বিশ্বকাপের মঞ্চে কিলিয়ান এমবাপে যেন এক অপ্রতিরোধ্য নাম। বড় আসর আর গোল—এই দুই শব্দ এখন প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছে ফরাসি এই তারকার ক্ষেত্রে। প্রতিটি ম্যাচে নিজের গতি, দক্ষতা এবং গোল করার অসাধারণ ক্ষমতা দিয়ে তিনি প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলছেন। চলতি বিশ্বকাপেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। গোলের পর গোল করে শুধু দলকে এগিয়ে নিচ্ছেন না, একই সঙ্গে গড়ে চলেছেন নতুন নতুন রেকর্ড।
বিশেষ করে নকআউট পর্বে তার পারফরম্যান্স ফুটবল বিশ্বকে নতুন করে বিস্মিত করেছে। যদিও গোলসংখ্যায় লিওনেল মেসির সঙ্গে সমতা রয়েছে, তারপরও গোল্ডেন বুটের দৌড়ে এমবাপে কেন এগিয়ে—সেটিও এখন ফুটবলপ্রেমীদের আলোচনার বড় বিষয়।
গ্রুপ পর্ব থেকেই আগুন ঝরানো ফর্মে আছেন এমবাপে। সেনেগাল এবং ইরাকের বিপক্ষে দুটি করে গোল করে নিজের সামর্থ্যের জানান দিয়েছিলেন তিনি। এরপর নকআউট পর্বেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন।
রাউন্ড অব ৩২-এ ফ্রান্সের প্রতিপক্ষ ছিল সুইডেন। ম্যাচটি নিয়ে শুরুর দিকে কিছুটা উত্তেজনা থাকলেও মাঠে ফরাসি দল প্রতিপক্ষকে খুব একটা সুযোগ দেয়নি। ম্যাচের ৪৫ মিনিটে বক্সের ডানদিক দিয়ে দুর্দান্ত গতিতে ঢুকে দুই ডিফেন্ডারকে ফাঁকি দিয়ে অসাধারণ কার্লিং শটে গোল করেন এমবাপে।
গোল করার পরই তিনি ছুটে যান কোচ দিদিয়ের দেশঁর কাছে। সম্প্রতি মায়ের শেষকৃত্য সম্পন্ন করে দলের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন ফরাসি কোচ। এই আবেগঘন মুহূর্তটি ফুটবলপ্রেমীদের মনও ছুঁয়ে যায়।
এরপর ৭৪ মিনিটে আবারও নিজের দ্বিতীয় গোল করেন এমবাপে। মাইকেল অলিসের পাস থেকে পরিচিত স্টাইলে বল জালে জড়িয়ে দেন এই তারকা ফুটবলার। ম্যাচ শেষে কোচ দেশঁও এমবাপের পারফরম্যান্সের প্রশংসায় মাথা নত করেন।
এই বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত এমবাপের গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬-এ। তবে শুধু এই টুর্নামেন্ট নয়, বিশ্বকাপের পুরো ক্যারিয়ার হিসেব করলে তার গোলসংখ্যা এখন ১৮।
এই সংখ্যাটিই তাকে নতুন দুটি ঐতিহাসিক রেকর্ড এনে দিয়েছে।
প্রথমত, বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে সবচেয়ে বেশি গোল করার রেকর্ড এখন তার দখলে। নকআউট ম্যাচে এমবাপের গোলসংখ্যা পৌঁছেছে ১০-এ।
এর আগে এই তালিকায় এগিয়ে ছিলেন কিংবদন্তি ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার Ronaldo Nazário, যার গোল ছিল ৮টি। এছাড়া ফুটবল সম্রাট Pelé করেছিলেন ৭ গোল।
দ্বিতীয় রেকর্ডটি আরও বড়। ইউরোপের ফুটবলারদের মধ্যে বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গোলের মালিক এখন এমবাপে। তিনি ছাড়িয়ে গেছেন জার্মান কিংবদন্তি Miroslav Klose-কে, যার বিশ্বকাপ গোলসংখ্যা ছিল ১৬।
মাত্র ২৭ বছর বয়সেই এমবাপে এই উচ্চতায় পৌঁছে গেছেন, যা ভবিষ্যতে আরও বিস্ময়কর রেকর্ডের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
চলতি বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুটের দৌড় এখন বেশ জমে উঠেছে। এমবাপে এবং Lionel Messi—দু’জনেরই গোলসংখ্যা বর্তমানে ৬।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, যদি গোল সমান হয় তাহলে কে এগিয়ে?
এখানে আসে গোল্ডেন বুটের নিয়ম। শুধু গোলসংখ্যা দিয়ে বিজয়ী নির্ধারণ করা হয় না। গোলের পাশাপাশি অ্যাসিস্টও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এমবাপে এই বিশ্বকাপে ৬ গোলের পাশাপাশি করেছেন ২টি অ্যাসিস্টও। অর্থাৎ, নিজের গোলের পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়েও গোল করানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছেন তিনি।
অন্যদিকে মেসির গোলসংখ্যা সমান হলেও অ্যাসিস্টের সংখ্যা নেই। আর এই কারণেই গোল্ডেন বুটের বর্তমান হিসাব অনুযায়ী এগিয়ে রয়েছেন এমবাপে।
ফুটবলপ্রেমীদের মনে আরও একটি প্রশ্ন ঘুরছে—যদি কোনো দুই খেলোয়াড়ের গোল এবং অ্যাসিস্ট দুটোই সমান হয়, তাহলে বিজয়ী নির্ধারণ করা হবে কীভাবে?
এই পরিস্থিতিতে দেখা হবে খেলোয়াড় কত মিনিট মাঠে খেলেছেন। যিনি কম সময় মাঠে থেকে একই সংখ্যক গোল এবং অ্যাসিস্ট করেছেন, তাকেই এগিয়ে রাখা হবে।
এর পেছনের যুক্তিও পরিষ্কার। কম সময় খেলে একই অবদান রাখতে পারা মানে বেশি কার্যকর পারফরম্যান্স দেখানো।
বর্তমান পারফরম্যান্স বিবেচনা করলে মনে হচ্ছে এমবাপে কেবল শুরু করেছেন। বয়স এখনও তার পক্ষে। এমন গতিতে এগোতে থাকলে বিশ্বকাপ ইতিহাসের আরও বহু রেকর্ড হয়তো তার দখলে চলে আসবে।
শুধু গোল নয়, বড় ম্যাচে চাপের মুহূর্তে নিজেকে প্রমাণ করার যে ক্ষমতা তিনি দেখাচ্ছেন, সেটিই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করছে। এখন দেখার বিষয়, বিশ্বকাপের শেষ পর্যন্ত তিনি এই ফর্ম ধরে রাখতে পারেন কি না এবং শেষ পর্যন্ত গোল্ডেন বুট নিজের করে নিতে পারেন কি না।
ফুটবল বিশ্ব এখন সেই উত্তর জানার অপেক্ষায়।

