খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeবিশ্ব সংবাদনেপালে ভয়াবহ হড়পা বান: ভূমিকম্প নয়, হিমবাহ ধসেই কি শুরু হয়েছিল প্রলয়?

নেপালে ভয়াবহ হড়পা বান: ভূমিকম্প নয়, হিমবাহ ধসেই কি শুরু হয়েছিল প্রলয়?

ভয়াবহ এই স্রোতের গতি এতটাই বেশি ছিল যে নদীর তীরবর্তী জনপদগুলো নিজেদের সামলে ওঠার সুযোগ পায়নি। বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায়, প্রবল পানির তোড়ে গাড়ি, সেতু ও ভবন ভেসে যাচ্ছে। অনেক এলাকায় রাস্তা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। নেপালের গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত বাণিজ্যপথও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : নেপালে বুধবারের ভয়াবহ হড়পা বান মুহূর্তের মধ্যে বদলে দিয়েছে একটি বিস্তীর্ণ জনপদের চিত্র। ক্ষীণতোয়া ভোতে কোশী নদী আচমকাই পরিণত হয় ভয়ংকর স্রোতে। পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে ছুটে আসে পানি, বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ। চোখের সামনে ভেসে যায় ঘরবাড়ি, সেতু, রাস্তা ও বিভিন্ন স্থাপনা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে দেখা গেছে, প্রবল স্রোত কীভাবে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে নদীর আশপাশের এলাকা গ্রাস করেছে। নেপালের রুয়াসুয়া ও আশপাশের অঞ্চলে এই বিপর্যয়ে প্রাণহানি ও নিখোঁজের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে নেপাল পুলিশের হিসাবে মৃতের সংখ্যা ১৬২-তে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে কয়েকশ মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।

কিন্তু এই ভয়াবহ হড়পা বানের পেছনে আসল কারণ কী? শুরুতে ভূমিকম্পের কথা সামনে এলেও পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে ভিন্ন তথ্য। তাদের মতে, যে কম্পনকে প্রথমে ভূমিকম্প মনে করা হয়েছিল, সেটি আসলে হিমবাহ ধস ও তার সঙ্গে তৈরি হওয়া ধসপ্রবাহের ফল।

নেপালে হড়পা বানের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ

বুধবার সকালে নেপাল-চীন সীমান্তসংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় আকস্মিকভাবে পানির প্রবল স্রোত নেমে আসে। ভোতে কোশী নদী ধরে সেই স্রোত দ্রুত নিচের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। পরে এর প্রভাব পড়ে ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থাতেও।

ভয়াবহ এই স্রোতের গতি এতটাই বেশি ছিল যে নদীর তীরবর্তী জনপদগুলো নিজেদের সামলে ওঠার সুযোগ পায়নি। বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায়, প্রবল পানির তোড়ে গাড়ি, সেতু ও ভবন ভেসে যাচ্ছে। অনেক এলাকায় রাস্তা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। নেপালের গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত বাণিজ্যপথও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

নেপাল পুলিশের হিসাবে, বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত অন্তত ১৬২ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। রুয়াসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং, গোরখা, চিতওয়ান, তানাহুন ও নাওয়ালপরাসি ইস্টসহ একাধিক এলাকায় মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে।

প্রথমে কি ভূমিকম্পকেই দায়ী করা হয়েছিল?

দুর্যোগের পরপরই নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে ভূমিকম্পের খবর ছড়িয়ে পড়ে। প্রাথমিকভাবে একটি ভূকম্পনকে ৪.৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছিল। কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ৬৬ কিলোমিটার উত্তরে সীমান্তের কাছে এই কম্পন অনুভূত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।

এর পরেই ধারণা করা হয়, ভূমিকম্পের কারণে পাহাড়ে ভূমিধস বা হিমবাহ ধস তৈরি হতে পারে। সেই ধস হয়তো নদীর গতিপথ আটকে দিয়ে সাময়িক জলাধার তৈরি করেছে। পরে সেই বাধা ভেঙে গেলে বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষ নিচের দিকে নেমে এসে হড়পা বান সৃষ্টি করতে পারে।

তবে পরবর্তী বিশ্লেষণে এই ধারণা বদলে যায়।

ইউএসজিএস বলছে, ভূমিকম্প নয় হিমবাহ ধস

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস তাদের প্রাথমিক মূল্যায়ন সংশোধন করে জানায়, সেখানে আসলে কোনো ভূমিকম্প ঘটেনি। যে ভূকম্পন রেকর্ড হয়েছিল, সেটি হিমবাহ ধস ও ধসপ্রবাহের কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।

সংস্থাটি জানায়, স্থানীয় ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য, দীর্ঘ-তরঙ্গের ভূকম্পন সংকেত এবং উপগ্রহের ছবি বিশ্লেষণ করে তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। পরবর্তী বিশ্লেষণে ঘটনাটিকে ৫.২ মাত্রার একটি ভূকম্পন হিসেবে রেকর্ড করা হলেও এর উৎস ছিল হিমবাহ ধস ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ।

অর্থাৎ, সহজভাবে বললে, মাটির নিচে ভূমিকম্প হয়ে পাহাড় কেঁপে ওঠেনি। বরং পাহাড়ের ওপর জমে থাকা বরফ ও পাথরের বিশাল অংশ হঠাৎ ধসে পড়ে। সেই ধসের শক্তিই ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ যন্ত্রে কম্পন হিসেবে ধরা পড়ে।

কীভাবে হিমবাহ ধস থেকে তৈরি হয় হড়পা বান?

বিষয়টি বুঝতে হলে পাহাড়ি এলাকার ভূপ্রকৃতি একটু সহজভাবে ভাবতে হবে।

উঁচু পাহাড়ে বিশাল পরিমাণ বরফ ও পাথর জমে থাকে। কোনো কারণে সেই বরফের স্তর দুর্বল হয়ে গেলে বা নিচের অংশ ভেঙে গেলে হঠাৎ বড় ধরনের ধস নামতে পারে। তখন বরফের সঙ্গে পাথর ও মাটি দ্রুত নিচের দিকে ছুটে আসে।

এই বিশাল ধস যদি কোনো নদীর গতিপথে গিয়ে পড়ে, তাহলে অল্প সময়ের জন্য নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ আটকে যেতে পারে। নদীর ওপর তৈরি হয় এক ধরনের প্রাকৃতিক বাঁধ। এর পেছনে জমতে থাকে বিপুল পরিমাণ পানি।

এক পর্যায়ে পানির চাপ সেই বাধা সহ্য করতে না পারলে তা ভেঙে যায়। তখন জমে থাকা পানি একসঙ্গে প্রচণ্ড বেগে নিচের দিকে ছুটে যায়। পানির সঙ্গে মিশে যায় বরফ, পাথর, মাটি ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ। এভাবেই তৈরি হতে পারে ভয়ংকর হড়পা বান।

নেপালের এবারের দুর্যোগেও হিমবাহ ধস থেকে তৈরি ধস ও নদীর গতিপথে বাধা সৃষ্টি হয়ে আকস্মিক বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বলে বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

মাত্র আধ ঘণ্টায় নদীর জলস্তর বেড়েছিল ৯ মিটার

নেপালের পাহাড়ি নদীগুলোর আচমকা ফুলে ওঠাই এই বিপর্যয়ের ভয়াবহতা বোঝার অন্যতম প্রমাণ। কাঠমান্ডুভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ত্রিশূলী নদীর জলস্তর খুব অল্প সময়ের মধ্যে প্রায় ৯ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যায়।

এমন দ্রুত জলস্তর বৃদ্ধি সাধারণ নদীবন্যার মতো নয়। সাধারণত ভারী বৃষ্টির পর নদীতে পানি বাড়তে সময় লাগে। কিন্তু হিমবাহ ধস, বরফ-পাথরের বিশাল স্তূপ এবং আকস্মিক জলপ্রবাহ একসঙ্গে তৈরি হলে কয়েক মিনিট বা ঘণ্টার মধ্যেই নদী ভয়ংকর রূপ নিতে পারে।

এবার নেপালে ঠিক এমনই একটি আকস্মিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।

গত ১৪ মাসে একই এলাকায় একাধিক বন্যা

বিশেষজ্ঞ শাশ্বত সান্যালের বক্তব্য অনুযায়ী, গত ১৪ মাসে লেন্ডে খোলা নদীতে দুবার বন্যা হয়েছে। তার মতে, এবারের বন্যার সঙ্গে হিমবাহ ধসের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

নদীর গতিপথে বরফ ও পাথর জমে যাওয়ার পর পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে একদিকে জমতে থাকে পানি, অন্যদিকে বাড়তে থাকে চাপ। সেই চাপ যখন বাধা ভেঙে দেয়, তখন পানির স্রোত ভয়ংকর গতিতে নিচের দিকে নেমে আসে।

এই প্রক্রিয়ায় শুধু পানি নয়, সঙ্গে থাকে বিশাল আকারের পাথর, বরফ, কাদা ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ। ফলে সাধারণ বন্যার তুলনায় এর ধ্বংসক্ষমতা অনেক বেশি হয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গেও কি সম্পর্ক রয়েছে?

হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বরফ গলার হার বাড়ছে। ফলে পাহাড়ি এলাকায় হিমবাহ ও বরফের স্তরের স্থিতিশীলতাও প্রভাবিত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ের মতো উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে হিমবাহ ধস ও হিমবাহ-সম্পর্কিত আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট দুর্যোগের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনকে একক কারণ হিসেবে চিহ্নিত করতে আরও বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

এবারের নেপাল বিপর্যয় অবশ্যই সেই ঝুঁকির বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে।

নেপালে এখনো কাটেনি বিপদের আশঙ্কা

বন্যার মূল স্রোত অনেক জায়গা দিয়ে চলে গেলেও বিপদ পুরোপুরি শেষ হয়নি। নদীর গতিপথে কোথাও বরফ, পাথর বা মাটির বাধা তৈরি হয়ে থাকলে পরবর্তী সময়ে সেটি ভেঙে আবার আকস্মিক জলপ্রবাহ তৈরি হতে পারে।

নেপালের কর্তৃপক্ষ ভোতে কোশী ও ত্রিশূলী নদীর আশপাশের মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। উদ্ধারকারী দলগুলো নদীর তীর, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ও ক্ষতিগ্রস্ত জনপদে অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে।

সব মিলিয়ে নেপালের এবারের ভয়াবহ হড়পা বান দেখিয়ে দিল, পাহাড়ি অঞ্চলে কয়েক মিনিটের একটি প্রাকৃতিক পরিবর্তনও কীভাবে মুহূর্তে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। শুরুতে যে ঘটনাকে ভূমিকম্পের ফল বলে মনে করা হয়েছিল, ইউএসজিএসের পরবর্তী বিশ্লেষণে তার পেছনে উঠে এসেছে হিমবাহ ধস ও ধসপ্রবাহের কারণ। আর সেই বরফ, পাথর ও পানির সম্মিলিত শক্তিই মুহূর্তে তছনছ করে দিয়েছে নদীঘেঁষা জনপদ।

নেপালের এই বিপর্যয় তাই শুধু একটি ভয়াবহ বন্যার ঘটনা নয়; হিমালয়ের দ্রুত বদলে যাওয়া পরিবেশ এবং ভবিষ্যতের জলবায়ু ঝুঁকি নিয়েও এটি বড় একটি সতর্কবার্তা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আর্কাইভ