দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আবারও বড় পরিসরে গম আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে এবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে একটি বিষয় আন্তর্জাতিক বাজারদরের তুলনায় তুলনামূলক বেশি দামে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম কেনার সিদ্ধান্ত।
সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সর্বশেষ বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন গম আমদানির একটি প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একই বৈঠকে সিঙ্গাপুর থেকেও ৫০ হাজার মেট্রিক টন গম সংগ্রহের অনুমোদন দেওয়া হয়।
এই দুই চালান মিলিয়ে সরকারের মোট ব্যয় দাঁড়াবে ১ হাজার ৫২ কোটি ৪০ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। ফলে খাদ্যপণ্য আমদানিতে সরকারের ব্যয়ের পরিমাণ আরও বাড়ছে।
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে ধারাবাহিকভাবে গম আমদানি করছে বাংলাদেশ। এই পদ্ধতিতে সরাসরি দুই দেশের মধ্যে চুক্তি হওয়ায় সরবরাহ প্রক্রিয়া তুলনামূলক দ্রুত সম্পন্ন হয়।
এর আগে চারটি পৃথক চালানে মোট প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টনের বেশি গম দেশে পৌঁছেছে।
প্রথম চালানে আসে ৫৬ হাজার ৯৫৯ মেট্রিক টন গম। দ্বিতীয় চালানে আসে ৬০ হাজার ৮০২ মেট্রিক টন। তৃতীয় চালানে আসে ৬০ হাজার ৮৭৫ মেট্রিক টন এবং চতুর্থ চালানে আসে ৬০ হাজার ৯৫০ মেট্রিক টন গম।
চলতি বছরেও একই প্রক্রিয়ায় আরও কয়েক দফা গম আমদানি করা হয়েছে, যা দেশের খাদ্য মজুত শক্তিশালী রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
শুধু জি-টু-জি চুক্তির ওপর নির্ভর না করে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমেও গম সংগ্রহ করছে বাংলাদেশ সরকার।
এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের সরবরাহ পরিস্থিতি, গমের গুণগত মান এবং বাজারমূল্য বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
রাশিয়া, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, রোমানিয়া, ইউক্রেন, আর্জেন্টিনা ও কাজাখস্তানসহ একাধিক দেশ থেকে নিয়মিত গম আমদানি করা হয়।
এই বহুমুখী উৎস থেকে গম সংগ্রহের ফলে বাজারে সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা সহজ হয় এবং সংকটের ঝুঁকিও কমে।
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম ওঠানামা করলেও কিছু ক্ষেত্রে সরবরাহ নিশ্চিত করতে তুলনামূলক বেশি দামে কেনার সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
বিশেষ করে বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি, জাহাজ পরিবহন ব্যয়, ডলার সংকট এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনের চাপ গমের দামে প্রভাব ফেলছে।
সরকার হয়তো দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে এবং নিরবচ্ছিন্ন খাদ্য মজুত ধরে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উচ্চমূল্যে চুক্তি করেছে।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, যখন অন্যান্য দেশ থেকে তুলনামূলক কম দামে গম পাওয়া যাচ্ছে, তখন কেন বেশি দামে আমদানি করা হচ্ছে?
বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ গমের চাহিদা থাকে। বিশেষ করে আটা, ময়দা এবং বিভিন্ন খাদ্যপণ্য উৎপাদনে গমের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে।
স্থানীয় উৎপাদন দিয়ে এই চাহিদা পুরোপুরি পূরণ সম্ভব না হওয়ায় আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত মজুত রাখা জরুরি। এজন্য দ্রুত আমদানি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, বাজারদর যাচাই করে কম খরচে আমদানির সুযোগ থাকলে সেটি বিবেচনায় নেওয়া উচিত ছিল।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সরকারিভাবে গম আমদানির ফলে দেশের বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে। এতে আটা-ময়দার বাজারে মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা মিলতে পারে।
যদি আমদানির গতি ঠিক থাকে, তাহলে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমতে পারে।
তবে উচ্চমূল্যে আমদানি দীর্ঘমেয়াদে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় বাড়াতে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করবে।

