খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeস্পোটস ওয়ার্ল্ডফিফা বিশ্বকাপ স্পেশালবিশ্বকাপে জাদুটোনা! সমর্থকদের অদ্ভুত বিশ্বাসে কি সত্যিই বদলায় ম্যাচের ফল?

বিশ্বকাপে জাদুটোনা! সমর্থকদের অদ্ভুত বিশ্বাসে কি সত্যিই বদলায় ম্যাচের ফল?

“লা ব্রুজিনেতা” নামটা এসেছে দুইটি শব্দ থেকে—‘ব্রুজা’ মানে ডাইনি, আর ‘স্কালোনেতা’ হলো কোচ লিওনেল স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনা দলের জনপ্রিয় নাম। এই দুই মিলে তৈরি হয়েছে এক নতুন পরিচয়।

বিশ্বকাপ ফুটবল শুধু একটা খেলা না—এটা আবেগ, বিশ্বাস আর অদ্ভুত সব রীতির এক মিশ্রণ। মাঠে খেলোয়াড়রা লড়াই করে ঠিকই, কিন্তু গ্যালারির বাইরে সমর্থকেরাও যেন নিজেদের মতো করে যুদ্ধ চালিয়ে যায়। কেউ প্রার্থনা করে, কেউ তাবিজ পরে, আবার কেউ বিশ্বাস করে জাদুটোনার শক্তিতে। শুনতে অবাক লাগলেও, এই বিশ্বাসগুলো অনেক মানুষের কাছে একদম বাস্তব।

সমর্থকদের বিশ্বাস: জাদু কি সত্যিই কাজ করে?

আর্জেন্টিনার সমর্থক ডালিয়া ওয়াকার এমনই একজন, যিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন—তার দেশের বিশ্বকাপ জয়ে অতিপ্রাকৃত শক্তির ভূমিকা ছিল। তার মতে, শুধুমাত্র খেলোয়াড়দের দক্ষতা নয়, বরং জাদুবিদ্যার সাহায্যও দলকে জয়ের দিকে নিয়ে গেছে।

ডালিয়া ছিলেন একদল নারীর অংশ, যারা নিজেদের “লা ব্রুজিনেতা” নামে পরিচয় দিতেন। তারা নিজেদের জাদুকর বা ডাইনি ভাবতেন এবং পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে আর্জেন্টিনা দলের জন্য বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান করতেন।

 “লা ব্রুজিনেতা”: আধুনিক জাদুবিদ্যার এক নতুন রূপ

“লা ব্রুজিনেতা” নামটা এসেছে দুইটি শব্দ থেকে—‘ব্রুজা’ মানে ডাইনি, আর ‘স্কালোনেতা’ হলো কোচ লিওনেল স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনা দলের জনপ্রিয় নাম। এই দুই মিলে তৈরি হয়েছে এক নতুন পরিচয়।

এই দলটি আধুনিক জাদুবিদ্যার নানা উপায় ব্যবহার করত। তারা মোমবাতি জ্বালাত, প্রার্থনা করত, তাবিজ ব্যবহার করত—সবই দলের ভালো পারফরম্যান্সের আশায়। এমনকি তারা হোয়াটসঅ্যাপ ও সোশ্যাল মিডিয়ায় গ্রুপ তৈরি করে আলোচনা করত, কোন খেলোয়াড় বা কোন দিকটাতে বেশি ‘শক্তি’ দেওয়া দরকার।

ইতিবাচক শক্তি বনাম নেতিবাচক আচার

এই দলের মধ্যে কিছু আচার ছিল বেশ বিতর্কিত। যেমন, প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের শক্তি ‘বন্ধ করে দেওয়া’। তবে ডালিয়া এসবের বিরুদ্ধে ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, ভালো শক্তি পাঠানোই আসল কাজ।

আরও পড়ুন :  এমবাপ্পের গোলঝড়! বৃষ্টির বাধা পেরিয়ে ফ্রান্সের ৩-০ জয় : মেসির রেকর্ডের পিছু ধাওয়া

তাই তিনি মোমবাতি জ্বালানো, প্রার্থনা করা—এই ধরনের ইতিবাচক রীতিগুলোতেই বেশি গুরুত্ব দিতেন। তার মতে, নেতিবাচক কিছু করলে সেটা নিজের দলের উপরও খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্বকাপ জয়ের পর বিশ্বাস আরও শক্ত

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা জেতার পর “লা ব্রুজিনেতা” দল মনে করে—তাদের প্রচেষ্টাও এই জয়ের অংশ। ডালিয়ার ভাষায়, “এটা ছিল ডাইনিদের বিশ্বকাপ।”

এখনও তিনি সেই একই আচার চালিয়ে যাচ্ছেন। তার বেদিতে নীল-সাদা মোমবাতি জ্বলছে, ঠিক আর্জেন্টিনার জার্সির রঙের মতো। কারণ তার বিশ্বাস—একবার কিছু কাজ করলে, সেটাই বারবার করতে হয়।

শুধু আর্জেন্টিনা নয়, সারা বিশ্বেই এমন বিশ্বাস

এমনটা শুধু আর্জেন্টিনায় না। পেরুতেও একদল শামান ২০২২ বিশ্বকাপের আগে আচার পালন করেছিল, যাতে তাদের দল কোয়ালিফাই করতে পারে। যদিও শেষ পর্যন্ত তারা অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে যায়।

আফ্রিকার অনেক দেশেও ফুটবলের সঙ্গে আধ্যাত্মিকতা গভীরভাবে জড়িত। সেখানে ম্যাচের আগে বা চলাকালীন বিভিন্ন রীতিনীতি পালন করা খুবই সাধারণ ব্যাপার।

তাবিজ, নাচ আর রহস্যময় আচার

অনেক সমর্থক স্টেডিয়ামে তাবিজ পরে আসে, বিশেষ গয়না ব্যবহার করে। কেউ কেউ নাচে, গান গায়—এগুলো তাদের কাছে শুধু আনন্দ নয়, বরং একধরনের আচার।

কিছু ক্ষেত্রে এমনও দেখা গেছে, সমর্থকেরা আগুন ব্যবহার করছে বা অদ্ভুত কিছু কাজ করছে, যেগুলো তাদের মতে দলের জন্য শুভ।

আরও পড়ুন :  মেসির গোপন কৌশল ফাঁস! কেন আগের মতো দৌড়ান না আর্জেন্টাইন মহাতারকা?

কালো জাদুর অভিযোগ ও বিতর্ক

বিশ্ব ফুটবলে মাঝে মাঝে কালো জাদুর অভিযোগও উঠে আসে। যেমন নাইজেরিয়ার কোচ একবার অভিযোগ করেছিলেন, তাদের প্রতিপক্ষ দল ভুডু বা কালো জাদু ব্যবহার করেছে।

তবে এই ধরনের অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন। অনেকেই এসব বিষয় নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতে চান না, কারণ এতে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে।

ইউরোপ বনাম অন্যান্য সংস্কৃতি

ফুটবল অনেকটাই ইউরোপকেন্দ্রিক হওয়ায়, ইউরোপের বাইরে এই ধরনের বিশ্বাসগুলোকে অনেক সময় সন্দেহের চোখে দেখা হয়। কিন্তু যারা এসব মানে, তাদের কাছে এটা জীবনের স্বাভাবিক অংশ।

আফ্রিকান সংস্কৃতিতে এই আচারগুলো লজ্জার কিছু না। বরং এটা তাদের দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ।

প্রার্থনা: সবচেয়ে সাধারণ বিশ্বাস

সব আচার বা জাদুটোনার বাইরে, সবচেয়ে সাধারণ বিষয় হলো প্রার্থনা। অনেক দল ও সমর্থক বিশ্বাস করে—শেষ পর্যন্ত ঈশ্বরই সবকিছু নির্ধারণ করেন।

আলজেরিয়ার সমর্থকেরা প্রায়ই আল্লাহর কাছে দলের সুরক্ষা কামনা করে। ঘানা ও নাইজেরিয়ায় ম্যাচের আগে গসপেল গান বাজানো হয়, যা খেলোয়াড়দের মনোবল বাড়ায়।

ঘানার উদাহরণ: ধর্ম ও ফুটবলের মেলবন্ধন

ঘানায় তো পুরো জাতীয় পর্যায়ে প্রার্থনার আয়োজন করা হয়। ক্রীড়ামন্ত্রী নিজেই মানুষকে আহ্বান জানান, যাতে তারা জাতীয় দলের জন্য প্রার্থনা করে।

খ্রিস্টান ও মুসলিম—দুই ধর্মের মানুষই এতে অংশ নেয়। গির্জা ও মসজিদে বিশেষ প্রার্থনা হয়, যেখানে দলের জন্য আশীর্বাদ চাওয়া হয়।

একজন সাংবাদিক বলেছিলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, ঈশ্বরই সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু।” তাদের মতে, কঠোর পরিশ্রমের পাশাপাশি ঈশ্বরের আশীর্বাদও খুব দরকার।

আরও পড়ুন :  যৌন হয়রানি ঠেকাতে আসছে নতুন আইন ২০২৬

ব্রাজিল: বিশ্বাস ও ফুটবলের এক অনন্য গল্প

ব্রাজিলেও ফুটবলের সঙ্গে ধর্মীয় বিশ্বাস গভীরভাবে জড়িত। ২০০২ বিশ্বকাপে জয়ের সময়, একজন খেলোয়াড় নিজের জার্সির নিচে “আমি যিশুর” লেখা টি-শার্ট দেখিয়েছিলেন।

এটা ছিল শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাস নয়, বরং পুরো বিশ্বের জন্য একটি বার্তা।

এমনকি সাম্প্রতিক সময়েও দেখা গেছে, দলের বিমান উড্ডয়নের আগে ধর্মীয় আচার করা হয়েছে। এই ধরনের প্রতীকী কাজগুলো সমর্থকদের মধ্যে এক ধরনের আশা তৈরি করে।

বিশ্বাসই কি আসল শক্তি?

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা থেকেই যায়—এই জাদুটোনা, তাবিজ বা প্রার্থনা কি সত্যিই কাজ করে?

বৈজ্ঞানিকভাবে হয়তো এর কোনো প্রমাণ নেই। কিন্তু একজন সমর্থকের জন্য এটা মানসিক শক্তির মতো। যেমন ধরো, পরীক্ষার আগে কেউ যদি নিজের লাকি কলম ব্যবহার করে, তখন সে একটু বেশি আত্মবিশ্বাসী থাকে।

ঠিক তেমনই, এই আচারগুলো সমর্থকদের মনে বিশ্বাস আর আশা জাগায়। আর সেই বিশ্বাসই হয়তো তাদের কাছে সবচেয়ে বড় শক্তি।

শেষ কথা

ফুটবল শুধু গোল আর ট্রফির খেলা নয়। এটা মানুষের বিশ্বাস, সংস্কৃতি আর আবেগের প্রতিচ্ছবি। কেউ প্রার্থনা করে, কেউ তাবিজ পরে, কেউ আবার জাদুর আশায় থাকে—সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয় এক অদ্ভুত কিন্তু সুন্দর জগৎ।

তুমি বিশ্বাস করো বা না করো, একটা জিনিস ঠিক—এই বিশ্বাসগুলোই ফুটবলকে আরও রঙিন, আরও জীবন্ত করে তোলে।