সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় বিয়ে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। একটি ভাইরাল ভিডিও, দ্বিতীয় স্ত্রী দাবি করা তরুণীর বায়োডাটা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য এই ঘটনাকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান ‘দ্য ডিসেন্ট’-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩ জুলাই গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি প্রকাশের পর থেকেই এটি নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়।
ভিডিওটি কীভাবে ধারণ করা হয়েছে এবং কেন প্রকাশ করা হয়েছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য একে অপরের সঙ্গে মিলছে না। ফলে ঘটনাটির প্রকৃত চিত্র নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
নিজেকে দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম আক্তারের বাবা পরিচয় দেওয়া মাসুম বিল্লাহ জানান, গত ১৭ জুন ঢাকার মগবাজারে তার ব্যক্তিগত কার্যালয়ে গাজী নজরুল ইসলাম ও মরিয়ম আক্তারের বিয়ে সম্পন্ন হয়। তার দাবি, তিন লাখ টাকা দেনমোহরে এই বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, ১৩ জুলাই এমপি, তার পরিবারের সদস্য এবং মরিয়ম কার্যালয়ে অবস্থানকালে গোপনে একটি ভিডিও ধারণ করা হয়। তার অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে এই ভিডিও ধারণ ও প্রচার করা হয়েছে। এ ঘটনার জন্য তিনি এমপির সাবেক সহকারী ও শ্যালক ওবায়দুল্লাহকে দায়ী করেন।
বিতর্কের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মরিয়ম আক্তারের একটি জীবনবৃত্তান্ত বা বায়োডাটা ছড়িয়ে পড়ে, যা ঘটনাটিকে নতুন মাত্রা দেয়।
বায়োডাটায় উল্লেখ করা হয়েছে, মরিয়ম ২০০৮ সালের ২২ মে জন্মগ্রহণ করেন এবং ২০২৬ সালে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন।
সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দেয় তার বৈবাহিক অবস্থার তথ্য। সেখানে স্পষ্টভাবে ‘অবিবাহিত’ লেখা রয়েছে। অথচ দ্বিতীয় পক্ষের দাবি অনুযায়ী, ওই বায়োডাটা তৈরির আগেই তার বিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল। এই তথ্যের অসামঞ্জস্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
ভাইরাল হওয়া বায়োডাটায় আরও দেখা যায়, ২০২৬ সালের ২২ জুন তারিখে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম সেখানে নিজের স্বাক্ষরসহ ‘জোর সুপারিশ’ করেছেন।
এই সুপারিশের সময় ও বায়োডাটায় উল্লেখিত বৈবাহিক অবস্থার তথ্য নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, বিয়ের দাবি অনুযায়ী ১৭ জুন বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার কয়েক দিন পরই ওই সুপারিশ করা হয়েছিল।
গাজী নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রীর সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে গণমাধ্যমে পাঠানো ২৯ সেকেন্ডের একটি ভিডিও বার্তায় প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলামরে দাবি তার স্বামীর সাথে মরিয়মের বিয়ে হয়েছে।
তিনি বলেন, এই বিয়ে নিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কুৎসা রটানো হচ্ছে। যারা মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজন হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
ভিডিও বার্তায় মাসুম বিল্লাহ দাবি করেন, ১৩ জুলাই প্রকাশিত ভিডিওটি তাদের সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ১৭ জুন অনুষ্ঠিত বিয়ের সময় উভয় পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এমনকি এমপির প্রথম স্ত্রীও সেখানে উপস্থিত ছিলেন বলে তিনি দাবি করেন। ফলে এই বিয়ে গোপনে হয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিতর্কের জবাবে মরিয়ম বেগমও একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি নিজেকে গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেন।
তার দাবি, ১৭ জুন সাতক্ষীরার শ্যামনগরে তার বাবার বাড়িতে দুই পরিবারের সম্মতিতে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। সেই অনুষ্ঠানে এমপির প্রথম স্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন বলে তিনি জানান।
মরিয়ম বলেন, ১৩ জুলাই ঢাকার মগবাজারে তার বাবার কার্যালয়ে দুই স্ত্রীকে নিয়ে এমপির উপস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ পারিবারিক একটি সফর। সেখানে পরিকল্পিতভাবে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয় এবং স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও গোপনে ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
তার অভিযোগ, এই ভিডিও প্রচারের মাধ্যমে তাদের মানহানি ও সামাজিকভাবে হেনস্তা করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ঘটনার বিভিন্ন পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যে একাধিক অসঙ্গতি সামনে এসেছে। একদিকে বিয়ের স্থান নিয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। কোথাও মগবাজারে বিয়ের কথা বলা হয়েছে, আবার কোথাও শ্যামনগরের বাসভবনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া বায়োডাটায় ‘অবিবাহিত’ উল্লেখ থাকা এবং পরে বিয়ের দাবি, একই সঙ্গে সুপারিশপত্রে এমপির স্বাক্ষর সব মিলিয়ে বিষয়টি নিয়ে আরও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এই ঘটনাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা মতামত, বিশ্লেষণ ও বিতর্ক চলছে। কেউ ভিডিওর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, আবার কেউ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যের অসামঞ্জস্য নিয়ে আলোচনা করছেন।
তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফলাফল বা চূড়ান্ত কোনো ব্যাখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।

