খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকেন নাম হলো ‘ব্লুটুথ’? রয়েছে হাজার বছরের পুরোনো গল্প!

কেন নাম হলো ‘ব্লুটুথ’? রয়েছে হাজার বছরের পুরোনো গল্প!

আধুনিক ওয়্যারলেস নামটি এসেছে ডেনমার্কের দশম শতকের রাজা 'হ্যারাল্ড গোরমসন'-এর ডাকনাম থেকে। ইতিহাসে 'হ্যারাল্ড গোরমসন' ‘হ্যারাল্ড ব্লুটুথ’ নামে পরিচিত।

নিউজবাংলা ডেক্স : ফোনের সঙ্গে ইয়ারবাড সংযুক্ত করা, ওয়্যারলেস স্পিকার চালানো, কিবোর্ড-মাউস সংযোগ অথবা কাছাকাছি থাকা ডিভাইসের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান প্রতিদিনের প্রযুক্তি ব্যবহারে ‘ব্লুটুথ’ এখন আমাদের খুবই পরিচিত একটি নাম। কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, এই প্রযুক্তির নাম ‘ব্লুটুথ’ কেন হলো?

‘ব্লুটুথ’ নামটি শুনলে আধুনিক প্রযুক্তি, নীল কালার কিংবা কোনো ইলেকট্রনিক যন্ত্রের কথা আমাদের মনে হতে পারে। কিন্তু এর আসল গল্প একেবারেই ভিন্নরকমের। ব্লুটুথ নামের শিকড় খুঁজতে গেলে স্মার্টফোন বা কম্পিউটারে নয়, ফিরে তাকাতে হয় হাজার বছর আগের স্ক্যান্ডিনেভিয়ায়।

আধুনিক ওয়্যারলেস নামটি এসেছে ডেনমার্কের দশম শতকের রাজা ‘হ্যারাল্ড গোরমসন’-এর ডাকনাম থেকে। ইতিহাসে ‘হ্যারাল্ড গোরমসন’ ‘হ্যারাল্ড ব্লুটুথ’ নামে পরিচিত।

হ্যারাল্ড এমন এক সময়ে ডেনমার্ক শাসন করতেন, যখন স্ক্যান্ডিনেভিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত ছিল। তিনি ডেনমার্ককে একত্রিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং নরওয়ের কিছু অঞ্চলেও নিজের প্রভাব বিস্তার করেন।

এই ‘একত্রিত করার’ বিষয়টিই পরবর্তীতে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তার নামের যোগসূত্র তৈরির মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

তবে হ্যারাল্ড কীভাবে ‘ব্লুটুথ’ ডাকনাম পেলেন, সে বিষয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে পুরোপুরি নিশ্চিত কোনো ব্যাখ্যা নেই। প্রচলিত একটি ধারণা হলো, তার একটি দাঁত নীলচে বা গাঢ় রঙের ছিল। সেখান থেকেই ‘ব্লুটুথ’ নামটির উৎপত্তি হতে পারে। তবে এ নিয়ে আরও কিছু ঐতিহাসিক ব্যাখ্যাও রয়েছে।

আরও পড়ুন :  অস্বাভাবিক কিছু ঘটলেই জেগে উঠবে এআই চিপ, ১০ হাজার গুণ কম গণনায় নজির

ব্লুটুথ প্রযুক্তির গল্প শুরু হয় ১৯৯০-এর দশকে। তখন বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এমন একটি স্বল্প-পাল্লার বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করছিল, যার মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস তার ছাড়াই একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে।

সে সময় কম্পিউটার, মোবাইল ফোন এবং অন্যান্য ডিভাইসের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের জন্য আলাদা আলাদা পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো। ফলে একটি অভিন্ন বেতার প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বাড়ছিল।

ইন্টেল, এরিক্সন ও নোকিয়ার মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্ট শিল্পের একাধিক প্রতিষ্ঠান এই ধরনের একটি অভিন্ন মান তৈরির উদ্যোগ নেয়। লক্ষ্য ছিল সহজ, স্বল্প-পাল্লার এবং কম শক্তি খরচের বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করা।

এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ইন্টেলের প্রকৌশলী ‘জিম কার্ডাচ’। তিনিই প্রকল্পটির অস্থায়ী কোডনেম হিসেবে ‘ব্লুটুথ’ নামটি প্রস্তাব করেন।

এখানেই ইতিহাসের সঙ্গে প্রযুক্তির চমৎকার মিলটি দেখা যায়।

রাজা হ্যারাল্ড ব্লুটুথ বিভিন্ন অঞ্চলকে একত্রিত করার জন্য পরিচিত ছিলেন। অন্যদিকে নতুন ওয়্যারলেস প্রযুক্তির উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন নির্মাতার বিভিন্ন ডিভাইসকে একটি অভিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে যুক্ত করা।

অর্থাৎ, হ্যারাল্ডের কাজ ছিল মানুষ ও অঞ্চলকে একত্রিত করা, আর ব্লুটুথ প্রযুক্তির কাজ হলো বিভিন্ন ডিভাইসকে একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত করা।

আরও পড়ুন :  ৬০ দিন অন্ধকার গুহায়! মানুষের শরীরের গোপন ‘ঘড়ি’ ফাঁস করলেন মিশেল

এই প্রতীকী মিল থেকেই ‘ব্লুটুথ’ নামটি প্রযুক্তি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়।

তবে শুরুতে কেউ ভাবেনি যে এই অস্থায়ী নামই একদিন বিশ্বের অন্যতম পরিচিত প্রযুক্তি ব্র্যান্ডে পরিণত হবে।

না। মজার বিষয় হলো, ‘ব্লুটুথ’ আসলে স্থায়ী নাম হিসেবে শুরু হয়নি। এটি ছিল প্রকল্পের একটি অস্থায়ী কোডনেম।

সে সময় প্রযুক্তিটির জন্য অন্য নামও বিবেচনা করা হয়েছিল। এর মধ্যে ‘পার্সোনাল এরিয়া নেটওয়ার্কিং’ বা PAN এবং ‘রেডিও-ওয়্যার’-এর মতো নাম ছিল।

কিন্তু বিভিন্ন কারণে সেগুলো চূড়ান্ত নাম হিসেবে টেকেনি। বিশেষ করে ‘PAN’ নামটি আগে থেকেই অন্য প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছিল। অন্যদিকে ‘রেডিও-ওয়্যার’ নামটি ট্রেডমার্কসংক্রান্ত জটিলতার কারণে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।

ফলে অস্থায়ীভাবে ব্যবহৃত ‘ব্লুটুথ’ নামটিই শেষ পর্যন্ত থেকে যায়। সময়ের সঙ্গে সেটিই বিশ্বজুড়ে একটি পরিচিত প্রযুক্তির নাম হয়ে ওঠে।

শুধু নামেই নয়, ব্লুটুথের লোগোর মধ্যেও লুকিয়ে আছে রাজা হ্যারাল্ডের পরিচয়।

ব্লুটুথের বহুল পরিচিত প্রতীকটি দেখতে অনেকটা একটি বিশেষ রুন বা প্রাচীন স্ক্যান্ডিনেভীয় অক্ষরের সমন্বয়ের মতো। এর নকশায় ব্যবহার করা হয়েছে ইয়াংগার ফুথার্ক রুনলিপির দুটি রুন।

এই দুটি রুন হলো ‘হাগাল’ এবং ‘বেরকানান’। এগুলো যথাক্রমে হ্যারাল্ডের নামের ‘H’ এবং ‘B’ অক্ষরকে নির্দেশ করে। দুটি রুনকে একত্র করে তৈরি করা হয়েছে ব্লুটুথের পরিচিত প্রতীক।

আরও পড়ুন :  জি-৭ সম্মেলনে চমক: নতুন বিশ্বব্যবস্থা আসছে?

অর্থাৎ, ব্লুটুথের লোগো দেখলেও এর পেছনে থাকা ভাইকিং ইতিহাসের একটি ছোট্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

প্রযুক্তির জগতে কোনো নাম কীভাবে তৈরি হলো, তার পেছনে অনেক সময় চমকপ্রদ গল্প থাকে। ব্লুটুথ তার অন্যতম সুন্দর উদাহরণ।

আজ আমরা যখন ফোন থেকে ইয়ারবাডে গান শুনি কিংবা একটি ওয়্যারলেস কিবোর্ড কম্পিউটারের সঙ্গে যুক্ত করি, তখন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ডিভাইসগুলো সংযুক্ত হয়ে যায়। পুরো প্রক্রিয়াটি এত স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে এর পেছনের ইতিহাস নিয়ে খুব কম মানুষই ভাবেন।

কিন্তু ‘ব্লুটুথ’ নামটি মনে করিয়ে দেয়, আধুনিক প্রযুক্তির পরিচয়ের মধ্যেও ইতিহাস, সংস্কৃতি ও প্রতীকের প্রভাব থাকতে পারে।

প্রায় এক হাজার বছর আগে একজন ভাইকিং রাজা বিভিন্ন অঞ্চলকে একত্রিত করার জন্য পরিচিত হয়েছিলেন। আর শত শত বছর পর তার ডাকনাম ধার করে তৈরি হলো এমন একটি প্রযুক্তির নাম, যার মূল কাজই হলো বিভিন্ন ডিভাইসকে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করা।

এই মিলটি নিছক কাকতালীয় নয়। বরং প্রযুক্তির নির্মাতারা ইচ্ছাকৃতভাবেই হ্যারাল্ড ব্লুটুথের ইতিহাস থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছিলেন।

তাই ব্লুটুথ শুধু একটি ওয়্যারলেস প্রযুক্তির নাম নয়। এর নামের মধ্যে লুকিয়ে আছে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার প্রাচীন ইতিহাস, ভাইকিং যুগের এক রাজা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সংযোগ স্থাপনের ধারণা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আর্কাইভ