস্থায় কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যুর বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য ৮৫ বছর বয়সী রমেশ চন্দ্র সেনকে ২০২৪ সালের আগস্টে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল। ২০২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি কারাগারে থাকা অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। পরিবারের অভিযোগ, তিনি প্রয়োজনীয় ওষুধ পাননি এবং তাঁর জামিন আবেদনও নাকচ করা হয়েছিল।

এ ছাড়া জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য এস এম জিয়াউল জিয়ার মৃত্যুর ঘটনাও প্রতিবেদনে এসেছে। ৬৫ বছর বয়সী এই ব্যক্তিকে আটক করার সময়ই তিনি অসুস্থ ছিলেন বলে পরিবার জানিয়েছে। পরে জামিন আবেদন নাকচ হওয়ার পর ১৪ এপ্রিল তাঁর মৃত্যু হয়।

এই ঘটনাগুলো কারাগারে আটক ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যসেবা এবং চিকিৎসার অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে কী বলা আছে

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে বিচার শুরুর আগে কাউকে আটক রাখার সুযোগ পুরোপুরি নিষিদ্ধ নয়। তবে এটি নিয়মিত ব্যবস্থা হতে পারে না। কোনো ব্যক্তিকে বিচার শুরুর আগে আটক করার প্রয়োজন আছে কি না, তা প্রতিটি মামলার পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

বিশেষ করে পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা, সাক্ষীদের ওপর প্রভাব বিস্তার বা তদন্তে বাধা দেওয়ার মতো বাস্তব কারণ থাকলে আদালত প্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারেন। কিন্তু শুধু রাজনৈতিক পরিচয় বা অতীতের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে দীর্ঘদিন আটক রাখা ন্যায়বিচারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

একই সঙ্গে বিচার শুরুর আগে আটক থাকা প্রত্যেক ব্যক্তির দ্রুত বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। বিচার বিলম্বিত হলে মুক্তি বা উপযুক্ত জামিনের সুযোগও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিতে একজন ব্যক্তিকে আদালতে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ হিসেবে বিবেচনা করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বিচার শেষ হওয়ার আগেই দীর্ঘ সময় কারাগারে রাখার বিষয়টি বিশেষ সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল নিয়েও আপত্তি

বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য নতুন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠনের উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে এইচআরডব্লিউ।

সংস্থাটির আশঙ্কা, প্রস্তাবিত আইন বর্তমান অবস্থায় কার্যকর হলে ইচ্ছেমতো গ্রেপ্তার এবং দীর্ঘমেয়াদি আটক রাখার অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে নতুন কমিশনের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

এইচআরডব্লিউ মনে করে, একটি কার্যকর মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনভাবে অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ করার ক্ষমতা থাকা দরকার। বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রতিশোধমূলক গ্রেপ্তার বা হয়রানির অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করার সুযোগ থাকা জরুরি।

সরকারের প্রতি এইচআরডব্লিউর আহ্বান

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিভাগের পরিচালক এলাইন পিয়ারসন বলেছেন, এক সরকারের পর আরেক সরকারের সময়েও রাজনৈতিক বিরোধীদের দীর্ঘদিন আটক রাখার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাঁর মতে, সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রথম দিকের পদক্ষেপ হিসেবেই রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অনির্দিষ্টকাল আটকে রাখার অবসান হওয়া উচিত।

পিয়ারসনের বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযোগ গঠনের আগেই যদি প্রবীণ ব্যক্তিরা কারাগারে মারা যান, তাহলে সেটি বিচারপূর্ব আটককে ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করার আন্তর্জাতিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তিনি আরও বলেছেন, সরকারের নজরদারিতে কারাগারে যেসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর প্রতিটি স্বাধীনভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো অভিযোগ ছাড়াই মানুষকে দীর্ঘদিন কারাগারে আটকে রাখার প্রথা বন্ধ করা উচিত।

সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর গুরুতর অপরাধের বিচার ও দায়ীদের জবাবদিহির দাবি জোরালো হয়েছে। সেই বিচার অবশ্যই হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়া যেন রাজনৈতিক প্রতিশোধে পরিণত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।

একজন ব্যক্তি আওয়ামী লীগের নেতা, সাবেক কর্মকর্তা, রাজনৈতিক সমর্থক কিংবা সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি—শুধু এই পরিচয়ের কারণে তাঁকে অনির্দিষ্টকাল আটক রাখা আইনের শাসনের জন্য ভালো বার্তা নয়। আবার কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ থাকলে তাঁর বিচারও দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করা দরকার।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আদালতের স্বাধীনতা, জামিনের অধিকার, দ্রুত বিচার এবং কারাগারে পর্যাপ্ত চিকিৎসা—এসব মৌলিক অধিকার যেন রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল না হয়।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের মূল বার্তাও সেখানেই। অপরাধের বিচার করতে হবে, কিন্তু বিচার শুরুর আগেই কাউকে শাস্তির মতো করে বছরের পর বছর কারাগারে রাখা যাবে না। সরকারের সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কার্যকর করতে হলে আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং ন্যায়বিচারের এই মৌলিক নীতিগুলোকে সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে।

সূত্র: হিউম্যানরাইটসওয়াচ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আর্কাইভ