আন্তর্জাতিক ডেক্স: নেপাল ও তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ ভূমিধসের পর দুই নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে নতুন একটি বিশাল হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। বুধবারের এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর হিমালয়ঘেরা এলাকায় ফের বড় ধরনের হড়পা বানের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় আগামী ৭২ ঘণ্টার জন্য সতর্কতা জারি করেছে চীন।
চীনের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, ছোছেন খোলা ও পুরুপে সাংপো নদীর মিলিত প্রবাহ ভূমিধসের কারণে আটকে গেছে। ফলে নদীর পানি জমে তৈরি হয়েছে অস্থায়ী হ্রদ। এই জলাধারে পানির পরিমাণ দ্রুত বাড়তে থাকায় প্রাকৃতিকভাবে তৈরি পাথর ও মাটির বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ছোছেন খোলা ও পুরুপে সাংপো নদীর উৎপত্তি তিব্বত অঞ্চলে। নেপালে প্রবেশের আগে নদী দুটি একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়। পরে তাদের সম্মিলিত প্রবাহ ভোটেকোশী নামে নেপালে প্রবেশ করে। ভোটেকোশী নদী ত্রিশূলী নদীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপনদী।
ভূমিধসের কারণে নদীর গতিপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপুল পরিমাণ পানি এক জায়গায় আটকে পড়েছে। পাহাড়ি এলাকায় এ ধরনের প্রাকৃতিক বাঁধ সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী হয় না। পানির চাপ বাড়তে থাকলে সেটি হঠাৎ ভেঙে যেতে পারে। তখন অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল জলরাশি নিচের দিকে ধেয়ে গিয়ে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি করতে পারে।
চীনের পক্ষ থেকে দেওয়া সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, আগামী তিন দিনে নতুন তৈরি হওয়া হ্রদটিতে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি জমতে পারে। বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত সেখানে প্রায় ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমার তথ্য জানিয়েছে চীনের জলসম্পদ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
পাহাড়ি ঢালে আটকে থাকা পানির পরিমাণ যত বাড়বে, ততই প্রাকৃতিক বাঁধের ওপর চাপ বাড়বে। শেষ পর্যন্ত সেই বাঁধ ভেঙে গেলে ভয়াবহ গতিতে পানি নিচের দিকে নেমে আসতে পারে। এতে সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোর পাশাপাশি নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকায় আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ভূবিজ্ঞানীদের একটি অংশ মনে করছেন, পরিস্থিতি গুরুতর হলে এর প্রভাব শুধু নেপালেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। পাহাড়ি নদীর প্রবল স্রোত নিচের দিকে নেমে এলে নেপালের তরাই অঞ্চলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।
এরপর নদীর প্রবাহ ও পানির গতিপথের ওপর নির্ভর করে ভারতের বিহার ও পূর্ব উত্তরপ্রদেশের কিছু এলাকাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। তবে ঠিক কোন এলাকায় কতটা প্রভাব পড়বে, তা নির্ভর করবে হ্রদের পানি কত দ্রুত বাড়ছে এবং প্রাকৃতিক বাঁধটি কখন ও কীভাবে ভেঙে পড়ছে তার ওপর।
নেপালে বুধবারের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর থেকেই হড়পা বান নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ভূবিজ্ঞানীদের একাংশ জানিয়েছেন, তুষারধস ও পাহাড়ি ধসের কারণে লেহন্দে নদীর প্রবাহ একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরে জমে থাকা পানির চাপে সেই প্রাকৃতিক বাধা ভেঙে গেলে হঠাৎ পানির স্রোত নেমে আসে।
এ ধরনের ঘটনা পাহাড়ি এলাকায় অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ স্বাভাবিক নদীর স্রোতের তুলনায় হঠাৎ বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসা পানির গতি অনেক বেশি হতে পারে। সঙ্গে পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ নেমে এলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রাও বেড়ে যায়।
কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞানের অধ্যাপক রিজন ভক্ত কায়স্থের বক্তব্য অনুযায়ী, লেহন্দে নদীর প্রবাহ বন্ধ হওয়ার পর জমে থাকা পানি পরে পাথরের বাধা ভেঙে ভোটেকোশী নদীর দিকে নেমে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে। একই সময়ে হিমবাহের বরফগলা পানিতে তৈরি কোনো ছোট হ্রদ ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হয়নি।
ভূমিধসের কারণে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে যে নতুন হ্রদ তৈরি হয়েছে, সেটিও এখন পরিস্থিতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ হ্রদটির পানির স্তর বাড়তে থাকলে স্বাভাবিকভাবেই আশপাশের পাহাড়ি কাঠামোর ওপর চাপ বাড়বে।
বুধবারের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে নেপালে ব্যাপক প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। কাঠমান্ডুর পক্ষ থেকে ৩৩২ জনের মৃত্যুর তথ্য জানানো হয়েছে। প্রায় ৭০০ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নিখোঁজদের মধ্যে প্রায় ৩০০ জন ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে তিব্বতেও দুই শতাধিক মানুষের মৃত্যুর খবর জানিয়েছে চীন। সেখানে প্রায় ২০০ ভারতীয় তীর্থযাত্রী ও পর্যটক আটকে পড়েছেন। তিব্বত অংশে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যাও ৫৫৮ জনের মতো বলে জানানো হয়েছে।
নতুন হ্রদে দ্রুত পানি জমার কারণে আগামী ৭২ ঘণ্টাকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রাকৃতিক বাঁধ অক্ষত থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ থাকবে। কিন্তু পানির চাপে বাঁধ ভেঙে গেলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল জলরাশি নিচের দিকে নেমে যেতে পারে।
এ কারণে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের পাশাপাশি নদীর নিম্নাঞ্চলেও নজরদারি বাড়ানো জরুরি। স্থানীয় প্রশাসনের সতর্কতা, নদীর পানির স্তর পর্যবেক্ষণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি পরিস্থিতি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তথ সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা

