নিউজবাংলা ডেক্স,ঢাকা,২৬ আগষ্ট: গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের কেন্দ্রে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের ফরাক্কা ব্যারেজ। ১৯৭৫ সালে চালু হওয়া এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল গঙ্গার জল ভাগীরথী-হুগলি নদীতে প্রবাহিত করে কলকাতা নদী বন্দরের নাব্যতা ধরে রাখা। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ফরাক্কা শুধু একটি নদী প্রকল্পের নাম নয়, বরং বাংলাদেশ ও ভারতের পানিবণ্টন, বিহারের বন্যা এবং পশ্চিমবঙ্গের নদী ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িয়ে থাকা একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও পরিবেশগত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
সূত্রে জানা গেছে,১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকায় ফরাক্কা বাধ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ চায় নতুন চুক্তিতে পানির নিশ্চয়তা, ভারতের বিহার চাইছে বন্যা ও পলি জমার সমস্যার সমাধান, আর পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম উদ্বেগ হুগলি নদী ও কলকাতা বন্দরের নাব্যতা। ফলে নতুন চুক্তি তৈরি করা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য বড় ধরনের সমন্বয়ের পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
ফরাক্কা ব্যারেজ নির্মাণের পেছনে মূল কারণ ছিল হুগলি নদীতে অতিরিক্ত পলি জমে যাওয়া। দীর্ঘদিন ধরে পলি জমতে জমতে নদীর গভীরতা কমছিল। এর ফলে কলকাতা বন্দরে বড় জাহাজ প্রবেশ ও চলাচল ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছিল।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা ছিল, গঙ্গা থেকে অতিরিক্ত জল হুগলি নদীর দিকে প্রবাহিত করা গেলে পানির স্রোত বাড়বে এবং পলি ধুয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। সেই পরিকল্পনা থেকেই ফরাক্কা প্রকল্পের ধারণা আসে।
উনিশ শতকেও গঙ্গার পানি হুগলিতে প্রবাহিত করার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। ব্রিটিশ আমলে গঙ্গার পানি হুগলি নদীতে আনার জন্য ফরাক্কার কাছে বাঁধ নির্মাণের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। তবে সেই সময় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়নি।
পরে স্বাধীনতার পর বিষয়টি আবার গুরুত্ব পায় এবং শেষ পর্যন্ত গঙ্গার ওপর ফরাক্কা ব্যারেজ নির্মাণ করা হয়। প্রায় ২.২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ব্যারেজে রয়েছে ১০৯টি গেট।
ফরাক্কা ব্যারেজের অবস্থান বোঝার জন্য গঙ্গার গতিপথ জানা জরুরি। বিহার ও ঝাড়খণ্ড পেরিয়ে গঙ্গা পশ্চিমবঙ্গের মালদা অঞ্চলে প্রবেশ করে। এরপর ফরাক্কার কাছে এসে নদীর পানি দুটি প্রধান প্রবাহে বিভক্ত হয়।
একদিকে গঙ্গার পানি ভাগীরথী নদীর দিকে প্রবাহিত হয়ে পরে হুগলি নদীর রূপ নেয়। কলকাতা ও হলদিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও শিল্পাঞ্চল এই নদীর তীরে গড়ে উঠেছে।
অন্যদিকে গঙ্গার প্রধান প্রবাহ পদ্মা নামে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ফরাক্কা ব্যারেজের মাধ্যমে গঙ্গার পানি নিয়ন্ত্রণ করে একটি অংশ ভাগীরথী-হুগলি ব্যবস্থায় পাঠানো হয়।
এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিল হুগলি নদীতে পানির প্রবাহ বাড়িয়ে পলি অপসারণ করা এবং কলকাতা বন্দরের নাব্যতা ধরে রাখা।
বাংলাদেশের অভিযোগের মূল জায়গা হলো শুষ্ক মৌসুমে পদ্মায় পানির প্রবাহ কমে যাওয়া। ফরাক্কা থেকে হুগলির দিকে পানি সরিয়ে নেওয়ার ফলে বাংলাদেশের অংশে গঙ্গা-পদ্মার পানিপ্রবাহে প্রভাব পড়ে বলে দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে ঢাকা।
এর প্রভাব কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন এবং নদী-নির্ভর জীবিকার ওপর পড়তে পারে বলেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উদ্বেগ জানানো হয়েছে।
এই বিরোধ নতুন নয়। ১৯৭৫ সালে ফরাক্কা ব্যারেজ চালুর পর থেকেই ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গার পানি নিয়ে আলোচনা ও মতবিরোধ চলতে থাকে।
শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ আলোচনার পর ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর নয়াদিল্লিতে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
১৯৯৬ সালের চুক্তিতে শুষ্ক মৌসুমে ফরাক্কায় পানির প্রাপ্যতার ভিত্তিতে দুই দেশের মধ্যে পানি ভাগের একটি কাঠামো নির্ধারণ করা হয়।
চুক্তির হিসাব অনুযায়ী, পানির প্রাপ্যতা ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম হলে দুই দেশ সমান অংশ পাবে। পানির পরিমাণ ৭০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার কিউসেকের মধ্যে থাকলে বাংলাদেশ পাবে ৩৫ হাজার কিউসেক এবং অবশিষ্ট পানি ভারত পাবে।
আর পানির প্রাপ্যতা ৭৫ হাজার কিউসেক বা তার বেশি হলে ভারত সর্বোচ্চ ৪০ হাজার কিউসেক পাবে এবং বাকি পানি বাংলাদেশকে দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
এই চুক্তির মেয়াদ ৩০ বছর। ফলে ২০২৬ সালে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নতুন চুক্তি নিয়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এখন গঙ্গার পানির জন্য আরও নিশ্চয়তা চাওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। ঢাকার যুক্তি, ১৯৯৬ সালে চুক্তি করার সময় দেশের জনসংখ্যা, জলবায়ু ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের পরিস্থিতি বর্তমান সময়ের মতো ছিল না।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন এসেছে। কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও দীর্ঘস্থায়ী শুষ্কতা দেখা যাচ্ছে। ফলে নদীর পানির প্রবাহও আগের তুলনায় অনিশ্চিত হয়েছে।
বাংলাদেশের অবস্থান হলো, নতুন চুক্তিতে এমন ব্যবস্থা থাকা দরকার যাতে শুষ্ক মৌসুমেও পর্যাপ্ত পানি পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে। অর্থাৎ শুধু পানির ভাগ নির্ধারণ নয়, প্রয়োজনের সময় পানির সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিতে চাইছে ঢাকা।
ফরাক্কা নিয়ে শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতের ভেতরেও রয়েছে বিরোধ। বিহার দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, ফরাক্কা ব্যারেজের কারণে গঙ্গায় অতিরিক্ত পলি জমছে। এতে নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে।
বিহারের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবছর গঙ্গার বন্যা ও নদীভাঙন বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করে। ভাগলপুর, মুঙ্গেরসহ একাধিক অঞ্চল এর প্রভাবের মুখে পড়ে।
বিহারের রাজনৈতিক মহলের একটি অংশের দাবি, ফরাক্কা ব্যারেজের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং পলি জমার সমস্যা বাড়ছে। এ কারণে রাজ্যটি দীর্ঘদিন ধরেই ফরাক্কা ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
২০১৬ সালে বিহারের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার ফরাক্কা ব্যারেজ ভেঙে দেওয়ার পক্ষে মন্তব্য করে বিষয়টিকে আরও আলোচনায় আনেন।
ফরাক্কা নিয়ে বিহারের আরেকটি উদ্বেগ হলো পানি ব্যবস্থাপনা। একদিকে বর্ষাকালে গঙ্গায় অতিরিক্ত পানি ও পলি জমার কারণে বন্যার আশঙ্কা বাড়ে, অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ায় সেচ ও পানীয় জলের প্রয়োজন মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে।
ফলে বিহারের দাবি, গঙ্গার পানি ব্যবস্থাপনায় শুধু বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থ দেখলে চলবে না। নদীর উজানে থাকা বিহারের বন্যা, সেচ ও পানীয় জলের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
পশ্চিমবঙ্গের কাছে ফরাক্কার গুরুত্ব আরও বিস্তৃত। কারণ এই প্রকল্পের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ভাগীরথী-হুগলি নদীতে পর্যাপ্ত পানির প্রবাহ বজায় রাখা।
কলকাতা ও হলদিয়া অঞ্চলের বন্দর, নৌপরিবহন এবং নদীভিত্তিক অর্থনীতির সঙ্গে হুগলি নদীর নাব্যতা সরাসরি সম্পর্কিত। তাই বাংলাদেশকে বেশি পানি দেওয়া হলে হুগলিতে পর্যাপ্ত পানি থাকবে কি না, সেটিও পশ্চিমবঙ্গের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
অন্যদিকে বর্ষাকালে গঙ্গার পানি বেড়ে গেলে ফরাক্কা ব্যারেজের জল ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিহারের সঙ্গে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি হয়। অর্থাৎ একই ব্যারেজকে ঘিরে তিন পক্ষের তিন ধরনের স্বার্থ তৈরি হয়েছে।
১৯৯৬ সালের গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নতুন করে আলোচনা হওয়ার কথা। কিন্তু এবার পরিস্থিতি আগের চেয়ে জটিল।
বাংলাদেশ চাইছে পানির নিশ্চয়তা। বিহার চাইছে বন্যা ও পলি সমস্যার সমাধান। পশ্চিমবঙ্গ চাইছে হুগলি নদী ও কলকাতা বন্দরের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে। তিন পক্ষের দাবির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ফরাক্কা তাই এখন শুধু একটি ব্যারেজ নয়। এটি গঙ্গার পানির অধিকার, পরিবেশ, কৃষি, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীর নাব্যতা এবং প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্কের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।
নতুন গঙ্গা পানি চুক্তি হলে সেটি কতটা দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবসম্মত হবে, তার ওপর নির্ভর করবে আগামী কয়েক দশকে গঙ্গা অববাহিকার পানি ব্যবস্থাপনার ভবিষ্যত।
তথ্য সূত্র: Ajj Tak Bangla

