দেশব্যাপী কঠোর নিরাপত্তা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অভিন্ন প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে শুরু হচ্ছে ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা। আগামী বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) থেকে একযোগে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড এবং বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। এবার মোট ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছেন।
পরীক্ষাকে স্বচ্ছ, সুষ্ঠু ও নকলমুক্ত রাখতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একাধিক নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে প্রতিটি কেন্দ্রে বাধ্যতামূলক সিসিটিভি ক্যামেরা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের জন্য বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত এবারের পরীক্ষাকে অন্য বছরের তুলনায় আরও নিরাপদ করে তুলবে।
বুধবার (১ জুলাই) সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন পরীক্ষার সার্বিক প্রস্তুতি তুলে ধরেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা ড. মাহ্দী আমিন, বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মন্ত্রী জানান, পরীক্ষার প্রতিটি ধাপে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবার প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দেশের সব পরীক্ষা কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি কেন্দ্রীয় সিসিটিভি মনিটরিং সেল চালু করা হয়েছে, যেখান থেকে দেশের যেকোনো পরীক্ষা কেন্দ্রের পরিস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
এছাড়া পরীক্ষা কেন্দ্রে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের শরীরে থাকবে বডি ওর্ন ক্যামেরা। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে অনিয়ম, প্রশ্নফাঁসের চেষ্টা, নকল কিংবা অন্য কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা সহজেই শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে বলে আশা করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো, প্রথমবারের মতো দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে সম্পূর্ণ অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতে, এই উদ্যোগের ফলে সব বোর্ডের পরীক্ষার্থীদের জন্য সমান মানের প্রশ্ন নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় সমতা বজায় রাখা সহজ হবে এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈষম্য কমবে।
এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে মোট ২ হাজার ৬৯৭টি পরীক্ষা কেন্দ্রে। এসব কেন্দ্রের অধীনে রয়েছে ৯ হাজার ৪৩৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
দেশের শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত সব কেন্দ্রেই একই ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর থাকবে। শিক্ষা প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সমন্বিতভাবে কাজ করবে।
২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় মোট ৭৭টি বিষয়েপরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। পুরো পরীক্ষা কার্যক্রম শেষ করতে সময় লাগবে ২১ দিন।
শিক্ষার্থীদের একাডেমিক কার্যক্রম যাতে ব্যাহত না হয়, সে বিষয়েও বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যেসব দিনে পরীক্ষা থাকবে না, সেসব দিনে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম চালু থাকবে।
নকল ও অনিয়ম রোধে এবার কঠোর অবস্থান নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। যেসব ভেন্যু কেন্দ্র অতীতে নকলের অভিযোগে বিতর্কিত ছিল, সেগুলো সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা হয়েছে।
তবে হাওর এলাকা, পার্বত্য অঞ্চল এবং দুর্গম চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে কিছু দূরবর্তী কেন্দ্র বহাল রাখা হয়েছে। এতে দুর্গম এলাকার পরীক্ষার্থীরা অতিরিক্ত ভোগান্তি ছাড়াই পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন।
ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি সম্মান জানিয়ে সেভেন্থ ডে অ্যাডভান্টিস্ট সম্প্রদায়ের পরীক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
শনিবার অনুষ্ঠিত নির্ধারিত পরীক্ষাগুলো তাদের ক্ষেত্রে সূর্যাস্তের পর একই কেন্দ্রের ভেতরে গ্রহণ করা হবে। ফলে তারা ধর্মীয় বিধান মেনে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন।
এবারের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেনি।
২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৬১ জন। এর মধ্যে পরীক্ষার ফরম পূরণ করেছেন ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪৭৭ জন।
অর্থাৎ ৩ লাখ ৯১ হাজার ৯৮৪ জন নিয়মিত শিক্ষার্থী এবার পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না। শতকরা হিসাবে এই হার ৩৩ দশমিক ৪ শতাংশ।
বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের আওতায় আলিম প্রথম বর্ষে নিবন্ধিত ছিলেন ১ লাখ ৩৯ হাজার ৯২৯ জন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে ৭৮ হাজার ২৬৯ জন ফরম পূরণ করেছেন।
ফলে ৬১ হাজার ৬৬০ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না, যা মোট নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর ৪৪ দশমিক ৭ শতাংশ।
বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ভোকেশনাল একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থী ছিলেন ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪২ জন। এর মধ্যে পরীক্ষার ফরম পূরণ করেছেন ৭৫ হাজার ১৯৭ জন।
অন্যদিকে ৯০ হাজার ৩৪৫ জন নিয়মিত শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেননি। শতাংশের হিসাবে এই হার ৫৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ, যা তিনটি বোর্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতে, এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আরও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হবে। সিসিটিভি নজরদারি, বডি ওর্ন ক্যামেরা, কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেল এবং অভিন্ন প্রশ্নপত্র—সব মিলিয়ে পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এসব উদ্যোগের ফলে প্রশ্নফাঁস, নকল এবং অন্যান্য অনিয়ম অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকবে। একই সঙ্গে দেশের লাখো শিক্ষার্থী একটি নিরাপদ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ পরিবেশে তাদের গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে।

