খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeবিশ্ব সংবাদনেপালে হড়পা বান: মৃত ৩৫০ ছাড়িয়েছে, ধ্বংসস্তূপে চলছে প্রাণের খোঁজ

নেপালে হড়পা বান: মৃত ৩৫০ ছাড়িয়েছে, ধ্বংসস্তূপে চলছে প্রাণের খোঁজ

ভারত সরকার জানিয়েছে, নেপালের উদ্ধারকাজে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ভারতীয় বিমানবাহিনীও উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নিয়েছে। একই সঙ্গে নেপাল ও তিব্বতে আটকে থাকা ভারতীয়দের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ চলছে।

আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : নেপালে ভয়াবহ হড়পা বান ও বন্যায় মৃতের সংখ্যা ৩৫০ ছাড়িয়ে গেছে। আকস্মিক পানির স্রোত, কাদামাটি ও পাহাড়ধসে বিপর্যস্ত হয়েছে দেশটির একাধিক এলাকা। উদ্ধারকারীরা এখনো ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিখোঁজ মানুষদের সন্ধান করছেন। ফলে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

নেপালের সংবাদমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত দেশটির আটটি জেলা থেকে ৩৫৯ জনের মরদেহ উদ্ধারের তথ্য নিশ্চিত করেছে পুলিশ। একই সময়ে কয়েক শ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। দুর্গত এলাকায় উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

বুধবার সকালে নেপালের রাসুয়া জেলার ভোটেকোশী নদীতে হঠাৎ করে ভয়াবহ হড়পা বান নামে। পাহাড়ি এলাকা থেকে প্রচণ্ড গতিতে নেমে আসে কাদামাটি মেশানো পানি। মুহূর্তের মধ্যে সেই স্রোত ভাসিয়ে নেয় ঘরবাড়ি, সড়ক ও সেতু।

অনেক বাড়ি কাদামাটির নিচে চাপা পড়ে গেছে। কোথাও কোথাও দোতলা ভবনের বড় অংশও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। দুর্গত এলাকায় এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে নিখোঁজদের খুঁজে বের করা।

প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, আট শতাধিক মানুষের এখনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন। ফলে সীমান্তের ওপারেও উদ্বেগ বেড়েছে।

নেপালে হড়পা বানের ঘটনায় নিখোঁজ ভারতীয়দের সবাই পর্যটক নন। অনেক ভারতীয় সেখানে কর্মরত ছিলেন। বিশেষ করে ত্রিশূলি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত বেশ কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

এ ছাড়া কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রায় যাওয়া ভারতীয় পর্যটকদের নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কলকাতা থেকে একটি ভ্রমণ সংস্থার মাধ্যমে যাওয়া ৩২ সদস্যের একটি দলের সঙ্গে দীর্ঘ সময় যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে।

বিপর্যয়ের কারণে নেপালের বিভিন্ন এলাকায় অনেক পর্যটক আটকে পড়েছেন। তাঁদের পরিবারের সদস্যরা উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন।

ভারত সরকার জানিয়েছে, নেপালের উদ্ধারকাজে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ভারতীয় বিমানবাহিনীও উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নিয়েছে। একই সঙ্গে নেপাল ও তিব্বতে আটকে থাকা ভারতীয়দের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ চলছে।

নেপালের পাশাপাশি তিব্বতের বিভিন্ন এলাকাতেও ভারতীয় নাগরিক আটকে রয়েছেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রায় ২০০ ভারতীয় আটকে ছিলেন। তাঁদের অনেকে সীমান্ত পেরিয়ে নেপালে প্রবেশের চেষ্টা করছেন।

ভারতীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুর্গত এলাকায় আটকে থাকা নাগরিকদের অবস্থান শনাক্ত করে তাঁদের উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। এরই মধ্যে কয়েকটি দলকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।

প্রথম দফার বিপর্যয়ের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে নেপালে আবারও কি হড়পা বান আসতে পারে?

নেপালের বন্যা পূর্বাভাস বিভাগ জানিয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে নতুন করে বড় ধরনের হড়পা বানের আশঙ্কা নেই। তবে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে নদ-নদীর পানির উচ্চতা বাড়তে পারে। পাহাড়ি এলাকায় নতুন করে ধস নামলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে।

নেপাল-তিব্বত সীমান্তের পরিস্থিতি এ কারণেই বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। পাহাড়ধসের কারণে কয়েকটি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে সেখানে অস্থায়ী জলাধারের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

চীনের পক্ষ থেকেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, পাহাড়ি ধসের কারণে তৈরি হওয়া জলাধারে বিপুল পরিমাণ পানি জমতে পারে। সেই পানির চাপ যদি মাটি ও পাথরের প্রাকৃতিক বাধা ভেঙে দেয়, তাহলে হঠাৎ করে বড় পানির স্রোত নিচের দিকে নেমে আসতে পারে।

অর্থাৎ এখনই নতুন হড়পা বান হবে এমন নিশ্চিত তথ্য নেই। তবে পাহাড়ি নদীগুলোর আচরণ, বৃষ্টিপাত ও ধসের কারণে ঝুঁকি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

নেপালের ভৌগোলিক অবস্থান দেশটিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। দেশটি ভারতীয় ও ইউরেশীয় ভূত্বকীয় পাতের সংযোগস্থলে অবস্থিত। এই দুই পাতের ক্রমাগত সংঘর্ষের কারণে হিমালয় অঞ্চলে ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন চলছে।

নেপালের পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি অত্যন্ত খাড়া। অল্প সময়ে ভারী বৃষ্টি হলে পাহাড়ের ঢাল থেকে মাটি ও পাথর নেমে আসতে পারে। কোনো নদীর গতিপথ ধস বা পাথরের স্তূপে আটকে গেলে সেখানে পানি জমতে থাকে। পরে সেই বাধা ভেঙে গেলে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পানি নিচের দিকে নেমে আসে। এটিই হড়পা বানের অন্যতম কারণ।

হিমালয় এখনো ভূতাত্ত্বিকভাবে সক্রিয় একটি পর্বতমালা। ভূমিকম্প, ভূমিধস, তুষার ও হিমবাহের পরিবর্তন এবং অতিবৃষ্টির মতো বিভিন্ন প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া এই অঞ্চলের ঝুঁকি বাড়ায়।

নেপালের পাহাড়ি নদীগুলোর পানি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের বিহারে প্রবেশ করে। তাই নেপালে বড় ধরনের বন্যা বা হড়পা বান হলে তার প্রভাব বিহারেও পড়তে পারে।

ভোটেকোশী নদীর আকস্মিক পানির স্রোতের পর বিহারের কোশী ও গন্ডক নদীর পানির স্তরও উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে। গন্ডকের পানি কিছুটা কমলেও কোশীর পরিস্থিতি নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

কোশী নদীকে দীর্ঘদিন ধরেই বিহারের জন্য বড় বন্যাঝুঁকি হিসেবে দেখা হয়। অতীতে এই নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ঘটনাও ঘটেছে। বিপুল পরিমাণ পলি জমে নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে গেলে নদী নতুন পথ তৈরি করতে পারে। ফলে স্বাভাবিক গতিপথের বাইরেও বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের পর হিমালয় অঞ্চলের সামগ্রিক দুর্যোগঝুঁকি নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে তিব্বতের ইয়ারলং সাংপো নদীতে চীনের বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে ভারতের অরুণাচল প্রদেশে উদ্বেগ রয়েছে।

অঞ্চলটি ভূমিকম্পপ্রবণ হওয়ায় এত বড় অবকাঠামো নির্মাণের পরিবেশগত ও ভূতাত্ত্বিক প্রভাব নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট প্রকল্পের কারণে ভবিষ্যতে হড়পা বান হবেই এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে বৈজ্ঞানিক তথ্য ও নির্ভরযোগ্য পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।

নেপালের হড়পা বানের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে চীনের দিকে অভিযোগের আঙুল উঠেছে। কেউ কেউ দাবি করেছেন, সীমান্তের ওপারে বিপর্যয়ের খবর আগে জানানো হলে নেপালের নিচু এলাকার মানুষকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হতো।

তবে চীন এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। নেপালে অবস্থিত চীনা দূতাবাসের বক্তব্য অনুযায়ী, বিপর্যয়ের পেছনে চীনের কোনো বাঁধকে দায়ী করার দাবি সঠিক নয়। তাদের দাবি, ওই অঞ্চলে ভূমিকম্প বা ভূমিকম্পসদৃশ প্রাকৃতিক ঘটনা এবং পাহাড়ধসের কারণে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

চীনের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, এমন দুর্যোগের সময়ে পরস্পরকে দোষারোপ না করে উদ্ধার ও মানবিক সহায়তায় গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

নেপালের বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো নিখোঁজদের সন্ধান এবং দুর্গত মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া। একই সঙ্গে নদীর পানি, পাহাড়ধস ও সম্ভাব্য নতুন জলাধারের ওপর নজর রাখা প্রয়োজন।

হিমালয় অঞ্চলের এই বিপর্যয় আবারও দেখিয়ে দিল, পাহাড়ি এলাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ কত দ্রুত ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। নেপালের হড়পা বান শুধু একটি দেশের সংকট নয়; এর প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে ভারতসহ আশপাশের অঞ্চলেও পড়তে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আর্কাইভ