খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeপ্রকৃতি ও পরিবেশজলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব? গরমে হারাচ্ছে নীল প্রজাপতির ঝলমলে আভা

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব? গরমে হারাচ্ছে নীল প্রজাপতির ঝলমলে আভা

প্রজাপতির ডানা দেখতে মসৃণ মনে হলেও আসলে তা অসংখ্য ক্ষুদ্র আঁশে ঢাকা। এই আঁশগুলো খালি চোখে আলাদা করে দেখা যায় না। অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে দেখলে বোঝা যায়, প্রতিটি আঁশের ভেতর রয়েছে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সুনির্দিষ্ট কাঠামো।

নীল প্রজাপতির ঝলমলে ডানা দেখলে চোখ আটকে যায়। সূর্যের আলোয় তাদের ডানা কখনও উজ্জ্বল নীল, কখনও আবার ধাতব আভায় চকচক করতে দেখা যায়। কিন্তু প্রকৃতির এই অপূর্ব নীল রঙের পেছনে যে রহস্য লুকিয়ে আছে, তা জানলে অবাক হতে পারেন।

কারণ, নীল প্রজাপতির ডানার এই বিখ্যাত নীল আসলে কোনো নীল রঞ্জক বা পিগমেন্টের তৈরি নয়। বরং ডানার অতি সূক্ষ্ম আণুবীক্ষণিক কাঠামোর সঙ্গে আলোর বিশেষ মিথস্ক্রিয়ার ফলেই চোখে ধরা দেয় এই নীল আভা।

আর এখন সেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিয়েই দেখা দিয়েছে নতুন উদ্বেগ। গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে, তাপমাত্রা বাড়লে নীল প্রজাপতির ডানার সেই সূক্ষ্ম কাঠামো বদলে যেতে পারে। ফলে কমে যেতে পারে ডানার উজ্জ্বল নীল ঝলক।

সাধারণভাবে কোনো বস্তুর রং দেখার ক্ষেত্রে আমরা রঞ্জকের কথা ভাবি। যেমন সবুজ পাতায় সবুজ রঞ্জক বা বিভিন্ন প্রাণীর শরীরে থাকা পিগমেন্ট তাদের নির্দিষ্ট রং তৈরি করে।

কিন্তু নীল প্রজাপতির ক্ষেত্রে বিষয়টি একটু আলাদা।

তাদের ডানার নীল আভা মূলত তৈরি হয় কাঠামোগত বর্ণ বা Structural Coloration-এর মাধ্যমে। অর্থাৎ এখানে রঙের জন্য কোনো নির্দিষ্ট নীল রঞ্জক প্রয়োজন হয় না। ডানার ওপর থাকা অসংখ্য ক্ষুদ্র আঁশের ভেতরের বিশেষ কাঠামো আলোকে এমনভাবে প্রতিফলিত করে যে মানুষের চোখে তা উজ্জ্বল নীল হিসেবে ধরা পড়ে।

সহজ করে বললে, প্রজাপতির ডানায় যেন কোনো নীল রং মাখানো নেই। বরং ডানার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র গঠনটাই আলোকে এমনভাবে সাজিয়ে দেয়, যাতে আমরা নীল দেখতে পাই।

প্রজাপতির ডানা দেখতে মসৃণ মনে হলেও আসলে তা অসংখ্য ক্ষুদ্র আঁশে ঢাকা। এই আঁশগুলো খালি চোখে আলাদা করে দেখা যায় না। অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে দেখলে বোঝা যায়, প্রতিটি আঁশের ভেতর রয়েছে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সুনির্দিষ্ট কাঠামো।

আরও পড়ুন :  নবজাতক পাচারের চাঞ্চল্যকর চক্র দিল্লির  ‘বেবি বাজার’

এই কাঠামোর আকার, বিন্যাস এবং একটির সঙ্গে অন্যটির দূরত্ব আলোর আচরণকে প্রভাবিত করে।

সূর্যের আলো যখন ডানার ওপর পড়ে, তখন সেই আলো বিভিন্নভাবে প্রতিফলিত হয়। বিশেষ কিছু তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো তুলনামূলকভাবে বেশি চোখে ফিরে আসে। এর ফলেই তৈরি হয় নীলের সেই তীব্র ঝলক।

এ কারণেই নীল প্রজাপতির ডানা অনেক সময় সাধারণ নীল রঙের মতো দেখায় না। বরং সেখানে দেখা যায় উজ্জ্বল, চকচকে এবং প্রায় ধাতব ধরনের নীল আভা।

এবার গবেষকদের নজরে এসেছে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তাপমাত্রা এই সূক্ষ্ম কাঠামোর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে কি না, সেটিই ছিল গবেষণার অন্যতম প্রশ্ন।

পানামার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচালিত গবেষণায় নীল প্রজাপতিদের বিভিন্ন তাপমাত্রার পরিবেশে বড় করা হয়। এরপর বিভিন্ন পরিবেশে বেড়ে ওঠা প্রজাপতিদের ডানার উজ্জ্বলতা তুলনা করা হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, তুলনামূলক বেশি উষ্ণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা প্রজাপতিদের ডানা আগের মতো উজ্জ্বল ছিল না। তাদের নীল আভা অপেক্ষাকৃত ম্লান এবং কম ঝলমলে দেখা যায়।

অর্থাৎ শুধু আবহাওয়া গরম হয়ে যাওয়ার কারণে বাইরে থেকে রং বদলে যাচ্ছে—বিষয়টি এমন নয়। বরং প্রজাপতির ডানার যে ক্ষুদ্র কাঠামো নীল আভা তৈরি করে, তাপমাত্রার পরিবর্তন সেই কাঠামোকেই প্রভাবিত করতে পারে।

এখানেই রয়েছে এই গবেষণার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক।

আরও পড়ুন :  অর্থনৈতিক অঞ্চলকে আধুনিক শিল্পাঞ্চলে রূপান্তরের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

ডানার ভেতরের কাঠামো এতটাই সূক্ষ্ম যে সেখানে সামান্য পরিবর্তনও আলোর প্রতিফলনকে বদলে দিতে পারে। বিশেষ করে কাঠামোর বিভিন্ন অংশের মধ্যকার দূরত্ব পরিবর্তিত হলে আলো আগের মতো প্রতিফলিত নাও হতে পারে।

গবেষকদের ধারণা, অতিরিক্ত তাপ ডানার আঁশের ভেতরের এই অতি সূক্ষ্ম বিন্যাসে পরিবর্তন আনতে পারে। ফলে নীল আলো প্রতিফলনের ধরনও বদলে যায়।

এর ফলেই চোখে নীল রঙের তীব্রতা কম মনে হতে পারে।

অর্থাৎ প্রজাপতির ডানার নীল আভা অনেকটা একটি প্রাকৃতিক অপটিক্যাল প্রযুক্তির মতো কাজ করে। সেই প্রযুক্তির ক্ষুদ্র কাঠামোয় পরিবর্তন এলেই পুরো দৃশ্যমান প্রভাব বদলে যেতে পারে।

নীল রঙের উজ্জ্বলতা কমে যাওয়ার বিষয়টি শুধু মানুষের চোখে ধরা পড়ে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, পাখির মতো শিকারি প্রাণী এবং অন্যান্য প্রজাপতিও এই ধরনের দৃশ্যমান পার্থক্য শনাক্ত করতে পারে।

এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রজাপতিদের জীবনে ডানার রং শুধুই সৌন্দর্যের বিষয় নয়। উজ্জ্বল রং তাদের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ, সঙ্গী নির্বাচন এবং অন্য প্রজাপতিকে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।

একই সঙ্গে এই রং শিকারির সঙ্গে তাদের সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে।

ফলে ডানার নীল আভা যদি পরিবেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ক্রমশ কমে যায়, তাহলে তার প্রভাব শুধু দেখতে কেমন লাগছে, সেই জায়গায় সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে।

অনেক প্রজাপতির ক্ষেত্রে ডানার রং ও নকশা সঙ্গী আকর্ষণের গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে কাজ করে। কোনো প্রজাতির ক্ষেত্রে যদি উজ্জ্বল নীল আভা সঙ্গী নির্বাচনে ভূমিকা রাখে, তাহলে সেই আভা দুর্বল হয়ে যাওয়ার বিষয়টি ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

আরও পড়ুন :  বিশ্বকাপে জাদুটোনা! সমর্থকদের অদ্ভুত বিশ্বাসে কি সত্যিই বদলায় ম্যাচের ফল?

অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে তাপমাত্রা বাড়লেই নীল প্রজাপতি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। প্রাকৃতিক পরিবেশে কোনো প্রাণীর ওপর জলবায়ুর প্রভাব নির্ভর করে অনেকগুলো বিষয়ের ওপর।

তবে এই গবেষণা দেখিয়ে দিচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কখনও কখনও অত্যন্ত সূক্ষ্ম পর্যায়েও পৌঁছাতে পারে।

বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন প্রাণীর আচরণ, প্রজনন, চলাচল এবং আবাসস্থলে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। নীল প্রজাপতির ক্ষেত্রে ডানার কাঠামোগত রঙের ওপর তাপমাত্রার প্রভাব সেই আলোচনায় নতুন একটি মাত্রা যোগ করছে।

ভাবুন, একটি প্রজাপতির শরীরে কোনো নীল রঞ্জক নেই। তার বদলে প্রকৃতি ডানার ক্ষুদ্র কাঠামো ব্যবহার করে আলোকে নিয়ন্ত্রণ করছে। কিন্তু পরিবেশ একটু বেশি উষ্ণ হলেই সেই কাঠামো বদলে যাচ্ছে এবং নীল আভাও দুর্বল হয়ে পড়ছে।

প্রকৃতির এই সূক্ষ্ম ভারসাম্যই বিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবাচ্ছে।

এই মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে পৃথিবীর নীল প্রজাপতিরা ভবিষ্যতে তাদের নীল আভা হারিয়ে ফেলবে। এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রাকৃতিক পরিবেশে দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন প্রজাতির ওপর তাপমাত্রার প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।

তবে গবেষণার ফলাফল একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে—প্রজাপতির ডানার সৌন্দর্য শুধু বাহ্যিক নয়। এর পেছনে রয়েছে জটিল পদার্থবিজ্ঞান এবং অসাধারণ প্রাকৃতিক নকশা।

নীল প্রজাপতির ডানায় আসলে নীল রং না থাকলেও প্রকৃতি সেখানে এমন এক ক্ষুদ্র জগত তৈরি করেছে, যা আলোকে নিয়ন্ত্রণ করে আমাদের চোখে নীলের বিস্ময় তুলে ধরে।

আর পৃথিবীর তাপমাত্রা যত বাড়ছে, সেই অদৃশ্য আণুবীক্ষণিক জগতও ততটাই পরিবর্তনের মুখে পড়তে পারে। তাই ভবিষ্যতে নীল প্রজাপতির ঝলমলে ডানা কতটা উজ্জ্বল থাকবে, সেটিও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বোঝার ক্ষেত্রে একটি আকর্ষণীয় বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন হয়ে উঠছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আর্কাইভ