আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : নেপালে ভয়াবহ হড়পা বান ও ভূমিধসের ক্ষত এখনও শুকায়নি। এর মধ্যেই নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে। সেখানে ভূমিধস ও নদীর গতিপথ আটকে একটি বিশাল জলাধার তৈরি হয়েছে। চিনা কর্তৃপক্ষের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, এই বাধা হ্রদ আগামী তিন দিনের মধ্যে ভেঙে গেলে ফের বিপুল জলরাশি নেমে আসতে পারে। ফলে নতুন করে ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে নেপালে।
ইতিমধ্যেই নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকায় ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণহানি ও নিখোঁজের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। বৃহস্পতিবারের সর্বশেষ বিভিন্ন প্রতিবেদনে মৃতের সংখ্যা ৩৫৯-এ পৌঁছানোর কথা জানানো হয়েছে। এক হাজারেরও বেশি মানুষ এখনও নিখোঁজ বা নিখোঁজের তালিকায় রয়েছেন। একই সময়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নেপালে এখনও ২৮৮ জন ভারতীয় নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ফের বিপদের সংকেত
নতুন করে যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তার কেন্দ্র নেপাল-চিন সীমান্তের একটি প্রাকৃতিক জলাধার। ছোচেন খোলা ও পুরেপে সাংপো নদীর মিলনস্থলের কাছে ভূমিধসের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে পানির স্রোত আটকে গিয়ে তৈরি হয়েছে একটি ‘ব্যারিয়ার লেক’ বা প্রাকৃতিক বাধায় তৈরি হ্রদ।
চিনের জলসম্পদ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ওই জলাধারে প্রায় ২০ লক্ষ ঘনমিটার পানি জমেছিল। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে আগামী তিন দিনে পানির পরিমাণ আরও কয়েক মিলিয়ন ঘনমিটার বাড়তে পারে। পানির চাপ বেড়ে গেলে প্রাকৃতিক বাধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই ধরনের জলাধার ভেঙে গেলে তাকে সাধারণ বন্যার সঙ্গে তুলনা করা যায় না। কয়েক মিনিটের মধ্যে বিপুল পানি, কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ পাহাড়ি নদীর পথে নেমে এসে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাতে পারে।
হ্রদ ভেঙে গেলে কী হতে পারে?
পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ফলে নদীর পথ আটকে গেলে নদীর পানি বাধার পেছনে জমতে থাকে। সময়ের সঙ্গে সেই জলাধারের আয়তন বাড়ে। কিন্তু মাটি, পাথর ও বরফের তৈরি প্রাকৃতিক বাঁধ সাধারণত কংক্রিটের বাঁধের মতো শক্তিশালী নয়।
পানির চাপ একটি নির্দিষ্ট সীমা ছাড়িয়ে গেলে বাঁধে ফাটল তৈরি হতে পারে। এরপর সেই ফাটল দ্রুত বড় হয়ে পুরো বাধ ভেঙে পড়তে পারে। তখন আটকে থাকা পানি একসঙ্গে নিচের দিকে ছুটে আসে। এর সঙ্গে পাহাড়ের মাটি, বড় পাথর, গাছপালা এবং অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ মিশে গেলে জলস্রোতের গতি ও ধ্বংসক্ষমতা কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
নেপালের বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই নতুন জলাধারটি নিয়ে উদ্বেগ অত্যন্ত বেশি। বিশেষ করে আগের হড়পা বানের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার নদীগুলোর ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
ভোটেকোশী, ত্রিশূলী ও নারায়ণী নদী নিয়ে সতর্কতা
নেপাল সরকারও সম্ভাব্য বিপদের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। ভোটেকোশী, ত্রিশূলী ও নারায়ণী নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের সতর্ক করা হয়েছে এবং নদীর কাছাকাছি না থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কারণ পাহাড়ি অঞ্চলের আকস্মিক জলপ্রবাহ দ্রুত নিচু এলাকায় পৌঁছে যেতে পারে। নদীর তীরবর্তী বসতি, রাস্তা, সেতু, বাজার ও বিদ্যুৎ প্রকল্প সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
সাম্প্রতিক বন্যায় নেপালের বহু সেতু ও সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় উদ্ধারকাজও কঠিন হয়ে উঠেছে। ফলে নতুন করে জলস্রোত নামলে উদ্ধারকারী দলগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
‘মৃত্যুপুরী’ নেপালে বাড়ছে আতঙ্ক
মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রকৃতির রুদ্ররূপ কীভাবে একটি জনপদকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে, নেপালের সাম্প্রতিক ঘটনা তার ভয়াবহ উদাহরণ।
হিমালয় থেকে নেমে আসা জল ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত বহু বাড়িঘর, রাস্তা ও সেতু ভাসিয়ে দিয়েছে। কোথাও নদীর চরিত্র বদলে গেছে, কোথাও আবার কাদা ও পাথরের নিচে চাপা পড়েছে বসতি। উদ্ধারকারীরা এখনও নিখোঁজদের সন্ধান করছেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই দুর্যোগে নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে শত শত মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং এক হাজারের বেশি মানুষ এখনও নিখোঁজ। ধ্বংসস্তূপ, বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা ও খারাপ আবহাওয়া উদ্ধারকাজকে কঠিন করে তুলছে।
নিখোঁজ ২৮৮ ভারতীয়, আতঙ্কে পরিবারগুলো
নেপালের এই বিপর্যয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের মধ্যে থাকা বিদেশি নাগরিকদের একটি বড় অংশ ভারতীয়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নেপালে এখনও ২৮৮ জন ভারতীয় নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তাঁদের মধ্যে পর্যটক, তীর্থযাত্রী এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত মানুষও রয়েছেন।
রয়টার্স জানিয়েছে, নিখোঁজদের খোঁজে ভারতের পরিবারগুলো সরকারি হেল্পলাইন, ট্রাভেল এজেন্সি ও বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য জানার চেষ্টা করছে। নেপালের বিভিন্ন এলাকায় আটকে পড়া ভারতীয়দের উদ্ধার ও তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা চলছে।
এদিকে তিব্বতের দিকেও প্রায় ২০০ ভারতীয় আটকে রয়েছেন বলে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য উঠে এসেছে। তাঁদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিখোঁজের সংখ্যাগুলো এখনও পরিবর্তিত হতে পারে। উদ্ধার অভিযান যত এগোবে, ততই প্রকৃত পরিস্থিতি পরিষ্কার হবে।
চিনের সঙ্গে ‘বন্ধুত্বের’ খেসারত? উঠছে প্রশ্ন
নেপালের বর্তমান বিপর্যয়কে ঘিরে চিন ও নেপালের মধ্যে রাজনৈতিক বিতর্কের কথাও সামনে এসেছে। বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে কাঠমান্ডুর অভিযোগ নিয়ে চিন আপত্তি জানিয়েছে এবং অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে। চিনের বক্তব্য, এই ধরনের সময়ে পারস্পরিক দোষারোপের বদলে উদ্ধার ও সহযোগিতার দিকে নজর দেওয়া উচিত।
তবে বিপর্যয়ের সময়ে এই রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন প্রশ্নও তৈরি করেছে। নেপাল-চিন সীমান্তের অবকাঠামো, নদীর গতিপথ, জলাধার এবং হিমবাহ অঞ্চলের ওপর নজরদারি কতটা কার্যকর ছিল—তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
‘চিনের সঙ্গে বন্ধুত্বের খেসারত দিচ্ছে কাঠমান্ডু’—এমন মন্তব্য ইতিমধ্যেই বিভিন্ন মহলে উঠছে। তবে এই দাবিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার আগে বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি তথ্য খতিয়ে দেখা জরুরি।
হিমালয়ের হিমবাহ কেন এত বড় ঝুঁকি?
হিমালয় অঞ্চলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং হিমবাহের পরিবর্তন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে আসছেন। হিমবাহ দ্রুত গললে বা বরফের বিশাল অংশ হঠাৎ ভেঙে পড়লে নদীতে অস্বাভাবিক পরিমাণ পানি ও পাথর নেমে আসতে পারে।
এই ধরনের ঘটনায় প্রথমে নদীর পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। পরে সেই জলস্রোত পাহাড়ি উপত্যকা দিয়ে ছুটে গিয়ে নিচের দিকে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে পারে।
সাম্প্রতিক নেপাল-তিব্বত বিপর্যয়েও মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জানিয়েছে, প্রথমে যে ভূকম্পনকে ভূমিকম্প বলে মনে করা হয়েছিল, পরে সেটিকে হিমবাহ ধস ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ের বরফ ও হিমবাহ ব্যবস্থা আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠলে এ ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি ভবিষ্যতে বাড়তে পারে।
আগামী ৭২ ঘণ্টা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
নতুন তৈরি হওয়া জলাধারে পানি কত দ্রুত জমছে, প্রাকৃতিক বাঁধ কতটা স্থিতিশীল এবং নদীর প্রবাহ কোন দিকে যাচ্ছে—এই তিনটি বিষয় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
চিনের সতর্কবার্তার পর নেপালও নদীতীরবর্তী মানুষকে নিরাপদ দূরত্বে থাকার পরামর্শ দিয়েছে। ফলে আগামী ৭২ ঘণ্টা শুধু নেপালের জন্য নয়, সীমান্তবর্তী ভারতীয় এলাকাগুলোর জন্যও নজর রাখার সময়।
তবে এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না যে জলাধারটি ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই ভেঙে পড়বে। এটি একটি সম্ভাব্য ঝুঁকি, নিশ্চিত ঘটনা নয়। তাই আতঙ্ক ছড়ানোর বদলে স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলা, নদীর তীর থেকে দূরে থাকা এবং সরকারি সতর্কবার্তার দিকে নজর রাখাই সবচেয়ে জরুরি।
নেপালের ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে নতুন এই জলাধারের আশঙ্কা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। একদিকে চলছে নিখোঁজ মানুষদের সন্ধান, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্ধার ও পুনর্বাসনের চেষ্টা। তার মধ্যেই নতুন করে যদি হড়পা বান নামে, তাহলে ইতিমধ্যেই বিপর্যস্ত দেশটির ওপর চাপ আরও কয়েক গুণ বাড়তে পারে।
এখন তাই গোটা নজর নেপাল-তিব্বত সীমান্তের সেই প্রাকৃতিক জলাধারের দিকে। আগামী কয়েক ঘণ্টায় তার পানি ও বাঁধের পরিস্থিতি কীভাবে বদলায়, তার ওপরই নির্ভর করছে নতুন করে কোনও বড় বিপর্যয় তৈরি হবে কি না।

