ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে আর্জেন্টিনা। আর সেই আলোচনার প্রধান কারণ একটাই—লিওনেল মেসি। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দল হিসেবে ২০২৬ বিশ্বকাপে মাঠে নামছে আর্জেন্টিনা, আর তাদের সামনে রয়েছে ইতিহাস গড়ার বিরল সুযোগ। ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর এবারও শিরোপা জিততে পারলে ব্রাজিলের ৬৪ বছরের পুরনো এক অনন্য রেকর্ডে ভাগ বসাবে আলবিসেলেস্তেরা।
বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত একমাত্র দল হিসেবে টানা দুইবার বিশ্বকাপ জয়ের কৃতিত্ব রয়েছে ব্রাজিলের। তারা ১৯৫৮ এবং ১৯৬২ সালে পরপর দুটি বিশ্বকাপ শিরোপা জিতেছিল। সেই ঐতিহাসিক অর্জনের সমকক্ষ হওয়ার স্বপ্ন নিয়েই এবার বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করছে আর্জেন্টিনা।
টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন
বিশ্বকাপের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন হিসেবে আর্জেন্টিনার প্রতি প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি। গত আসরে কাতারে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বসেরা হয়েছিল দলটি। এবারও সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে চায় লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা।
আর্জেন্টিনার বর্তমান স্কোয়াডে অভিজ্ঞতা এবং তারুণ্যের এক চমৎকার সমন্বয় দেখা যাচ্ছে। ২৬ সদস্যের দলে গত বিশ্বকাপজয়ী দলের ১৭ জন ফুটবলার রয়েছেন। বাকি ৯ জন নতুন মুখ, যারা দলকে আরও শক্তিশালী ও বৈচিত্র্যময় করেছে।
শক্তিশালী মাঝমাঠই আর্জেন্টিনার বড় অস্ত্র
আর্জেন্টিনার সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি তাদের ভারসাম্যপূর্ণ মাঝমাঠ। এঞ্জো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার এবং রদ্রিগো ডি পল বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম কার্যকর মিডফিল্ড ত্রয়ী হিসেবে বিবেচিত। আক্রমণ এবং রক্ষণ—দুই ক্ষেত্রেই তাদের অবদান দলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে গোলবারের নিচে আছেন বিশ্বকাপজয়ী গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দলের রক্ষাকবচ হয়ে ওঠার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে তার ক্যারিয়ারে।
রক্ষণভাগে ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো ও নিকোলাস ওটামেন্ডির অভিজ্ঞতা আর্জেন্টিনাকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস দিচ্ছে। পাশাপাশি আক্রমণভাগে জুলিয়ান আলভারেজ এবং লাউতারো মার্টিনেজের মতো তারকারা প্রতিপক্ষের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারেন।
লিওনেল মেসি এখনও দলের সবচেয়ে বড় ভরসা
যদিও আর্জেন্টিনা এখন একটি পূর্ণাঙ্গ দল, তবুও লিওনেল মেসির গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ম্যাচের গতি পরিবর্তন করা, সৃষ্টিশীল পাস, গোল কিংবা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে নেতৃত্ব—সব ক্ষেত্রেই তিনি এখনও দলের প্রাণভোমরা।
এবারের বিশ্বকাপ নিয়ে মেসির অংশগ্রহণ নিয়ে একসময় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি জাতীয় দলের হয়ে আরও একটি বিশ্বকাপ খেলতে সম্মত হন। এর মাধ্যমে নিজের ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
বিশ্বকাপের আগে হ্যামস্ট্রিং ইনজুরিতে পড়লেও দ্রুত সুস্থ হয়ে মাঠে ফিরেছেন তিনি। প্রস্তুতি ম্যাচে গোল করে নিজের ফিটনেস ও ফর্মেরও প্রমাণ দিয়েছেন।
নতুন ইতিহাসের সামনে মেসি
বিশ্বকাপ ইতিহাসে এখন পর্যন্ত ১৩টি গোল করেছেন মেসি। আর মাত্র চারটি গোল করতে পারলেই বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় শীর্ষস্থানে পৌঁছে যাবেন তিনি। ফলে দলগত সাফল্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগত রেকর্ড গড়ার সুযোগও রয়েছে এই বিশ্বকাপে।
ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এটি হতে পারে মেসির আরেকটি স্মরণীয় বিশ্বকাপ, যেখানে তিনি নিজের কিংবদন্তি ক্যারিয়ারে নতুন অধ্যায় যোগ করতে পারেন।
বয়স কি বড় চ্যালেঞ্জ?
সব ইতিবাচক দিকের মাঝেও আর্জেন্টিনার সামনে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো মেসির বয়স। ৩৯ বছর বয়সে টানা উচ্চগতির ম্যাচে ৯০ মিনিট খেলা সহজ নয়।
তাই কোচ লিওনেল স্কালোনিকে কৌশলী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কখন মেসিকে বিশ্রাম দেওয়া হবে, কখন তাকে মাঠে রাখা হবে এবং দলের অন্য খেলোয়াড়রা কীভাবে তার ওপর চাপ কমাবে—এসব বিষয়ই আর্জেন্টিনার সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনার সূচি
বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচ আলজেরিয়ার বিপক্ষে। এরপর তারা মুখোমুখি হবে অস্ট্রিয়া এবং জর্ডনের।
গত বিশ্বকাপে সৌদি আরবের বিপক্ষে হারের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করেছিল আর্জেন্টিনা। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা এবার ভুলতে চায় দলটি। শুরু থেকেই জয়ের ধারায় থেকে আত্মবিশ্বাস নিয়ে নকআউট পর্বে পৌঁছানোই তাদের মূল লক্ষ্য।
বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের সামনে বড় পরীক্ষা
বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সফল দল আর্জেন্টিনা এবার শুধু শিরোপা রক্ষার লড়াইয়ে নামছে না, তারা ইতিহাস স্পর্শ করার মিশনেও নেমেছে। ব্রাজিলের দীর্ঘদিনের রেকর্ডে ভাগ বসানো, মেসির সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপকে স্মরণীয় করে তোলা এবং নতুন প্রজন্মের তারকাদের বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করা—সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনার এই অভিযান হতে যাচ্ছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
এখন দেখার বিষয়, লিওনেল মেসির নেতৃত্বে আলবিসেলেস্তেরা কি সত্যিই টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জিতে ফুটবল ইতিহাসে নিজেদের নাম আরও উজ্জ্বল করে তুলতে পারে, নাকি নতুন কোনো চ্যালেঞ্জার তাদের স্বপ্ন ভেঙে দেবে।

