আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : নেপাল-চীন সীমান্তের পাহাড়ি এলাকায় হঠাৎ নেমে আসা ভয়াবহ হড়পা বানে মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেছে পুরো দৃশ্যপট। পাহাড়ের কোলে গড়ে ওঠা ভবন, দোকানপাট, রাস্তা ও আশপাশের স্থাপনা কাদামাটি, পাথর ও পানির প্রবল স্রোতে তলিয়ে গেছে। সেই ভয়াবহ মুহূর্তের একটি সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, মানুষ প্রাণ বাঁচাতে ছোটাছুটি করছেন। কেউ দৌড়ে ভবন থেকে বেরিয়ে আসছেন, আবার কেউ গাড়ি নিয়ে নিরাপদ জায়গায় যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে, পেছন দিক থেকে ধেয়ে আসা কাদামাটির স্রোত পুরো এলাকা ঢেকে ফেলে। একটি বড় ভবনও সেই স্রোতের কবল থেকে রক্ষা পায়নি। ভয়াবহ এই দৃশ্য দেখে বোঝা যায়, পাহাড়ি এলাকায় আকস্মিক হড়পা বান কতটা দ্রুত এবং বিধ্বংসী হয়ে উঠতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি নেপাল-চীন সীমান্তের তিব্বত প্রদেশের গিরং এলাকার বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে ভিডিওটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। ফুটেজে শুরুতে পরিস্থিতি বেশ স্বাভাবিকই দেখা যায়।
পাহাড়ের পাশে নির্মিত বেশ কয়েকটি ভবন ও দোকানপাটের সামনে মানুষের চলাচল ছিল। রাস্তা দিয়ে গাড়িও চলাচল করছিল। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সেখানে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে যাচ্ছে।
হঠাৎ করেই মানুষকে আতঙ্কিত হয়ে ছুটতে দেখা যায়। কেউ ভবনের ভেতর থেকে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসছেন। আবার কেউ রাস্তার দিকে ছুটছেন। কয়েকজন গাড়ি নিয়ে দ্রুত সরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। কেন মানুষ এভাবে পালাচ্ছেন, ভিডিওর শুরুতে তার কারণ স্পষ্ট বোঝা যায় না।
এরপরই সামনে আসে ভয়াবহ বিপদের চিত্র।
ভিডিওর পরের অংশে দেখা যায়, ভবনের পেছন দিক থেকে প্রচণ্ড গতিতে কাদামাটি, পানি ও পাথরের স্রোত এগিয়ে আসছে। মুহূর্তের মধ্যেই সেই স্রোত আশপাশের জায়গা ঢেকে ফেলতে শুরু করে।
প্রবল স্রোতের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার সুযোগই ছিল না কারও। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ভবন ও অন্যান্য স্থাপনা কাদামাটির আড়ালে চলে যায়। রাস্তা কোথায় ছিল, ভবন কোথায় ছিল—তা আলাদা করে বোঝার উপায় থাকে না।
পাহাড়ি ঢল সাধারণ বন্যার তুলনায় অনেক বেশি বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ পাহাড় থেকে নেমে আসা পানির সঙ্গে মাটি, বালু, পাথর ও গাছপালাও ভেসে আসে। ফলে স্রোতের গতি ও ধ্বংসক্ষমতা অনেক বেড়ে যায়।
এই ভিডিওতেও সেই ভয়াবহ চিত্রই দেখা গেছে। মানুষ নিরাপদ জায়গায় যাওয়ার চেষ্টা করলেও কয়েক মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকা কাদামাটির স্রোতে ঢেকে যায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার সকালে নেপালের রাসুয়া জেলায় ভোটেকোশী নদীতে আকস্মিক হড়পা বান দেখা দেয়। পাহাড়ি নদীতে পানির প্রবাহ আচমকা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
এই ঘটনায় নদীর আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়। ঘরবাড়ি, রাস্তা ও সেতুসহ বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। অনেক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। ফলে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সীমান্তবর্তী ও পাহাড়ি এলাকায় থাকা মানুষ এবং সেখানে যাতায়াতকারী পর্যটকেরা।
নেপালের পর্যটন সংক্রান্ত তথ্যের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ঘটনায় শত শত পর্যটকের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। তাঁদের মধ্যে বিদেশি নাগরিকের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য।
কৈলাস-মানস সরোবর দর্শনের উদ্দেশ্যে যাওয়া ভারতীয় পর্যটকদের একটি অংশও এই দুর্যোগের মধ্যে পড়েছেন বলে জানা গেছে। তাঁদের নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে নিখোঁজ ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্ত করা এবং দ্রুত উদ্ধার করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে উদ্ধারকারী দলকে একসঙ্গে একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। একদিকে থাকে কাদামাটি ও পাথরের স্রোতের ঝুঁকি, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা ও সেতুর কারণে দুর্গম এলাকায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে যায়।
হড়পা বানের পর পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের পক্ষ থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন।
দুর্যোগ মোকাবিলায় নেপালকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। উদ্ধারকাজে নেপালি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ভারতীয় পক্ষও সহযোগিতা করছে বলে জানা গেছে। পাশাপাশি পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
দুর্যোগের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে আটকে পড়া মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান করা। একই সঙ্গে দুর্গত এলাকায় খাবার, পানি, চিকিৎসা ও জরুরি ত্রাণ পৌঁছে দেওয়াও জরুরি হয়ে পড়ে।
পাহাড়ি অঞ্চলে হড়পা বান সাধারণ বন্যার চেয়ে অনেক বেশি আকস্মিক হতে পারে। অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢাল থেকে অতিরিক্ত পানি নেমে আসা, নদীর পানির স্তর দ্রুত বেড়ে যাওয়া কিংবা কোথাও পানি আটকে থাকার পর বাঁধ ভেঙে যাওয়ার মতো ঘটনায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে পাহাড়ি নদীর ক্ষেত্রে কয়েক মিনিটের মধ্যেই পানির উচ্চতা ও স্রোতের শক্তি অনেক বেড়ে যেতে পারে। পানির সঙ্গে যখন বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ যুক্ত হয়, তখন সেটি কার্যত একটি চলমান ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
নেপালের মতো পাহাড়ঘেরা দেশে বর্ষাকালে এমন ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। তাই নদী ও পাহাড়ের কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষদের আগাম সতর্কতা, নিরাপদ আশ্রয়স্থল এবং দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত জরুরি।
নেপালের এই হড়পা বানের সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে একটি স্বাভাবিক জনপদ কীভাবে কাদামাটির স্রোতের কবলে পড়ে, তা স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দুর্যোগের ভিডিও দেখার সময় সতর্ক থাকা জরুরি। অনেক সময় পুরোনো বা অন্য ঘটনার ভিডিও নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে প্রচার করা হয়। তাই ভিডিওর উৎস ও সত্যতা যাচাই না করে সেটিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়।
নেপালের সাম্প্রতিক এই দুর্যোগের ক্ষেত্রে উদ্ধারকাজ ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানই এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র সামনে আসতে আরও সময় লাগতে পারে। তবে সিসিটিভিতে ধরা পড়া কয়েক সেকেন্ডের দৃশ্যই বুঝিয়ে দিয়েছে, পাহাড়ি এলাকায় হড়পা বান কতটা ভয়াবহ এবং কত দ্রুত মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে।

