খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeদেশজুড়েভবদহের জলাবদ্ধতা: হাজার কোটি টাকা খরচের পরও কেন মিলছে না সুফল?

ভবদহের জলাবদ্ধতা: হাজার কোটি টাকা খরচের পরও কেন মিলছে না সুফল?

টিআরএম হলো এমন একটি পানি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি, যেখানে জোয়ারের পানি নির্দিষ্ট বিলে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। এর ফলে জোয়ারের সঙ্গে আসা পলি বিলে জমা হতে পারে এবং নদীর তলদেশে অতিরিক্ত পলি জমার প্রবণতা কমে। পাশাপাশি ভাটার সময় পানি বের হওয়ার মাধ্যমে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হয়।

নিউজবাংলা ডেস্ক : বৃষ্টি নামলেই যেন দুর্ভোগের নতুন অধ্যায় শুরু হয় যশোরের ভবদহ অঞ্চলে। কয়েক ঘণ্টা কিংবা কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে পানি জমে যায় বাড়ির উঠানে। কোথাও সেই পানি ঢুকে পড়ে বসতঘরে, রান্নাঘরে কিংবা গোয়ালঘরে। কোনো কোনো এলাকায় হাঁটুপানি পেরিয়ে চলাচল করতে হয়, আবার কোথাও পানি কোমর পর্যন্ত উঠে যায়। গবাদিপশু নিয়ে মানুষকে আশ্রয় নিতে হয় উঁচু সড়ক বা বাঁধের ওপর। বছরের পর বছর ধরে এমন বাস্তবতার মধ্যেই জীবন কাটছে ভবদহের মানুষের।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতি নতুন নয়। দীর্ঘ চার দশক ধরে জলাবদ্ধতা দূর করার নামে একের পর এক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। সরকারি হিসাব ও স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দশকে ভবদহ অববাহিকায় ২১টি প্রকল্পে হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। কিন্তু এত বিপুল অর্থ খরচের পরও বর্ষা এলেই কেন আবার পানির নিচে চলে যায় বিস্তীর্ণ এলাকা?

সর্বশেষ প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নদ-নদী পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কাজও অনেকটা এগিয়েছে। কিন্তু চলতি বর্ষায়ও ভবদহবাসী কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি পাননি। ফলে নদী খনন, স্লুইসগেট, পাম্প কিংবা নতুন প্রকল্প—কোনোটিই কি একা এই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সমাধান করতে পারছে না?

ভবদহ অঞ্চলে জলাবদ্ধতার চিত্র

যশোর সদর উপজেলার কিছু অংশ, অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার কিছু এলাকা নিয়ে গড়ে উঠেছে ভবদহ অঞ্চল। এ অঞ্চলের বিস্তীর্ণ ভূমি নিম্নাঞ্চল হওয়ায় বর্ষাকালে পানি নিষ্কাশনের ওপর মানুষের জীবন ও কৃষি ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

এখানকার ৫৪টি বিলের পানি শ্রী নদীর ওপর নির্মিত ভবদহ স্লুইসগেটের মাধ্যমে নিষ্কাশিত হওয়ার কথা। পাশাপাশি মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদ-নদীও পানি চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ পথ।

কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এসব নদ-নদীতে পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়ায় পানি স্বাভাবিক গতিতে বের হতে পারছে না। ফলে অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টিও দ্রুত বড় ধরনের জলাবদ্ধতা তৈরি করছে।

সাম্প্রতিক বর্ষায় ভবদহের নিম্নাঞ্চলের বহু গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানি ঢুকে পড়েছে বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সড়ক, ধর্মীয় উপাসনালয়, মাছের ঘের এবং কৃষিজমিতে। কোথাও কয়েক দিন ধরে পানি আটকে থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

কেন এত প্রকল্পের পরও সমস্যার সমাধান হচ্ছে না?

ভবদহের জলাবদ্ধতা শুধু অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে তৈরি হয় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নদীর নাব্যতা, পলি জমা, পানি নিষ্কাশনের পথ সংকুচিত হওয়া, অপরিকল্পিত অবকাঠামো এবং জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার মতো একাধিক কারণ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০১৩ সালের পর থেকে ভবদহ এলাকার কোনো বিলে কার্যকরভাবে টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট বা টিআরএম চালু না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

টিআরএম হলো এমন একটি পানি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি, যেখানে জোয়ারের পানি নির্দিষ্ট বিলে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। এর ফলে জোয়ারের সঙ্গে আসা পলি বিলে জমা হতে পারে এবং নদীর তলদেশে অতিরিক্ত পলি জমার প্রবণতা কমে। পাশাপাশি ভাটার সময় পানি বের হওয়ার মাধ্যমে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হয়।

স্থানীয় আন্দোলনকারীদের মতে, এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে কাজে না লাগিয়ে শুধু নদী খনন বা পাম্প বসানোর মতো প্রকল্পের ওপর নির্ভর করলে দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।

নদীর বুক ভরাট হয়ে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের পলি জমে মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদীর বিভিন্ন অংশের তলদেশ উঁচু হয়ে গেছে। ফলে বিল থেকে নদীতে পানি নামলেও নদীর পর্যাপ্ত ধারণক্ষমতা না থাকায় তা দ্রুত সরে যেতে পারে না।

আরও পড়ুন :  নেইমার ছাড়াই ব্রাজিল! বিশ্বকাপ ২০২৬-এ ভিনিসিয়াসের নেতৃত্বে হেক্সা জয়ের নতুন রণকৌশল

ভবদহের ভাটির দিকের নদীগুলোর অবস্থাও সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কোনো কোনো স্থানে কয়েকশ ফুট প্রশস্ত নদী দীর্ঘদিনের পলি ও দখলের কারণে অনেকটাই সংকুচিত হয়েছে।

নদীর প্রস্থ ও গভীরতা কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই পানি বহনের ক্ষমতা কমে যায়। বর্ষায় যখন বিল ও নিম্নাঞ্চল থেকে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ পানি নদীতে আসে, তখন নদী সেই পানি দ্রুত গ্রহণ করতে পারে না। এর ফল হিসেবে পানি উল্টো বিল ও বসতিতে ফিরে আসে।

১৪০ কোটি টাকার নদী খনন প্রকল্পেও প্রশ্ন

ভবদহের দীর্ঘদিনের সংকট নিরসনে ২০২৫ সালের অক্টোবরে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নদ-নদী পুনঃখননের কাজ শুরু হয়।

হরিহর, হরি-তেলিগাতি, আপার ভদ্রা, টেকা ও শ্রী নদীর মোট ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার অংশ পুনঃখননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। লক্ষ্য ছিল ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করা।

এই প্রকল্পকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে নতুন করে আশার সৃষ্টি হয়েছিল। দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা এবার হয়তো কিছুটা হলেও কমবে—এমন প্রত্যাশা ছিল তাঁদের।

কিন্তু প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছালেও চলতি বর্ষায় কাঙ্ক্ষিত সুফল না পাওয়ায় সেই আশায় ভাটা পড়েছে।

ভবদহ স্লুইসগেটে বর্তমানে কয়েকটি পাম্প চালু রাখা হয়েছে। পাশাপাশি আরও কয়েকটি পাওয়ার পাম্প স্থাপনের কাজ চলছে। কিন্তু স্থানীয়দের প্রশ্ন, পাম্প দিয়ে কি দীর্ঘমেয়াদে এত বড় এলাকার পানি নিষ্কাশন সম্ভব?

খর্ণিয়া এলাকায় বাধা নিয়েও অভিযোগ

নদী খনন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় খর্ণিয়া সেতুর কাছে ভদ্রা নদীতে দেওয়া একটি অস্থায়ী বাঁধকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

তাঁদের অভিযোগ, এই বাঁধের কারণে ভাটির দিকে নদীর একটি অংশে পলি জমে পানি চলাচলের পথ সংকুচিত হয়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে পারছে না।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, নদী খননের কাজের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় স্থানে জমে থাকা পলি ও অস্থায়ী প্রতিবন্ধকতা অপসারণ করা হয়নি। এর প্রভাব পড়েছে বর্ষার পানি নিষ্কাশনে।

যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ড অবশ্য জানিয়েছে, খর্ণিয়া সেতু এলাকার প্রতিবন্ধকতা অপসারণ করা হয়েছে। ভবদহের কয়েকটি স্লুইসগেটও খুলে দেওয়া হয়েছে এবং উন্নয়নকাজ চলমান রয়েছে।

তবে মাঠের বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগ এখনো কাটেনি।

আমডাঙ্গা খাল কেন গুরুত্বপূর্ণ

ভবদহের পানি নিষ্কাশনের ক্ষেত্রে আমডাঙ্গা খালের গুরুত্ব অনেক। স্থানীয়দের দাবি, এই খাল দিয়ে ভবদহ এলাকার প্রায় এক-চতুর্থাংশ পানি নিষ্কাশনের সুযোগ রয়েছে।

কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে খালটির সংস্কার না হওয়ায় এর কার্যকারিতা কমে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, আমডাঙ্গা খাল সংস্কারের কার্যাদেশ প্রায় দুই বছর আগে দেওয়া হলেও কাজ শুরু হতে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

বৃষ্টির সময় যখন বিলগুলোতে দ্রুত পানি জমে যায়, তখন বিকল্প পানি নিষ্কাশনের পথ কার্যকর না থাকলে পুরো চাপ নদী ও স্লুইসগেটের ওপর পড়ে। ফলে পানি আটকে গিয়ে আশপাশের গ্রামগুলোতে ঢুকে পড়ে।

বাড়িঘর ছেড়ে রাস্তায় মানুষের আশ্রয়

ভবদহের জলাবদ্ধতার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। যাঁদের বসতঘর নিচু এলাকায়, তাঁদের অনেকের ঘরে পানি ঢুকে যায়। রান্নার জায়গা, গোয়ালঘর ও উঠান ডুবে যাওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়ে।

অভয়নগরের ডুমুরতলা গ্রামের কলেজ শিক্ষক সমরেশ বৈরাগীর ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রামের অধিকাংশ বাড়ির উঠানে পানি উঠেছিল। কয়েকটি বাড়ি বাদে প্রায় সব বাড়িই পানির সমস্যায় পড়েছিল।

আরও পড়ুন :  শাকিরার আগুন ঝলকানিতে বিশ্বকাপ ২০২৬ উদ্বোধন! মেক্সিকোতে উৎসব নাকি বিতর্ক?

মনিরামপুরের সুজাতপুর গ্রামের গৃহবধূ বিথী রাণীর অভিজ্ঞতাও একই রকম। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে তাঁর বাড়ির দুটি ঘর পানির নিচে চলে যায়। ঘরের মালামাল নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিতে হয়।

গবাদিপশু নিয়েও তাঁকে উঁচু সড়কে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। সেখানে অস্থায়ীভাবে ছাউনি তৈরি করে রাত কাটানোর পরিস্থিতি তৈরি হয়।

পানি জমে থাকলে শুধু বসতঘর নয়, রান্না, খাবার, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ও শিশুদের নিরাপত্তা—সবকিছুই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। পানিতে সাপ ও বিভিন্ন বিষাক্ত প্রাণীর উপদ্রব বাড়ার আশঙ্কাও থাকে।

শিক্ষা ও যোগাযোগেও বড় ধাক্কা

জলাবদ্ধতার কারণে ভবদহের বহু এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হয়। গ্রামীণ সড়ক পানির নিচে চলে গেলে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। কোথাও মানুষ বাঁশের সাঁকো বানিয়ে চলাচল করেন।

স্কুল-কলেজেও এর প্রভাব পড়ে। শিক্ষার্থীদের পক্ষে পানির মধ্যে দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া কঠিন হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিন পানি আটকে থাকলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন ও আসবাবও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

একই সঙ্গে কৃষি ও মাছের ঘেরও ক্ষতির মুখে পড়ে। পরিকল্পিত জলচাষের পানি আর অনিয়ন্ত্রিত বন্যার পানি এক বিষয় নয়। অতিরিক্ত পানি মাছের ঘের ভাসিয়ে দিতে পারে এবং কৃষিজমির ফসল নষ্ট করতে পারে।

এক দফা বৃষ্টিতেই হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি

সাম্প্রতিক সময়ে ভারী বৃষ্টির পর ভবদহের বহু বিল প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। কয়েকটি উপজেলার বিস্তীর্ণ গ্রামেও জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।

স্থানীয়দের হিসাবে, তিন উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের বিপুলসংখ্যক মানুষ কয়েক দিন পানিবন্দি অবস্থায় ছিলেন। কোথাও পাঁচ-ছয় দিন ধরে পানি পুরোপুরি নামেনি।

মনিরামপুরের ডহর মশিয়াহাটী গ্রামের বাসিন্দা সুবেন বিশ্বাসের অভিজ্ঞতা এই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। বৃষ্টি হলেই বাড়ির উঠানে হাঁটুপানি জমে যায়। তখন চলাচলের জন্য বাঁশের সাঁকো তৈরি করতে হয়।

এভাবে বছরের পর বছর বসবাস করা মানুষের কাছে জলাবদ্ধতা এখন শুধু বর্ষাকালের সমস্যা নয়; এটি তাঁদের জীবনের স্থায়ী অনিশ্চয়তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আন্দোলনকারীদের দাবি কী

ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির নেতারা দীর্ঘদিন ধরে সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়ে আসছেন।

তাঁদের অন্যতম দাবি হলো আমডাঙ্গা খালের সংস্কার দ্রুত শেষ করা। পাশাপাশি নদী খননের সময় তৈরি হওয়া অস্থায়ী বাঁধ অপসারণ, প্রয়োজনীয় জায়গায় পলি সরানো এবং পানি প্রবাহের সব বাধা দূর করার দাবি রয়েছে।

সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদের মতে, হাজার কোটি টাকা খরচ হওয়ার পরও যদি প্রতি বর্ষায় একই সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে প্রকল্পের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।

স্থানীয়দের মতে, শুধু নতুন প্রকল্প ঘোষণা করলেই হবে না। কোন প্রকল্প বাস্তবে কতটা ফল দিচ্ছে, কেন কোনো কাজ আটকে আছে এবং অর্থ ব্যয়ের পরও কেন জলাবদ্ধতা কমছে না—এসব বিষয় নিয়মিত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

শুধু নদী খনন কি স্থায়ী সমাধান?

এটাই এখন ভবদহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

নদীতে পলি জমেছে, তাই নদী খনন প্রয়োজন—এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু শুধু একবার নদী খনন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ নদীতে আবার পলি জমার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।

জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ যদি বাধাগ্রস্ত থাকে, তাহলে নতুন করে খনন করা নদীও কয়েক বছর পর আবার ভরাট হতে পারে। ফলে নদী খননের পাশাপাশি পানি ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার।

আরও পড়ুন :  যশোরে পূর্ণাঙ্গভাবে সিসিইউ চালুর উদ্যোগ, ৩৩ পদে জনবল নিয়োগের অনুমোদন

এখানেই টিআরএম বা টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্টের প্রসঙ্গ সামনে আসে।

বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় আন্দোলনকারীদের মতে, নদীর স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটা ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে নির্দিষ্ট বিলকে জোয়ারাধার হিসেবে ব্যবহার করলে পলি ব্যবস্থাপনা ও নদীর নাব্যতা রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যেতে পারে।

তবে টিআরএম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও স্থানীয় মানুষের মতামত, ক্ষতিপূরণ, জমির ব্যবহার এবং পরিবেশগত বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

সমস্যার মূল জায়গা পরিকল্পনার ঘাটতি?

ভবদহের সংকট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সমস্যাটি একটি মাত্র নদী বা একটি মাত্র স্লুইসগেটের নয়। এটি পুরো অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনার সমস্যা।

একদিকে নদীতে পলি জমছে। অন্যদিকে বিলের পানি বের হওয়ার পথ সংকুচিত হচ্ছে। কোথাও খাল সংস্কার হচ্ছে না, কোথাও অস্থায়ী বাঁধ পানি চলাচলে বাধা দিচ্ছে। আবার কোথাও স্লুইসগেট ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দেখা যাচ্ছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং অল্প সময়ে বেশি বৃষ্টির প্রবণতা।

তাই ভবদহের মতো বিশাল একটি অববাহিকার সমস্যাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখে সমাধান করা কঠিন। নদী, খাল, বিল, স্লুইসগেট, জোয়ার-ভাটা এবং বসতি—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে।

স্থায়ী সমাধানের জন্য কী প্রয়োজন

ভবদহের মানুষ বহু বছর ধরে প্রকল্প দেখেছেন। নতুন ঘোষণা শুনেছেন। খননকাজ দেখেছেন। পাম্প বসানো হয়েছে। স্লুইসগেট নিয়েও নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বর্ষা এলেই তাঁদের জীবনে আবার সেই পুরোনো দুর্ভোগ ফিরে আসে।

তাই এবার প্রয়োজন শুধু অর্থ বরাদ্দ নয়, কার্যকর সমন্বিত পরিকল্পনা।

নদীর নাব্যতা ধরে রাখতে নিয়মিত পলি ব্যবস্থাপনা করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ খালগুলো দ্রুত সংস্কার করতে হবে। পানি চলাচলের পথে অস্থায়ী বা স্থায়ী প্রতিবন্ধকতা থাকলে তা অপসারণ করতে হবে। স্লুইসগেটের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে।

এর পাশাপাশি টিআরএমের মতো দীর্ঘমেয়াদি পানি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি স্থানীয় মানুষের মতামত নিয়ে বাস্তবায়নের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

সবচেয়ে জরুরি হলো, প্রতিটি প্রকল্পের ফলাফল স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন করা। হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরও যদি মানুষের বাড়িঘর ডুবে যায়, তাহলে শুধু নতুন প্রকল্প নেওয়ার বদলে আগের প্রকল্পগুলো কেন কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি—সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।

ভবদহবাসীর প্রশ্নের উত্তর কবে মিলবে?

ভবদহের জলাবদ্ধতা কোনো এক বছরের সমস্যা নয়। চার দশকের বেশি সময় ধরে এখানকার মানুষ একই সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন। প্রতিবার বর্ষা আসে, মানুষ নতুন করে আশায় বুক বাঁধেন। কিন্তু কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিই সেই আশা ভেঙে দেয়।

হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। নতুন নতুন প্রকল্প হয়েছে। সর্বশেষ ১৪০ কোটি টাকার নদী খনন প্রকল্পও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এরপরও যদি বাড়ির উঠানে পানি ওঠে, ঘর ডুবে যায়, গবাদিপশু নিয়ে রাস্তায় আশ্রয় নিতে হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—সমস্যার আসল সমাধান কোথায়?

ভবদহের মানুষের দাবি খুব সাধারণ। তাঁরা আর সাময়িক পানি সরানোর ব্যবস্থা চান না। তাঁরা চান এমন একটি স্থায়ী ও বৈজ্ঞানিক পানি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা, যাতে প্রতি বর্ষায় তাঁদের জীবন পানির কাছে জিম্মি হয়ে না পড়ে।

প্রকল্পের পর প্রকল্প নয়, এবার প্রয়োজন নদী-খাল-বিল ও জোয়ার-ভাটার সমন্বিত ব্যবস্থাপনা। প্রয়োজন স্থানীয় মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া। প্রয়োজন কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি।

নইলে হাজার কোটি টাকা খরচ হলেও ভবদহের জলাবদ্ধতা শুধু প্রকল্পের কাগজেই কমবে, মানুষের বাস্তব জীবনে নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আর্কাইভ