খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img

বিরল কালোমুখো হনুমানের খাবার সংকট : কেন ছড়িয়ে পড়ছে গ্রাম থেকে গ্রামে?

যশোরের কেশবপুরে বসবাসকারী বিরল প্রজাতির কালোমুখো হনুমান এখন খাবারের অভাবে নিজেদের স্বাভাবিক আবাসস্থল ছেড়ে আশপাশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার গ্রামগুলোতে ছড়িয়ে পড়ছে। পর্যাপ্ত খাদ্যের...
Homeএক্সক্লুসিভভারতের সবচেয়ে রহস্যময় গ্রাম জাটিঙ্গা : সত্যিই কি পাখিরা আত্মহত্যা করে?

ভারতের সবচেয়ে রহস্যময় গ্রাম জাটিঙ্গা : সত্যিই কি পাখিরা আত্মহত্যা করে?

এরপর দ্রুতগতিতে তারা গাছ, বৈদ্যুতিক খুঁটি, ঘরের দেওয়াল কিংবা অন্যান্য স্থাপনার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে গুরুতর আহত হয় বা মারা যায়। এই দৃশ্য বহু বছর ধরে মানুষের কাছে এক রহস্য হিসেবেই পরিচিত।

অসমের পাহাড়ি প্রকৃতির মাঝে লুকিয়ে থাকা ছোট্ট একটি গ্রাম—জাটিঙ্গা। বছরের বেশিরভাগ সময় এটি শান্ত, নিরিবিলি এবং প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এক মনোমুগ্ধকর স্থান। কিন্তু সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর এলেই বদলে যায় গ্রামের পরিচয়। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে এখানে ঘটে এমন এক রহস্যময় ঘটনা, যা বহু বছর ধরে বিজ্ঞানী, পক্ষীবিদ এবং পর্যটকদের সমানভাবে বিস্মিত করে আসছে। ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি আলোয়ের দিকে ছুটে এসে গাছ, বাড়ি কিংবা খুঁটির সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে মারা পড়ে। এই অস্বাভাবিক ঘটনাকেই অনেকেই ভুলভাবে “পাখিদের গণ-আত্মহত্যা” বলে উল্লেখ করেন।

এই রহস্যময় দৃশ্য প্রত্যক্ষ করতে প্রতিবছর দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য পর্যটক ভিড় জমান জাটিঙ্গায়। প্রকৃতির বিস্ময়, লোকবিশ্বাস এবং বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার মিশেলে জাটিঙ্গা আজ ভারতের অন্যতম আলোচিত পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।

জাটিঙ্গা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অসমের ডিমা হাসাও জেলার একটি ছোট পাহাড়ি গ্রাম। চারপাশে সবুজ পাহাড়, ঘন বন, মেঘে ঢাকা উপত্যকা এবং মনোরম পরিবেশ এই গ্রামকে করে তুলেছে অসাধারণ সুন্দর। প্রকৃতির নীরবতার মাঝেই লুকিয়ে রয়েছে এক রহস্য, যা বিশ্বের নানা প্রান্তের গবেষকদেরও আকর্ষণ করে।

জাটিঙ্গার সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো নির্দিষ্ট মৌসুমে পাখিদের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা। প্রতি বছর বর্ষা শেষে, বিশেষ করে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে, সন্ধ্যার পর কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ায় বিভিন্ন প্রজাতির স্থানীয় পাখি গ্রামের উজ্জ্বল আলো দেখে বিভ্রান্ত হয়ে নিচের দিকে নেমে আসে।

এরপর দ্রুতগতিতে তারা গাছ, বৈদ্যুতিক খুঁটি, ঘরের দেওয়াল কিংবা অন্যান্য স্থাপনার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে গুরুতর আহত হয় বা মারা যায়। এই দৃশ্য বহু বছর ধরে মানুষের কাছে এক রহস্য হিসেবেই পরিচিত।

জাটিঙ্গায় প্রায় ৪৪টিরও বেশি প্রজাতির স্থানীয় পাখিকে এই ঘটনায় আক্রান্ত হতে দেখা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • বক
  • মাছরাঙা
  • কালি বক
  • সবুজ কবুতর
  • ড্রোঙ্গো
  • বিভিন্ন ছোট বনজ পাখি

গবেষকদের মতে, এগুলো মূলত স্থানীয় পাখি। অনেকের ধারণার বিপরীতে, অধিকাংশই পরিযায়ী পাখি নয়।

একসময় এই ঘটনাকে অলৌকিক বলে মনে করা হলেও বর্তমানে বিজ্ঞানীরা এর সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

বর্ষা শেষে পাহাড়ি অঞ্চলে ঘন কুয়াশা, প্রবল বাতাস এবং নিম্নচাপের কারণে অনেক পাখি দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে। বাসস্থান নষ্ট হওয়া বা আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে তারা স্বাভাবিক উড়ানের নিয়ন্ত্রণ হারায়। এমন অবস্থায় গ্রামের উজ্জ্বল কৃত্রিম আলো তাদের আকৃষ্ট করে।

আলো লক্ষ্য করে দ্রুত নিচে নামতে গিয়ে তারা আশপাশের গাছ, ঘরবাড়ি কিংবা বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে সংঘর্ষে আহত হয় বা প্রাণ হারায়। তাই অধিকাংশ পক্ষীবিদের মতে, এটি আত্মহত্যা নয়; বরং দিকভ্রান্ত ও বিভ্রান্ত পাখিদের দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু।

বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার পাশাপাশি জাটিঙ্গাকে ঘিরে রয়েছে নানা লোককাহিনি।

স্থানীয়দের একাংশের বিশ্বাস, এই উপত্যকায় অশুভ আত্মার প্রভাব রয়েছে। সেই অদৃশ্য শক্তির কারণেই নাকি পাখিরা মৃত্যুর দিকে ছুটে যায়। আবার কেউ কেউ মনে করেন পাহাড়ি অঞ্চলের ভূ-চুম্বকীয় পরিবর্তন কিংবা বিশেষ বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থার প্রভাবও এই ঘটনার পেছনে থাকতে পারে।

যদিও এসব বিশ্বাসের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি, তবুও রহস্যের আবহ আজও জাটিঙ্গার জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে রেখেছে।

জাটিঙ্গা শুধু রহস্যের জন্যই বিখ্যাত নয়। এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও অসাধারণ।

চারদিকে সবুজ পাহাড়, মেঘে ঢাকা উপত্যকা, নীরব পরিবেশ এবং পাখিদের আবাসস্থল প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা তৈরি করে। বিশেষ করে বর্ষা শেষে পাহাড়ি প্রকৃতি আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

অনেক পর্যটক শুধু রহস্যময় ঘটনাটি দেখতেই নয়, বরং পাহাড়ি পরিবেশে কয়েকদিন নিরিবিলি সময় কাটানোর উদ্দেশ্যেও এখানে আসেন।

জাটিঙ্গা ঘুরতে চাইলে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাস সবচেয়ে উপযুক্ত। এই সময়েই সন্ধ্যার পর পাখিদের অস্বাভাবিক আচরণ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

তবে মনে রাখতে হবে, এই ঘটনা নির্ভর করে আবহাওয়া, কুয়াশা এবং বাতাসের অবস্থার ওপর। তাই প্রতিদিন একই ধরনের দৃশ্য দেখা যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

রাজধানী গুয়াহাটি থেকে জাটিঙ্গার দূরত্ব প্রায় ৩৩০ কিলোমিটার।

সবচেয়ে সুবিধাজনক উপায় হলো প্রথমে অসমের একমাত্র শৈল শহর হাফলং পৌঁছানো। সেখান থেকে জাটিঙ্গার দূরত্ব মাত্র ৯ কিলোমিটার। অটো, ট্যাক্সি বা স্থানীয় যানবাহনে খুব সহজেই গ্রামে পৌঁছে যাওয়া যায়।

এছাড়া শিলচরমুখী বাস বা সড়কপথেও জাটিঙ্গায় যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

জাটিঙ্গায় রাত কাটানোর জন্য খুব বেশি বেসরকারি হোটেল নেই। তবে পাশের পাহাড়ি শহর হাফলংয়ে বিভিন্ন বাজেটের হোটেল, লজ এবং গেস্টহাউস পাওয়া যায়।

এছাড়া জাটিঙ্গা এলাকায় সরকারি বার্ড ওয়াচিং সেন্টারও রয়েছে। আগে থেকে জেলা বন দফতরের অনুমতি নিয়ে সেখানে থাকার সুযোগ পাওয়া যেতে পারে। প্রকৃতির একেবারে কাছাকাছি থাকার অভিজ্ঞতা ভ্রমণকে আরও স্মরণীয় করে তুলবে।

জাটিঙ্গা ভ্রমণে গেলে পাখিদের বিরক্ত করা, আলো ফেলা বা তাদের ধরার চেষ্টা করা থেকে বিরত থাকুন। পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সচেতন আচরণই একজন দায়িত্বশীল পর্যটকের পরিচয়।

স্থানীয় প্রশাসন ও বন বিভাগের নির্দেশনা মেনে চললে নিরাপদ এবং সুন্দর অভিজ্ঞতা লাভ করা সম্ভব।

রহস্য, প্রকৃতি এবং বৈজ্ঞানিক কৌতূহলের এক অসাধারণ মেলবন্ধনের নাম জাটিঙ্গা। বহু বছর ধরে আলোচিত এই পাহাড়ি গ্রাম আজও গবেষকদের ভাবিয়ে তোলে এবং পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে। যদিও “পাখিদের গণ-আত্মহত্যা” কথাটি জনপ্রিয়, বর্তমান গবেষণা বলছে এটি আত্মহত্যা নয়; বরং বিশেষ আবহাওয়াজনিত কারণে দিকভ্রান্ত পাখিদের দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু।

আপনি যদি প্রকৃতির অজানা রহস্যের সাক্ষী হতে চান, পাহাড়ের সৌন্দর্যে হারিয়ে যেতে চান এবং ভিন্নধর্মী ভ্রমণের অভিজ্ঞতা খুঁজে থাকেন, তাহলে আগামী সফরের তালিকায় নিশ্চিন্তেই রাখতে পারেন অসমের রহস্যময় গ্রাম জাটিঙ্গাকে।