খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeস্পোটস ওয়ার্ল্ডফিফা বিশ্বকাপ স্পেশালমেসির ম্যুরাল, মারাদোনার মূর্তি আর বিশ্বকাপ স্বপ্নে বেঁচে থাকা এক ভক্তের অবিশ্বাস্য...

মেসির ম্যুরাল, মারাদোনার মূর্তি আর বিশ্বকাপ স্বপ্নে বেঁচে থাকা এক ভক্তের অবিশ্বাস্য গল্প

মিরোস্লাভের ব্যক্তিগত গাড়িতেও ফুটে উঠেছে মেসির প্রতি অগাধ ভালোবাসা। গাড়ির পেছনে আঁকা রয়েছে লিওনেল মেসির প্রতিকৃতি। সেখানে বড় অক্ষরে লেখা—‘মেসির ওপর ভরসা আছে।’

বিশ্ব ফুটবলে আর্জেন্টিনার জনপ্রিয়তা শুধু দেশটির সীমান্তেই সীমাবদ্ধ নয়। পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি সমর্থকের কাছে আকাশি-সাদা জার্সি শুধু একটি দলের পরিচয় নয়, বরং আবেগ, ভালোবাসা এবং আজীবনের এক বন্ধন। সেই ভালোবাসারই অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছেন চেক প্রজাতন্ত্রের এক ফুটবলপ্রেমী, যার পুরো জীবনজুড়ে স্থান করে নিয়েছেন ফুটবল কিংবদন্তি দিয়েগো মারাদোনা ও বর্তমান প্রজন্মের মহাতারকা লিওনেল মেসি।

চেক প্রজাতন্ত্রের বুকোভকা শহরে বসবাসকারী ৫১ বছর বয়সী মিরোস্লাভ আরবানেচের বাড়ি দেখলে যে কেউ প্রথমে অবাক হয়ে যাবেন। তিনতলা বাড়ির বাইরের রং আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের জার্সির মতো আকাশি-সাদা। বাড়ির দেয়ালে শোভা পাচ্ছে লিওনেল মেসির বিশাল ম্যুরাল। পাশাপাশি আঁকা রয়েছে আর্জেন্টিনার জাতীয় পতাকা।

শুধু তাই নয়, বাড়ির উঠোনে স্থাপন করা হয়েছে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় দিয়েগো মারাদোনার একটি মূর্তি। যেন ইউরোপের বুকে দাঁড়িয়ে তৈরি হয়েছে আর্জেন্টিনারই এক ক্ষুদ্র সংস্করণ।

মিরোস্লাভ শুধু বাড়ি সাজিয়েই থেমে থাকেননি। নিজের উঠোনে তৈরি করেছেন একটি ছোট ফুটবল মাঠ। মাঠের চারপাশে রয়েছে মারাদোনার ক্লাব বোকা জুনিয়র্সের ছবি। এছাড়াও দেয়ালজুড়ে রয়েছে বার্সেলোনা ও আর্জেন্টিনার জার্সি পরা মেসির অসংখ্য ছবি।

বাড়ির প্রতিটি কোণ যেন ফুটবলের ইতিহাস আর আর্জেন্টিনার গৌরবগাথা তুলে ধরে। মারাদোনা ও মেসির স্মৃতিতে সাজানো এই বাড়ি আজ স্থানীয়দের কাছেও একটি আকর্ষণীয় স্থান হয়ে উঠেছে।

মিরোস্লাভের আর্জেন্টিনা-প্রেমের শুরু শৈশব থেকেই। মাত্র চার বছর বয়সে তিনি ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ দেখেছিলেন বাবার সঙ্গে। সেই বিশ্বকাপেই প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা।

সেই স্মৃতি আজও অমলিন। তিনি জানান, বাবার কাছ থেকেই ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা জন্মেছিল। আর্জেন্টিনার সেই ঐতিহাসিক জয় এবং মারিও কেম্পেসের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স তাঁকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। পরে মারাদোনার জাদুকরী ফুটবল এবং বর্তমান সময়ে লিওনেল মেসির অসাধারণ সাফল্য তাঁর ভালোবাসাকে আরও গভীর করে তোলে।

মিরোস্লাভের ফুটবলপ্রেম শুধু বাড়ির বাইরেই সীমাবদ্ধ নয়। ঘরের ভেতরেও রয়েছে মেসি ও মারাদোনার অসংখ্য স্মারক।

চায়ের কাপে মেসির ছবি, খাবারের প্লেটে মারাদোনার প্রতিকৃতি, দেয়ালজুড়ে অসংখ্য ফ্রেমবন্দী মুহূর্ত—সব মিলিয়ে পুরো বাড়িই যেন ফুটবল জাদুঘর।

তাঁর সংগ্রহে রয়েছে প্রায় ৩০টি মেসি ও মারাদোনার জার্সি। প্রতিটি জার্সির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আলাদা স্মৃতি ও আবেগ।

মিরোস্লাভের ব্যক্তিগত গাড়িতেও ফুটে উঠেছে মেসির প্রতি অগাধ ভালোবাসা। গাড়ির পেছনে আঁকা রয়েছে লিওনেল মেসির প্রতিকৃতি। সেখানে বড় অক্ষরে লেখা—‘মেসির ওপর ভরসা আছে।’

শুধু গাড়ির ডিজাইনই নয়, বিশেষভাবে অর্থ ব্যয় করে তিনি নিজের গাড়ির নম্বর প্লেটেও যুক্ত করেছেন মারাদোনার নাম। এমনকি তাঁর ব্যবহৃত জুতাতেও রয়েছে মেসির ছবি।

এ থেকেই বোঝা যায়, আর্জেন্টিনা তাঁর কাছে শুধুমাত্র একটি ফুটবল দল নয়, বরং জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

মিরোস্লাভের ভালোবাসা শুধু তাঁর নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর সন্তানরাও বাবার অনুপ্রেরণায় আর্জেন্টিনার সমর্থক হয়ে উঠেছে।

এমনকি নিজের সাত বছর বয়সী ছেলের নামও রেখেছেন ‘লিওনেল’। প্রিয় ফুটবলারের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার এমন ব্যতিক্রমী উদাহরণ খুব কমই দেখা যায়।

পেশায় মিউজিক প্রোমোটার হলেও ফুটবল তাঁর জীবনের অন্যতম বড় আবেগ। আসন্ন ম্যাচে আর্জেন্টিনা মাঠে নামলে চেক প্রজাতন্ত্রের বুকোভকায় বসেই হাজারো কিলোমিটার দূর থেকে গলা ফাটিয়ে সমর্থন জানাবেন তিনি।

মিরোস্লাভের বিশ্বাস, লিওনেল মেসি এখনও বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার এবং বড় মঞ্চে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর রয়েছে। তাঁর মতে, মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা ধারাবাহিকভাবে দৃষ্টিনন্দন ফুটবল উপহার দিয়ে বিশ্বজুড়ে কোটি সমর্থকের হৃদয় জয় করেছে।

তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, মেসির ওপর তাঁর বিশ্বাস কখনও কমেনি। আগেও ছিল, এখনও আছে। মাঠে মেসি থাকলে আর্জেন্টিনা সবসময়ই বড় কিছু করার সামর্থ্য রাখে।

ফুটবল এমন একটি খেলা, যা ভাষা, সংস্কৃতি কিংবা ভৌগোলিক দূরত্বের সীমা অতিক্রম করে মানুষকে এক সুতোয় গেঁথে রাখে। মিরোস্লাভ আরবানেচ সেই বাস্তবতারই জীবন্ত উদাহরণ।

দক্ষিণ আমেরিকার একটি দেশের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা প্রমাণ করে, ফুটবলের শক্তি কতটা গভীর হতে পারে। হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থেকেও তিনি প্রতিটি ম্যাচে হৃদয় দিয়ে সমর্থন করেন আর্জেন্টিনাকে।

মিরোস্লাভ আরবানেচের গল্প শুধু একজন ফুটবল সমর্থকের গল্প নয়, এটি আবেগ, নিষ্ঠা এবং দীর্ঘদিনের ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি। বাড়ির দেয়ালে মেসির ম্যুরাল, উঠোনে মারাদোনার মূর্তি, সংগ্রহে অসংখ্য জার্সি, গাড়িতে প্রিয় তারকার ছবি এবং সন্তানের নাম ‘লিওনেল’—সবকিছুই বলে দেয়, আর্জেন্টিনা তাঁর কাছে শুধুই একটি দল নয়, বরং জীবনের একটি বড় অংশ।

বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে এমন নিবেদিত সমর্থকরাই প্রমাণ করেন, ফুটবল শুধু ৯০ মিনিটের খেলা নয়; এটি মানুষের হৃদয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক আজীবনের অনুভূতি।