যশোরের আড়াইশ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। ইউনিটটি সচল করতে রাজস্ব খাতে মোট ৩৩টি পদ সৃজনের অনুমোদন দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে ২০টি পদ স্থায়ী এবং ১৩টি পদ বছর বছর সংরক্ষণের ভিত্তিতে রাখার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে যশোরসহ আশপাশের জেলার হৃদ্রোগীদের জন্য সরকারি পর্যায়ে জরুরি ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ আরও বাড়বে। দীর্ঘদিন ধরে ভবন ও বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকলেও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় পূর্ণাঙ্গভাবে সিসিইউ সেবা চালু করা সম্ভব হয়নি।
৩৩ পদে জনবল নিয়োগের অনুমোদন
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. মোস্তফা মনোয়ার স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবকে জানানো হয়েছে। অনুমোদিত ৩৩টি পদের মধ্যে স্থায়ী ২০টি পদ এবং বছর বছর সংরক্ষণের ভিত্তিতে ১৩টি পদ রয়েছে।
স্থায়ী পদগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসক ও চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট পদ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে সিনিয়র কনসালট্যান্ট (কার্ডিওলজি), সিনিয়র কনসালট্যান্ট (এনেসথেসিয়া), জুনিয়র কনসালট্যান্ট (এনেসথেসিয়া) এবং এনেসথেটিস্ট পদে একটি করে পদ রয়েছে।
এ ছাড়া জুনিয়র কনসালট্যান্ট (কার্ডিওলজি) ও সহকারী রেজিস্ট্রার পদে দুটি করে এবং মেডিক্যাল অফিসারের জন্য ১২টি পদ সৃজনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদও থাকছে
সিসিইউ পরিচালনার জন্য শুধু চিকিৎসক নয়, প্রয়োজনীয় নার্সিং, প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক জনবলও গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে অনুমোদিত পদগুলোর মধ্যে নার্সিং সুপারভাইজার, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (রেডিওগ্রাফি), ফার্মাসিস্ট (ডিপ্লোমা), পরিসংখ্যান কর্মকর্তা, স্টোর কিপার, ফার্মেসি সহকারী, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক, টিকিট ক্লার্ক ও রিসিপশনিস্ট পদে একটি করে পদ রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) এবং কম্পিউটার অপারেটর পদে দুটি করে পদ অনুমোদন করা হয়েছে। ফলে সিসিইউ চালুর জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, নার্সিং, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার কাঠামো তৈরির সুযোগ তৈরি হয়েছে।
দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান হতে পারে
যশোর করোনারি কেয়ার ইউনিটে ৩৩টি পদ সৃজনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী এবং যশোর-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
যশোরে পূর্ণাঙ্গ করোনারি কেয়ার ইউনিট চালু করা ছিল তার নির্বাচনী অঙ্গীকারের একটি অংশ। সংশ্লিষ্টদের আশা, অনুমোদিত পদগুলোতে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের মাধ্যমে চলতি বছরের মধ্যেই ইউনিটটির পূর্ণাঙ্গ সেবা চালু করা সম্ভব হবে।
২০০১ সালে শুরু হয়েছিল উদ্যোগ
যশোরে পূর্ণাঙ্গ করোনারি কেয়ার ইউনিট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল দুই দশকেরও বেশি সময় আগে। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশনা এবং সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলামের প্রচেষ্টায় যশোরে পূর্ণাঙ্গ সিসিইউ স্থাপনের কাজ শুরু হয়।
পরবর্তীতে এ জন্য তিনতলা একটি ভবন নির্মাণ করা হয়। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামও কেনা হয়েছিল। কিন্তু ভবন ও সরঞ্জাম প্রস্তুত থাকলেও পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ না হওয়ায় সিসিইউটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি।
দীর্ঘ সময় ধরে পড়ে থাকার কারণে দামি চিকিৎসা সরঞ্জামের একটি অংশও নষ্ট হয়ে যায়। ফলে যশোরবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা বাস্তবে রূপ নেয়নি।
এবার বাস্তবায়নের পথে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি
সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনের আগে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত যশোরের করোনারি কেয়ার ইউনিট পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সরকার গঠনের ছয় মাসের মধ্যেই সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
জনবল সৃজনের অনুমোদনকে এ ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ এতদিন ভবন ও কিছু সরঞ্জাম থাকলেও চিকিৎসক, মেডিক্যাল অফিসার, নার্সিংসহ প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় পূর্ণাঙ্গ সেবা দেওয়া সম্ভব হয়নি।
আশপাশের জেলার মানুষও পাবেন সুবিধা
যশোর মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. ফারুক এহতেশাম পরাগ বলেন, সিসিইউ পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হওয়া শুধু যশোরবাসীর জন্য নয়, আশপাশের জেলার বাসিন্দাদের জন্যও বড় সুখবর।
তিনি বলেন, এতদিন যশোর জেনারেল হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিট বাইরে থেকে দেখা গেলেও ভেতরে গিয়ে মানুষ প্রয়োজনীয় সেবা নিতে পারতেন না। চলতি বছরের মধ্যেই সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তার মতে, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এ বছরের মধ্যেই ইউনিটটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিচ্ছেন।
এনজিওগ্রাম মেশিন বসানোর প্রস্তুতি
সিসিইউ চালুর প্রস্তুতি হিসেবে হাসপাতালের ভেতরে অবকাঠামোগত কিছু কাজও শুরু হয়েছে। ডা. ফারুক এহতেশাম পরাগ জানান, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বৈঠক হয়েছে। এনজিওগ্রাম মেশিন বসানোর জন্য নির্ধারিত কক্ষ খালি করার কাজও শুরু হয়েছে।
পাশাপাশি চিকিৎসকদের বসার জায়গা এবং আউটডোর বিভাগসহ হাসপাতালের বিভিন্ন অংশের স্থান পুনর্বিন্যাসের কাজ চলছে। অর্থাৎ শুধু জনবল নিয়োগ নয়, পূর্ণাঙ্গ হৃদ্রোগ চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য হাসপাতালের ভেতরের ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
হৃদ্রোগীদের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ এই সিসিইউ
করোনারি কেয়ার ইউনিট বা সিসিইউ মূলত গুরুতর হৃদ্রোগে আক্রান্ত রোগীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হয়। হার্ট অ্যাটাক, গুরুতর বুকব্যথা, হৃদ্যন্ত্রের ছন্দের সমস্যা কিংবা অন্যান্য জটিল হৃদ্রোগের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যশোরের মতো বড় একটি অঞ্চলে পূর্ণাঙ্গ সিসিইউ চালু হলে জরুরি হৃদ্রোগীদের দূরের বড় শহরে নেওয়ার প্রয়োজন কিছুটা কমতে পারে। বিশেষ করে সংকটাপন্ন রোগীর ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা গেলে ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।
এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে যশোরবাসী পূর্ণাঙ্গ সিসিইউ চালুর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। এখন ৩৩টি পদ সৃজনের অনুমোদন এবং অবকাঠামোগত প্রস্তুতির ফলে সেই প্রত্যাশা পূরণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের আশা, অনুমোদিত পদগুলোতে দ্রুত জনবল নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম স্থাপনের কাজ শেষ করা গেলে যশোর জেনারেল হাসপাতালে পূর্ণাঙ্গ করোনারি কেয়ার ইউনিটের সেবা চালু করা সম্ভব হবে। এতে যশোরের পাশাপাশি খুলনা বিভাগের আশপাশের বিভিন্ন এলাকার হৃদ্রোগীরাও উপকৃত হতে পারেন।
খবর: বাসস।

