Become a member

Get the best offers and updates relating to Newsbangla24x7.com

― Advertisement ―

spot_img
Homeএক্সক্লুসিভ৬০ দিন অন্ধকার গুহায়! মানুষের শরীরের গোপন ‘ঘড়ি’ ফাঁস করলেন মিশেল

৬০ দিন অন্ধকার গুহায়! মানুষের শরীরের গোপন ‘ঘড়ি’ ফাঁস করলেন মিশেল

মিশেল সিফরের সেই অন্ধকার গুহার অভিজ্ঞতা আমাদের একটা জিনিস খুব পরিষ্কার করে বুঝিয়েছে—আমরা শুধু বাইরের পৃথিবীর ওপর নির্ভর করে চলি না। আমাদের ভেতরেও একটা নিজস্ব সময় আছে, যা সবসময় কাজ করে যাচ্ছে।

ভাবো তো, তুমি একটা জায়গায় আছো—যেখানে সূর্যের আলো নেই, দিন-রাতের কোনও ধারণা নেই, আর সময় দেখার মতো ঘড়িও নেই। ঠিক এমনটাই করেছিলেন এক তরুণ ফরাসি গবেষক, মিশেল সিফরে। তিনি ইচ্ছা করেই নিজেকে আটকে রেখেছিলেন হিমবাহের নিচে এক অন্ধকার গুহায়। আর সেখান থেকেই শুরু হয় মানুষের শরীরের ভেতরের “অদৃশ্য ঘড়ি” নিয়ে এক যুগান্তকারী আবিষ্কার।

১৯৬২ সালের ১৬ জুলাই, মাত্র ২৩ বছর বয়সে মিশেল সিফরে নামেন এক দুঃসাহসিক পরীক্ষায়। তিনি ছিলেন একজন স্পেলিয়োলজিস্ট—মানে গুহা নিয়ে গবেষণা করতেন। ইতালির লিগুরিয়ান আল্পসের স্কারাসন গুহায় তিনি একা কাটান টানা দুই মাস।

গুহাটা ছিল সম্পূর্ণ অন্ধকার। সূর্যের আলো তো দূরের কথা, সময় বোঝার কোনও উপায়ই ছিল না। না ঘড়ি, না ক্যালেন্ডার—কিছুই সঙ্গে ছিল না। বাইরে একটা সহায়তাকারী দল ছিল ঠিকই, কিন্তু তারা শুধু তার তথ্য নিত। কোনওভাবেই তাকে দিন বা সময় জানাত না।

একটা মজার ব্যাপার হলো—মিশেল যখন ইচ্ছা ফোন করতে পারতেন, কিন্তু কেউ তাকে ফোন করতে পারত না। ফলে বাইরের দুনিয়া থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ছিলেন তিনি।

গুহার ভেতরে মিশেলের জীবনটা খুব সহজ ছিল। যখন ক্ষুধা লাগত, তখন খেতেন। যখন ঘুম পেত, তখন ঘুমাতেন। কোনও অ্যালার্ম ছিল না, কোনও রুটিন ছিল না।

তুমি হয়তো ভাবছো—এভাবে কি কেউ ঠিকঠাক চলতে পারে? আশ্চর্য হলেও সত্যি, তিনি ঠিকই চলছিলেন। কিন্তু একটা অদ্ভুত জিনিস ঘটছিল, যা তখনও কেউ বুঝতে পারেনি।

দুই মাস শেষে যখন বাইরে থেকে জানানো হলো—“তোমার পরীক্ষা শেষ”, তখন মিশেল অবাক হয়ে যান। তিনি বিশ্বাসই করতে চাননি।

তার মনে হয়েছিল, এখনও অন্তত দুই সপ্তাহ বাকি আছে!

মানে, তার নিজের অনুভূত সময় আর বাস্তব সময়ের মধ্যে প্রায় ১৪ দিনের পার্থক্য তৈরি হয়েছিল। ভাবো তো, তুমি যদি মনে করো আজ শুক্রবার, অথচ আসলে সেটা দুই সপ্তাহ পরের দিন—কেমন লাগবে?

এই ঘটনাই আসল রহস্য খুলে দেয়।

গবেষণায় দেখা যায়, মিশেলের দৈনন্দিন রুটিন ২৪ ঘণ্টায় সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং তার ঘুম-খাওয়ার চক্র গড়ে প্রায় ২৪ ঘণ্টা ৩০ মিনিটে সম্পন্ন হচ্ছিল।

মানে, প্রতিদিন তিনি একটু একটু করে সময় পিছিয়ে যাচ্ছিলেন। যেমন ধরো, আজ তুমি রাত ১০টায় ঘুমালে, কাল হয়তো ১০:৩০-এ, তার পরের দিন ১১টায়—এভাবে ধীরে ধীরে সময় বদলাচ্ছে।

এই অবস্থাকে বিজ্ঞানীরা নাম দেন—ফ্রি রানিং সার্কাডিয়ান রিদম

সহজ করে বললে, এটা আমাদের শরীরের ভেতরের প্রাকৃতিক টাইমার। আমরা কখন ঘুমাব, কখন জাগব, কখন ক্ষুধা লাগবে—সবকিছু একটা ছন্দে চলে।

আমরা সাধারণত সূর্যের আলো দেখে এই ছন্দ ঠিক রাখি। সকালে আলো পেলে শরীর বুঝে—এখন জাগার সময়। রাতে অন্ধকার হলে বুঝে—এখন ঘুমানোর সময়।

কিন্তু মিশেলের ক্ষেত্রে আলোই ছিল না। ফলে তার শরীর নিজের মতো করে সময় তৈরি করছিল।

গুহার ভেতরে কোনও পরিবর্তন ছিল না। না আলো, না শব্দ, না বাইরের কোনও ইঙ্গিত।

ধরো তুমি একটা রুমে ঢুকলে, যেখানে সবসময় একই আলো, একই তাপমাত্রা, একই পরিবেশ। সেখানে বসে থাকলে কি বুঝতে পারবে সকাল না রাত? খুব কঠিন, তাই না?

ঠিক এই কারণেই মিশেলের মস্তিষ্ক সময়ের হিসাব রাখতে পারেনি। তার স্মৃতিতে দিনগুলো যেন ছোট হয়ে গিয়েছিল।

মিশেলের এই পরীক্ষা থেকে জন্ম নেয় একটি নতুন গবেষণা ক্ষেত্র—ক্রোনোবায়োলজি। এই শাখা মূলত জীবের সময়ভিত্তিক আচরণ নিয়ে কাজ করে।

তার আগে বিজ্ঞানীরা ভাবতেন, মানুষের শরীরের রুটিন পুরোপুরি বাইরের পরিবেশের ওপর নির্ভর করে। যেমন সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত, বা খিদে পাওয়া।

কিন্তু এই গবেষণা দেখিয়ে দিল—আমাদের শরীরের ভেতরেও একটা নিজস্ব ঘড়ি আছে, যা বাইরের সাহায্য ছাড়াও চলতে পারে।

এই গবেষণার প্রভাব কিন্তু শুধু গুহার মধ্যে সীমাবদ্ধ না। আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও এর প্রভাব আছে।

যেমন ধরো, তুমি যদি হঠাৎ রাত জেগে কাজ শুরু করো, বা অন্য টাইম জোনে ভ্রমণ করো—তখন শরীরের ঘড়ি গুলিয়ে যায়। একে আমরা বলি “জেট ল্যাগ”।

আবার যারা রাতের শিফটে কাজ করে, তাদের ক্ষেত্রেও এই অভ্যন্তরীণ ঘড়ি ঠিক রাখতে সমস্যা হয়।

এই অভিজ্ঞতার পর মিশেল থেমে থাকেননি। ১৯৭২ সালে তিনি টেক্সাসের এক গুহায় টানা ছয় মাস একা কাটান।

সেখানেও একই ধরনের ফলাফল পাওয়া যায়। বরং আরও নতুন তথ্য উঠে আসে মানুষের মন ও শরীর নিয়ে।

মিশেল সিফরের সেই অন্ধকার গুহার অভিজ্ঞতা আমাদের একটা জিনিস খুব পরিষ্কার করে বুঝিয়েছে—আমরা শুধু বাইরের পৃথিবীর ওপর নির্ভর করে চলি না। আমাদের ভেতরেও একটা নিজস্ব সময় আছে, যা সবসময় কাজ করে যাচ্ছে।

প্রতিদিন সকালে তুমি যখন নিজে নিজে ঘুম থেকে উঠে যাও, কোনও অ্যালার্ম ছাড়াই—সেটা আসলে এই ভেতরের ঘড়িরই কাজ।

ভাবলে অবাক লাগে, তাই না? আমরা নিজেরাই একটা চলমান “ঘড়ি” নিয়ে বেঁচে আছি—যেটা কখনও থামে না, শুধু নিজের মতো করে চলতে থাকে।