পুজো মানেই নতুন পোশাক, সাজগোজ আর নিজের লুককে একটু আলাদা করে তোলার চেষ্টা। শাড়ি, গয়না কিংবা মেকআপের পাশাপাশি এখন সাজের অন্যতম অংশ হয়ে উঠেছে নেল আর্ট এবং জেল ম্যানিকিউর। দীর্ঘক্ষণ চকচকে থাকে, সহজে রং উঠে যায় না এবং নখে সুন্দর ফিনিশ পাওয়া যায়—এই কারণেই পুজোর আগে জেল নেলপলিশ করানোর প্রবণতা বাড়ছে।
কিন্তু ঝকঝকে এই নখের আড়ালে থাকা একটি রাসায়নিক নিয়ে সম্প্রতি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাসায়নিকটির নাম ট্রাইমিথাইলবেনজয়েল ডাইফেনাইলফসফিন অক্সাইড, সংক্ষেপে TPO।
জেল নেলপলিশকে দ্রুত শক্ত বা সেট করতে UV কিংবা LED ল্যাম্পের আলো ব্যবহার করা হয়। সেই প্রক্রিয়ায় TPO গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কসমেটিকসে এই উপাদান নিষিদ্ধ করেছে। ব্রিটেনেও ২০২৬ সালের ১৫ আগস্ট থেকে TPO-যুক্ত নেলপলিশের উৎপাদন ও বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন উঠছে, ভারতে কী পরিস্থিতি? পুজোর আগে একবার জেল নেলপলিশ করালেই কি বিপদ?
TPO হল এক ধরনের ফটো-ইনিশিয়েটর। নামটা কঠিন হলেও কাজটি সহজভাবে বোঝা যায়।
জেল নেলপলিশ সাধারণ নেলপলিশের মতো শুধু বাতাসে শুকিয়ে যায় না। নখে লাগানোর পর সেটিকে UV বা LED ল্যাম্পের আলোতে রাখতে হয়। আলো পড়লে TPO রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু করতে সাহায্য করে। এর ফলে জেল দ্রুত শক্ত হয়ে যায় এবং নখে দীর্ঘস্থায়ী, চকচকে ফিনিশ তৈরি হয়।
এই কারণেই দীর্ঘস্থায়ী জেল ম্যানিকিউরের ফর্মুলায় এই ধরনের ফটো-ইনিশিয়েটর ব্যবহার করা হয়।
শুধু নেল কসমেটিকসেই নয়, আলো ব্যবহার করে দ্রুত শুকানো বা শক্ত করার প্রয়োজন হয়—এমন কিছু শিল্পক্ষেত্রেও TPO-র ব্যবহার রয়েছে।
TPO নিয়ে মূল উদ্বেগ প্রজনন-সংক্রান্ত বিষক্রিয়া বা reproductive toxicity।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নে প্রাণীদের ওপর করা পরীক্ষায় উচ্চ মাত্রায় TPO-র সংস্পর্শের পর কিছু ক্ষতিকর প্রভাব দেখা গিয়েছে। বিশেষ করে পরীক্ষাগারের ইঁদুরের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন উচ্চ মাত্রায় TPO প্রয়োগের পর লিভার ও কিডনিতে ক্ষতির মতো পরিবর্তন এবং পুরুষ ইঁদুরের অণ্ডকোষে ক্ষয় বা testicular atrophy দেখা গিয়েছিল।
এই গবেষণাগুলো থেকেই মানুষের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার। প্রাণীর ওপর উচ্চ মাত্রার এক্সপোজারের ফলাফলকে সরাসরি মানুষের ক্ষেত্রে একই মাত্রার ঝুঁকি হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
TPO নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে অনেক সময় বিভিন্ন তথ্য একসঙ্গে মিশে যায়। ফলে মানুষের মধ্যে অযথা আতঙ্ক তৈরি হতে পারে।
বর্তমান মূল্যায়নে TPO-কে মানুষের সরাসরি ক্যানসার সৃষ্টিকারী রাসায়নিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়নি। একইভাবে জিনগত ক্ষতির বিষয়েও উল্লেখযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
মূল উদ্বেগটি হচ্ছে reproductive toxicity বা প্রজনন ব্যবস্থার ওপর সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব।
ইউরোপীয় কসমেটিকস আইনে নির্দিষ্ট ধরনের বিপজ্জনক রাসায়নিককে বিশেষ শ্রেণিতে রাখা হলে কসমেটিকসে সেগুলোর ব্যবহার নিষিদ্ধ করার বিধান রয়েছে। TPO-কে ঘিরে নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রেও এই নিয়ন্ত্রক কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ।
এটাই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
শুধু পুজোর আগে একবার বা মাঝেমধ্যে জেল নেলপলিশ করানোর কারণে বড় ধরনের বিপদ হবেই—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো তথ্য নেই। যেসব ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, সেগুলোর অনেকটাই উচ্চ মাত্রার এক্সপোজারের পরীক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত।
একজন সাধারণ গ্রাহক মাসে একবার বা বিশেষ অনুষ্ঠানের আগে জেল ম্যানিকিউর করালে তাঁর TPO এক্সপোজার গবেষণায় ব্যবহৃত উচ্চ মাত্রার কাছাকাছি হবে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
তবে নিয়মিত ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা ভালো।
যাঁরা নেল সেলুন বা পার্লারে নিয়মিত কাজ করেন, তাঁদের বিষয়টি একটু আলাদা। একজন গ্রাহক মাঝে মাঝে জেল নেলপলিশ করান। কিন্তু একজন নেল টেকনিশিয়ান দিনে একাধিকবার বিভিন্ন ধরনের নেল প্রোডাক্ট ব্যবহার করতে পারেন।
ফলে তাঁদের রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বেশি। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ধরে কর্মক্ষেত্রে এক্সপোজার হলে সঠিক বায়ু চলাচল, নিরাপদ কাজের পদ্ধতি এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ব্রিটেনে TPO নিয়ে কড়া নিয়ন্ত্রণ চালু হলেও ভারতে একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে কি না, তা নিয়ে আলাদা করে স্থানীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়ম এবং নির্দিষ্ট পণ্যের লেবেল যাচাই করা প্রয়োজন।
অর্থাৎ বিদেশে কোনও উপাদান নিষিদ্ধ হয়েছে বলেই একই মুহূর্তে ভারতের সব কসমেটিক পণ্য থেকেও সেটি নিষিদ্ধ হয়ে যায় না।
ভারতে জেল নেলপলিশ ব্যবহার করার ক্ষেত্রে তাই পণ্যের উপাদানের তালিকা দেখা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে TPO-free বা বিকল্প ফটো-ইনিশিয়েটর ব্যবহার করা ফর্মুলা পাওয়া গেলে সেটি বিবেচনা করা যেতে পারে।
পুজোর সাজে জেল নেলপলিশ করানোর পরিকল্পনা থাকলে কয়েকটি সহজ বিষয় মাথায় রাখা যায়।
প্রথমত, পার্লারে কোন ব্র্যান্ডের নেলপলিশ ব্যবহার করা হচ্ছে এবং তার উপাদানের তালিকা কী, তা জেনে নিন।
দ্বিতীয়ত, সম্ভব হলে TPO-free ফর্মুলা বেছে নিতে পারেন।
তৃতীয়ত, যাঁরা নিয়মিত সেলুনে কাজ করেন, তাঁদের কর্মক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল এবং নিরাপদ ব্যবহারের ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
চতুর্থত, নখের চারপাশে জ্বালা, লালচে ভাব, চুলকানি বা অন্য কোনও অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে ব্যবহার বন্ধ করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
TPO নিয়ে নিয়ন্ত্রণ বাড়ার পর কসমেটিক শিল্পে বিকল্প ফটো-ইনিশিয়েটর ব্যবহারের প্রবণতাও বেড়েছে। বিভিন্ন দেশে TPO-র পরিবর্তে অন্য উপাদান ব্যবহার করে জেল নেলপলিশের ফর্মুলা তৈরি করা হচ্ছে।
তাই জেল ম্যানিকিউর মানেই TPO ব্যবহার করতে হবে—এমন নয়। বাজারে বিকল্প ফর্মুলাও পাওয়া যেতে পারে।
এর সরাসরি উত্তর নেই।
যাঁরা মাঝেমধ্যে জেল নেলপলিশ করেন, তাঁদের জন্য বিদেশে TPO নিষিদ্ধ হওয়ার খবর শুনে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে নিজের ব্যবহারের ধরন, পণ্যের উপাদান এবং স্থানীয় কসমেটিকস-নিয়ম সম্পর্কে সচেতন থাকা ভালো।
বিশেষ করে যাঁরা নিয়মিত নেল সেলুনে কাজ করেন, তাঁদের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি রাসায়নিক এক্সপোজারের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
পুজোর সাজে সুন্দর নখ চাইতেই পারেন। কিন্তু তার সঙ্গে একটু সচেতন থাকাও জরুরি। নেলপলিশের বোতলে লেখা উপাদানের তালিকাটা একবার দেখে নেওয়া খুব কঠিন কাজ নয়। বরং কয়েক সেকেন্ডের এই অভ্যাসই আপনাকে আরও সচেতনভাবে পছন্দ করার সুযোগ দিতে পারে।
তাই জেল নেলপলিশ নিয়ে আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন তথ্য জেনে সিদ্ধান্ত নেওয়া।

