বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার হিসেবে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করলেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেন। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে জোড়া গোল করে দলকে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় তুলেছেন তিনি। শুধু ম্যাচ জেতানোই নয়, একের পর এক রেকর্ড গড়ে ফুটবল বিশ্বে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছেন এই তারকা। তাঁর অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখে সতীর্থ অ্যান্থনি গর্ডন তাঁকে লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর সঙ্গে তুলনা করেছেন। তবে এই তুলনা নিয়ে অত্যন্ত বিনয়ী প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন কেন।
নকআউট পর্বে ওঠার লড়াইয়ে শুরুতে পিছিয়ে পড়লেও ইংল্যান্ড দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায়। সেই প্রত্যাবর্তনের নায়ক ছিলেন অধিনায়ক হ্যারি কেন। তাঁর দুটি গুরুত্বপূর্ণ গোলেই জয় নিশ্চিত করে ইংল্যান্ড এবং নিশ্চিত হয় শেষ ষোলোয় জায়গা।
এই ম্যাচে কেন শুধু দলের জয়ই এনে দেননি, বরং নিজের গোলসংখ্যাও আরও সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর ধারাবাহিক পারফরম্যান্স আবারও প্রমাণ করেছে কেন তিনি বর্তমান সময়ের অন্যতম নির্ভরযোগ্য স্ট্রাইকার।
ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ডের মিডফিল্ডার অ্যান্থনি গর্ডন হ্যারি কেনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন। তাঁর মতে, বর্তমান মৌসুমে কেন যে মানের ফুটবল খেলছেন, তা বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
গর্ডন বলেন, কেনের সঙ্গে খেলতে পারা যে কোনও ফুটবলারের জন্য সৌভাগ্যের বিষয়। তিনি মনে করেন, ধারাবাহিক পারফরম্যান্স, গোল করার ক্ষমতা এবং দলের জন্য অবদান—সব মিলিয়ে কেনের মধ্যে বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের বৈশিষ্ট্য স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
চলতি মৌসুমে সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে হ্যারি কেন ইতোমধ্যেই ৭২টি গোল করেছেন। এই অসাধারণ সাফল্যের মাধ্যমে তিনি এক মৌসুমে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর ৬৯ গোলের রেকর্ড অতিক্রম করেছেন।
এই তালিকায় এখন তাঁর সামনে রয়েছেন কেবল লিওনেল মেসি, যার এক মৌসুমে ৯১ গোল করার অবিশ্বাস্য রেকর্ড এখনও অটুট।
হ্যারি কেনের গোল করার ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে, এটি শুধুমাত্র প্রতিভার ফল নয়; বরং কঠোর পরিশ্রম, ফিটনেস এবং পেশাদার মানসিকতার প্রতিফলন।
বিশ্বকাপ ইতিহাসেও নিজের অবস্থান শক্ত করছেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক। বর্তমানে বিশ্বকাপে তাঁর গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩টি, যা তাঁকে কিংবদন্তি পেলেকে ছাড়িয়ে যেতে সাহায্য করেছে।
এখন তাঁর সামনে রয়েছেন ফুটবল ইতিহাসের কয়েকজন সর্বকালের সেরা গোলদাতা। বর্তমান ফর্ম ধরে রাখতে পারলে শীর্ষস্থানীয় গোলদাতাদের রেকর্ডও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
হ্যারি কেনের সর্বশেষ সাফল্যের অন্যতম বড় দিক হলো কিলিয়ান এমবাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড ভাঙা।
২০২০ ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের পর থেকে দেশের হয়ে বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার নকআউট ম্যাচে কেন করেছেন ১০টি গোল, যা ইউরোপীয় ফুটবলারদের মধ্যে সর্বোচ্চ।
অন্যদিকে, ফ্রান্সের তারকা কিলিয়ান এমবাপের গোলসংখ্যা ৭টি। এছাড়া স্পেনের ড্যানি ওলমো, ডেনমার্কের ক্যাসপার ডলবার্গ এবং পর্তুগালের গনসালো রামোস করেছেন তিনটি করে গোল।
এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে গোল করার ক্ষেত্রে বর্তমানে ইউরোপের সবচেয়ে কার্যকর ফরোয়ার্ডদের একজন হ্যারি কেন।
মেসি ও রোনাল্ডোর সঙ্গে নিজের নাম উচ্চারিত হলেও সেই তুলনায় খুব একটা গুরুত্ব দিতে চাননি হ্যারি কেন।
তিনি জানান, মাঠের বাইরের কঠোর পরিশ্রমই একজন ফুটবলারের আসল শক্তি। নিয়মিত অনুশীলন, ম্যাচের পর পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া, আইস বাথ, শারীরিক ফিটনেস ধরে রাখা এবং চোট কাটিয়ে ফিরে আসা—এসবই দীর্ঘ সময় ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের মূল রহস্য।
কেনের মতে, দর্শকরা সাধারণত ম্যাচের ৯০ মিনিটই দেখেন। কিন্তু সেই পারফরম্যান্সের পেছনে প্রতিদিনের অদৃশ্য পরিশ্রমই একজন ফুটবলারকে সেরা পর্যায়ে পৌঁছে দেয়।
নিজেকে কখনও মেসি বা রোনাল্ডোর সমকক্ষ ভাবতে চান না হ্যারি কেন।
তিনি বলেন, ফুটবল ইতিহাসে মেসি ও রোনাল্ডো এমন উচ্চতায় পৌঁছেছেন, যা সত্যিই অনন্য। তাঁদের সঙ্গে নিজের নাম উচ্চারিত হওয়াটাই তাঁর কাছে গর্বের বিষয়।
কেন আরও বলেন, ব্যক্তিগত রেকর্ড অবশ্যই আনন্দ দেয়, তবে তাঁর সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হলো ইংল্যান্ডকে বিশ্বকাপ জেতানো। দলের সাফল্যের চেয়ে ব্যক্তিগত অর্জন তাঁর কাছে কখনও বড় নয়।
বর্তমান ফর্ম বিবেচনায় ফুটবল বিশ্লেষকদের ধারণা, হ্যারি কেন আরও অনেক রেকর্ড নিজের নামে লিখতে পারেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাঁর ধারাবাহিক গোল করার ক্ষমতা এবং নেতৃত্ব ইংল্যান্ডকে শিরোপার অন্যতম দাবিদার করে তুলেছে।
যদি তিনি একই ছন্দ বজায় রাখতে পারেন, তাহলে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় আরও ওপরে উঠে আসা শুধু সময়ের অপেক্ষা।
হ্যারি কেন আবারও প্রমাণ করেছেন যে তিনি শুধু একজন গোলদাতা নন, বরং একজন প্রকৃত নেতা। জোড়া গোল করে ইংল্যান্ডকে শেষ ষোলোয় তোলার পাশাপাশি তিনি ভেঙেছেন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড এবং নতুন ইতিহাস গড়েছেন। মেসি ও রোনাল্ডোর সঙ্গে তুলনা হলেও কেন নিজের সাফল্যের কৃতিত্ব দিয়েছেন কঠোর অনুশীলন, শৃঙ্খলা এবং দলগত প্রচেষ্টাকে।
বিশ্বকাপের বাকি পথেও যদি তিনি একই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারেন, তবে ইংল্যান্ডের শিরোপা জয়ের স্বপ্ন আরও বাস্তব রূপ পেতে পারে।

