দেশজুড়ে শুরু হয়েছে ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) থেকে একযোগে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড এবং বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড-এর অধীনে এই পরীক্ষা শুরু হয়। দেশের শিক্ষাজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই পাবলিক পরীক্ষায় এবার অংশ নিচ্ছে মোট ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন শিক্ষার্থী।
গত বছরের তুলনায় এবার পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। ২০২৫ সালে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১০ লাখ ৫৫ হাজার ৩৯৮ জন। সেই হিসেবে এবারের পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বেড়েছে ১৪ হাজার ৩১৬ জন। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি উচ্চশিক্ষার পথে নতুন একটি বড় ধাপ।
এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে মোট ২ হাজার ৬৯৭টি কেন্দ্রে। এসব কেন্দ্রের আওতায় রয়েছে ৯ হাজার ৪৩৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
এবারের একটি বড় পরিবর্তন হলো, ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। এতে প্রশ্নের মান ও মূল্যায়নে সমতা নিশ্চিত হবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতার পরিবেশ আরও সমান হবে।
২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার নিয়েছে কঠোর ব্যবস্থা। দেশের সব পরীক্ষা কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
শুধু তাই নয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে গঠন করা হয়েছে বিশেষ ‘সিসিটিভি মনিটরিং সেল’। এখান থেকে দেশের যেকোনো কেন্দ্রের পরিস্থিতি সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা যাবে।
এছাড়া দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের শরীরে থাকবে বডি ওর্ন ক্যামেরা। এই প্রযুক্তি নকল ঠেকানো, অনিয়ম প্রতিরোধ এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বড় ভূমিকা রাখবে।
শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, এবার মোট ৭৭টি বিষয়ে ২১ দিনের মধ্যে লিখিত পরীক্ষা শেষ করা হবে।
পরীক্ষার্থীদের সুবিধার জন্য জানানো হয়েছে, যেসব দিনে পরীক্ষা থাকবে না, সেসব দিনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত ক্লাস চালু থাকবে। ফলে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ থাকবে না।
এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পরীক্ষার ফাঁকে অনেক শিক্ষার্থী পরবর্তী প্রস্তুতিও চালিয়ে যেতে পারবে।
এবার নকলের জন্য পরিচিত ও বিতর্কিত ভেন্যু কেন্দ্রগুলো সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে। এতে পরীক্ষার মান নিয়ে যে প্রশ্ন উঠত, তা অনেকটাই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে দেশের হাওর অঞ্চল, পার্বত্য এলাকা এবং দুর্গম চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সুবিধার কথা বিবেচনায় কিছু দূরবর্তী কেন্দ্র বহাল রাখা হয়েছে।
এটি বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন অভিভাবকরা।
‘সেভেন্থ ডে অ্যাডভান্টিস্ট’ সম্প্রদায়ের পরীক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। শনিবারে নির্ধারিত পরীক্ষাগুলো তাদের জন্য সূর্যাস্তের পর কেন্দ্রের ভেতরেই নেওয়া হবে।
এই সিদ্ধান্ত ধর্মীয় স্বাধীনতা ও পরীক্ষায় সমান সুযোগ নিশ্চিত করার একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ২০২৬ সালে মোট পরীক্ষার্থী দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৬৯ হাজার ৭১৪ জন। এর মধ্যে ছাত্র ৪ লাখ ৯২ হাজার ৪০৬ জন এবং ছাত্রী ৫ লাখ ৭৭ হাজার ৩০৮ জন।
গত বছরের তুলনায় ছাত্র বেড়েছে ১ হাজার ১২২ জন। অন্যদিকে ছাত্রী বেড়েছে ১৩ হাজার ১৯৪ জন।
এটি স্পষ্টভাবে দেখায়, মেয়েদের অংশগ্রহণের হার আগের চেয়ে আরও বেড়েছে।
প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বেড়েছে। ২০২৫ সালে যেখানে ছিল ৪ হাজার ৮০৮টি, সেখানে এবার হয়েছে ৪ হাজার ৮৮৫টি। অর্থাৎ বেড়েছে ৭৭টি প্রতিষ্ঠান।
কেন্দ্রের সংখ্যাও বেড়ে ১ হাজার ৬২৬-এ দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড-এর অধীনে এবার মোট পরীক্ষার্থী ৯২ হাজার ৯০৫ জন। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৮৬ হাজার ১০২।
অর্থাৎ বেড়েছে ৬ হাজার ৮০৩ জন।
এই বোর্ডে ছাত্র সংখ্যা ৫২ হাজার ১১ জন এবং ছাত্রী সংখ্যা ৪০ হাজার ৮৯৪ জন। কেন্দ্র রয়েছে ৪৬১টি এবং অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান ২ হাজার ৭০৫টি।
বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড-এ এবার মোট পরীক্ষার্থী ১ লাখ ৭ হাজার ৯৬৪ জন। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৯ হাজার ৬১১।
অর্থাৎ কমেছে ১ হাজার ৬৪৭ জন।
তবে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ২৫টি। বর্তমানে এই বোর্ডের আওতায় ১ হাজার ৮৪৯টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে।
একইসঙ্গে পরীক্ষার কেন্দ্র কমে দাঁড়িয়েছে ৬১০টিতে।
এবার একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধিত ছিল ১১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৬১ জন শিক্ষার্থী। কিন্তু তাদের মধ্যে মাত্র ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪৭৭ জন ফরম পূরণ করেছে।
অর্থাৎ প্রায় ৩৩.৪ শতাংশ শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেনি।
মাদ্রাসা বোর্ডে এই হার আরও বেশি। সেখানে ৪৪.৭ শতাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়নি।
সবচেয়ে বেশি অনুপস্থিতি দেখা গেছে কারিগরি বোর্ডে। সেখানে ৫৪.৫৮ শতাংশ শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেনি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। কেন এত শিক্ষার্থী শেষ পর্যন্ত পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না, সেটি নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে।
এইচএসসি পরীক্ষা শুধু একটি পরীক্ষা নয়, এটি উচ্চশিক্ষার দরজা খোলার অন্যতম চাবিকাঠি। তাই শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়।
নতুন নিয়ম, কঠোর নিরাপত্তা এবং অভিন্ন প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে এবার পরীক্ষাকে আরও সুশৃঙ্খল ও গ্রহণযোগ্য করার চেষ্টা করা হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয় এবং শিক্ষার্থীরা কেমন ফলাফল নিয়ে সামনে আসে।

