স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদে একাধিক ব্যক্তি দায়িত্ব পালন করেছেন। কেউ ছিলেন পূর্ণ মেয়াদের রাষ্ট্রপতি, আবার কেউ অস্থায়ী বা ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে স্বল্প সময়ের জন্য দায়িত্ব সামলেছেন। রাজনৈতিক পালাবদল, সামরিক অভ্যুত্থান, রাষ্ট্রপতির মৃত্যু কিংবা পদত্যাগ—বিভিন্ন কারণে রাষ্ট্রপতি পদে পরিবর্তন এসেছে।
রাষ্ট্রপতির কার্যালয় ও বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকারীদের তালিকায় একই ব্যক্তি একাধিকবার বা একাধিক মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৬ সালের ২৪ জুলাই হাফিজ উদ্দিন আহমদ দায়িত্ব নেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির তালিকায় নতুন অধ্যায় যুক্ত হয়েছে।
তাহলে কারা ছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি? কে কতদিন দায়িত্ব পালন করেছেন? চলুন জেনে নেওয়া যাক।
শেখ মুজিবুর রহমান
স্বাধীনতার যুদ্ধের সময় গঠিত মুজিবনগর সরকারের রাষ্ট্রপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের তালিকায় তাঁর প্রথম মেয়াদ ২৬ মার্চ ১৯৭১ থেকে ১২ জানুয়ারি ১৯৭২ পর্যন্ত দেখানো হয়েছে।
স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব ছেড়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। পরে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধান পরিবর্তনের পর আবার রাষ্ট্রপতি হন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত তিনি এই পদে ছিলেন।
সৈয়দ নজরুল ইসলাম
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাপিডিয়া ও রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর দায়িত্বকাল ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ/১৭ এপ্রিল থেকে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত হিসেবে বিভিন্ন সরকারি ও ঐতিহাসিক নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মুজিবনগর সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন।
বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী
১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তিনি ১৯৭৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, দায়িত্ব পালনকালে তিনি একবার রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিতও হন।
মোহাম্মদ মোহাম্মদউল্লাহ
আবু সাঈদ চৌধুরীর পর মোহাম্মদ মোহাম্মদউল্লাহ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। প্রথমে তিনি অস্থায়ীভাবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন।
তাঁর রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ হয় ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি, যখন দেশে রাষ্ট্রপতি-শাসিত ব্যবস্থা চালু করা হয়।
খন্দকার মোশতাক আহমদ
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।
তাঁর রাষ্ট্রপতির মেয়াদ ছিল ১৫ আগস্ট থেকে ৬ নভেম্বর ১৯৭৫ পর্যন্ত। অর্থাৎ প্রায় ৮৩ দিন তিনি রাষ্ট্রপতির পদে ছিলেন।
আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম
১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তিনি ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল পর্যন্ত পদে ছিলেন।
সেই সময় দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতার কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন চলছিল।
জিয়াউর রহমান
১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে একদল সেনা কর্মকর্তার হাতে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতি ছিলেন।
তাঁর সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে এবং পরবর্তীতে বিএনপি গঠিত হয়।
বিচারপতি আবদুস সাত্তার
জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তৎকালীন উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। পরে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
তবে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাঁর সরকারের পতন ঘটে।
বিচারপতি এ এফ এম আহসানউদ্দীন চৌধুরী
১৯৮২ সালের ২৭ মার্চ বিচারপতি এ এফ এম আহসানউদ্দীন চৌধুরী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, তিনি ১৯৮৩ সালের ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত পদে ছিলেন।
এর পরদিনই হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ
১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর থেকে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রপতি ছিলেন। তাঁর শাসনামল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সামরিক শাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
১৯৯০ সালের ব্যাপক গণআন্দোলনের মুখে তিনি ক্ষমতা ছাড়েন।
বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ
এরশাদের পতনের পর বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তাঁর নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করে।
তিনি ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব থেকে সরে যান। পরে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তিনি আবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
আব্দুর রহমান বিশ্বাস
১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর আব্দুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তিনি পূর্ণ মেয়াদ শেষ করে ১৯৯৬ সালের ৯ অক্টোবর পদ ছাড়েন।
তাঁর মেয়াদ ছিল প্রায় পাঁচ বছর।
একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী
২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।
তবে মাত্র সাত মাসের মাথায় ২০০২ সালের ২১ জুন তিনি পদত্যাগ করেন। বাংলাপিডিয়ার তথ্যেও তাঁর এই মেয়াদের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
মুহম্মদ জমির উদ্দিন সরকার
বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর জাতীয় সংসদের স্পিকার মুহম্মদ জমির উদ্দিন সরকার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।
তিনি ২০০২ সালের ২১ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ
২০০২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় তিনি রাষ্ট্রপতির পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করেন।
তিনি ২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে ছিলেন।
মো. জিল্লুর রহমান
২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি মো. জিল্লুর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। আওয়ামী লীগের প্রবীণ এই নেতা ২০১৩ সালের ২০ মার্চ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ছিলেন।
তাঁর মৃত্যুর পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব সাময়িকভাবে স্পিকার মো. আবদুল হামিদের হাতে যায়।
মো. আবদুল হামিদ
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিদের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় এই পদে ছিলেন মো. আবদুল হামিদ। প্রথমে ২০১৩ সালের ১৩ মার্চ তিনি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।
পরে ২৪ এপ্রিল ২০১৩ থেকে পূর্ণ রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। ২০১৮ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে পুনর্নির্বাচিত হয়ে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন।
মো. সাহাবুদ্দিন
মো. আবদুল হামিদের পর ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল মো. সাহাবুদ্দিন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তিনি ছিলেন দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি।
তাঁর দায়িত্বকাল শেষ হওয়ার পর ২০২৬ সালে রাষ্ট্রপতি পদে নতুন পরিবর্তন আসে।
হাফিজ উদ্দিন আহমদ
২০২৬ সালের ২৪ জুলাই হাফিজ উদ্দিন আহমদ বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সরকারি ওয়েবসাইটে তাঁকে বর্তমানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার ছিলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামরিক জীবনের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার ইতিহাসও রয়েছে তাঁর।
রাষ্ট্রপতির তালিকায় কেন সংখ্যার পার্থক্য দেখা যায়?
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সংখ্যা নিয়ে অনেক সময় বিভ্রান্তি দেখা যায়। এর প্রধান কারণ হলো—একই ব্যক্তি একাধিকবার রাষ্ট্রপতি হয়েছেন, আবার কেউ পূর্ণ রাষ্ট্রপতি হিসেবে এবং কেউ অস্থায়ী বা ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
যেমন শেখ মুজিবুর রহমান দুই দফায় রাষ্ট্রপতি ছিলেন। বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদও দুই দফায় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। মো. আবদুল হামিদও দুই মেয়াদে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ছিলেন।
ফলে ‘কতজন ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি হয়েছেন’ এবং ‘কতবার রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শুরু হয়েছে’—এই দুই হিসাব এক নয়।
বর্তমানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি কে?
বর্তমান সরকারি তথ্য অনুযায়ী, হাফিজ উদ্দিন আহমদ বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি। তিনি ২৪ জুলাই ২০২৬ দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। ফলে ‘নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের অপেক্ষায় বাংলাদেশ’—এমন পুরোনো তথ্য এখন আর প্রযোজ্য নয়।
স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রপতি পদটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে সামরিক শাসন, গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পালাবদল—প্রতিটি পর্যায়েই রাষ্ট্রপতির পদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
— সংবাদ সংস্থার সাহায্য নিয়ে লেখা

