খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img

দর্শনা সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচারের আগে ৭ কেজি স্বর্ণসহ আটক-১

চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্তে স্বর্ণ পাচারবিরোধী অভিযানে বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।চুয়াডাঙ্গা ব্যাটালিয়ন (৬ বিজিবি) পরিচালিত একটি গোয়েন্দাভিত্তিক অভিযানে আনুমানিক ১৩...
Homeআইন ও অপরাধর‍্যাবের ‘আয়নাঘর’ ঘিরে নতুন তথ্য: ২৯টি কক্ষ, ৭টি ‘ডেথ সেল’

র‍্যাবের ‘আয়নাঘর’ ঘিরে নতুন তথ্য: ২৯টি কক্ষ, ৭টি ‘ডেথ সেল’

তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা এমন কিছু তথ্য তুলে ধরেন, যা আগে জোরপূর্বক গুম ও নির্যাতনের অভিযোগগুলোর সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ভবনটিতে মোট ২৯টি কক্ষ, সাতটি অতিসংকীর্ণ ‘ডেথ সেল’ এবং বিশেষভাবে নির্মিত জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

ঢাকার উত্তরার বিমানবন্দর এলাকার র‍্যাব-১ ব্যাটালিয়নের কম্পাউন্ডে অবস্থিত টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেল, যা দীর্ঘদিন ধরে ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত, আবারও আলোচনায় এসেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারপতিরা সম্প্রতি এই স্থাপনাটি সরেজমিনে পরিদর্শন করার পর একের পর এক নতুন তথ্য সামনে আসে। পরিদর্শনে চিফ প্রসিকিউটরসহ প্রসিকিউশন টিমের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।

পরিদর্শনের সময় স্থাপনাটি ঘুরে দেখেন তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা এমন কিছু তথ্য তুলে ধরেন, যা আগে জোরপূর্বক গুম ও নির্যাতনের অভিযোগগুলোর সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ভবনটিতে মোট ২৯টি কক্ষ, সাতটি অতিসংকীর্ণ ‘ডেথ সেল’ এবং বিশেষভাবে নির্মিত জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

টিএফআই সেলটি রাজধানীর উত্তরায় বিমানবন্দর সংলগ্ন র‍্যাব-১ ব্যাটালিয়নের কম্পাউন্ডের ভেতরে একটি পুরোনো দ্বিতল ভবনে অবস্থিত। ভবনটি অস্ত্রাগারের কাছাকাছি হওয়ায় সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার ছিল না। এটি পরিচালিত হতো র‍্যাবের গোয়েন্দা শাখা বা ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের পরিচালকের অধীনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে।

প্রাথমিকভাবে ভবনটি জিজ্ঞাসাবাদের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল বলে জানা গেলেও তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের দাবি, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এটি বলপূর্বক গুম হওয়া ব্যক্তিদের গোপন বন্দিশালা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

তদন্তে উঠে এসেছে, স্থাপনাটির প্রকৃত পরিচয় গোপন রাখতে একটি বিশেষ কোডনেম ব্যবহার করা হতো। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে টিএফআই সেলের পরিচিতি ছিল ‘হাসপাতাল’ নামে। এই কোডনেম ব্যবহারের কারণে বাইরের অনেক কর্মকর্তা কিংবা অন্য ইউনিটের সদস্যরাও ভবনটির প্রকৃত কার্যক্রম সম্পর্কে জানতেন না।

অভিযোগ অনুযায়ী, গোটা স্থাপনাটির নিয়ন্ত্রণ ছিল শুধুমাত্র র‍্যাবের গোয়েন্দা শাখার হাতে। ফলে অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ সেখানে সহজে প্রবেশ করতে পারতেন না।

তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, জোরপূর্বক গুম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না; এটি একটি পরিকল্পিত ও সংগঠিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পরিচালিত হয়েছে বলে অভিযোগ আছে ।

নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে অপহরণ, গোপনে আটক, দীর্ঘ সময় ধরে অজ্ঞাত স্থানে আটকে রাখা, জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতনের মতো ধাপ অনুসরণ করা হতো। অনেক ক্ষেত্রে শুধু র‍্যাব নয়, অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরও সমন্বিতভাবে অভিযানে অংশ নেওয়ার অভিযোগ উঠে এসেছে।

টিএফআই সেলে কিছুদিন রাখার পর অনেক ভুক্তভোগীকে অন্য গোপন বন্দিশালাতেও স্থানান্তর করা হতো বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।

র‍্যাব সদস্যদের থাকার জন্য ব্যারাকের মতো একটি অংশও ছিল। সেখানে টিএফআই সেলের নিরাপত্তায় নিয়োজিত সদস্যরা অবস্থান করতেন।

ভবনের দ্বিতীয় তলায় আরও ১০টি সাধারণ সেলের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এসব কক্ষের গড় আয়তন ছিল প্রায় ১৪ ফুট লম্বা এবং ৪ থেকে ৫ ফুট চওড়া।

এ ছাড়া সেখানে দুটি তুলনামূলক বড় কক্ষ ছিল, যেগুলোকে ‘ভিআইপি সেল’ হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। একটি কক্ষের আয়তন প্রায় ১৪ ফুট × ১০ ফুট এবং অন্যটির আয়তন প্রায় ১০ ফুট × ১০ ফুট। দুটি কক্ষের সঙ্গে পৃথক ছোট টয়লেটও ছিল।

একই তলায় র‍্যাবের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কয়েকটি অফিস কক্ষও অবস্থিত ছিল।

পরিদর্শনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল তথাকথিত ‘ডেথ সেল’।

তদন্তে জানা যায়, ভবনের প্রবেশমুখের সিঁড়ির পাশে খোলা টয়লেটসহ অত্যন্ত ছোট সাতটি সেল ছিল। প্রতিটি কক্ষের গড় আয়তন মাত্র ২ ফুট × ৪ ফুট।

অভিযোগ অনুযায়ী, এসব অতিসংকীর্ণ কক্ষে বন্দিদের রাখা হতো এবং এগুলো ‘ডেথ সেল’ বা ‘যম সেল’ নামে পরিচিত ছিল। এত ছোট জায়গায় দীর্ঘ সময় অবস্থান করা একজন মানুষের জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তদন্তে আরও জানা গেছে, কোনো সময় আটক ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে গেলে বিদ্যমান কক্ষগুলো যথেষ্ট না হওয়ায় ভবনের দ্বিতীয় তলার খোলা করিডোরে অস্থায়ী সেল তৈরি করা হতো।

ক্যানভাস কিংবা মোটা কাপড় দিয়ে পার্টিশন তৈরি করে সেখানে অতিরিক্ত ভুক্তভোগীদের আটকে রাখা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থাপনাটির ভেতরে তিনটি সাউন্ডপ্রুফ বা শব্দনিরোধক জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষের অস্তিত্বও পাওয়া গেছে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব কক্ষে বন্দিদের ‘সাবজেক্ট’ নামে উল্লেখ করা হতো। কক্ষগুলোতে বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি ছিল, যেগুলো জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি নির্যাতনের কাজে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

পরিদর্শনে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, বিশেষ কক্ষগুলোতে একটি ঘূর্ণায়মান স্টিলের চেয়ার ছিল। অভিযোগ রয়েছে, বন্দিদের ওই চেয়ারে বসিয়ে বৈদ্যুতিক মোটরের মাধ্যমে দ্রুত কিংবা ধীরগতিতে ঘোরানো হতো।

এ ছাড়া সেখানে বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার ব্যবস্থা, ছাদ থেকে ঝুলিয়ে রাখার সরঞ্জাম এবং মইয়ের মতো লোহার বেড পাওয়া গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বন্দিদের ওই বেডে বেঁধে বিভিন্নভাবে নির্যাতন চালানো হতো।

তদন্তকারীদের দাবি, এসব পদ্ধতির মাধ্যমে স্বীকারোক্তি আদায় কিংবা মানসিকভাবে ভেঙে ফেলার চেষ্টা করা হতো।

জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষগুলোতে নির্যাতনের শিকার মানুষের বিভিন্ন ভয়াবহ ছবি টাঙানো ছিল বলেও তদন্তে উঠে এসেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, কাটা হাত, উপড়ে ফেলা চোখ এবং গুরুতর নির্যাতনের শিকার মানুষের ছবি দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা হতো। এসব ছবি দেখিয়ে বন্দিদের মধ্যে ভয় সৃষ্টি এবং মানসিক চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করা হতো বলে তদন্তকারীরা উল্লেখ করেছেন।

পরিদর্শনের সময় তদন্তকারী দল দেখতে পায়, ভবনের বিভিন্ন অংশে পরিবর্তন আনা হয়েছে।

দেয়াল, দরজা, জানালা এবং অভ্যন্তরীণ কাঠামোর অনেক অংশ পরিবর্তন করায় আগের অবস্থার সঙ্গে মিল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভবনের বিভিন্ন অংশ পরিবর্তন করে সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে।

চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানান, তদন্তের শুরুতে ভবনের ভেতরে এমনভাবে পরিবর্তন আনা হয়েছিল যে ভুক্তভোগীদের দেওয়া বর্ণনার সঙ্গে বাস্তব স্থাপনার মিল পাওয়া যাচ্ছিল না।

পরে বিস্তারিত অনুসন্ধানে কয়েকটি স্থানে নতুন দেয়াল নির্মাণের বিষয়টি ধরা পড়ে। এসব দেয়াল অপসারণ করার পর লুকিয়ে রাখা একাধিক কক্ষের সন্ধান পাওয়া যায়।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, শুরুতে ২২টি কক্ষ শনাক্ত করা হলেও পরে তদন্তে মোট ২৯টি কক্ষের অস্তিত্ব নিশ্চিত হওয়া যায়। এর মধ্যে একটি ডেথ সেলও নতুনভাবে শনাক্ত হয়েছে।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, যেসব ব্যক্তি এই বন্দিশালা পরিচালনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাদের আইনের মুখোমুখি হতে হবে।

তিনি আরও বলেন, যারা পরবর্তীকালে দেয়াল তুলে কিংবা ভবনের কাঠামো পরিবর্তন করে সম্ভাব্য আলামত আড়াল করার চেষ্টা করেছেন, তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, জায়গাটির ভেতরের অংশ ভয়াবহ।

তিনি জানান, ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ২৯টি সেল পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, ভিন্ন রাজনৈতিক মত বা বিরোধী মতাবলম্বীদের দীর্ঘ সময় সেখানে আটক রেখে নির্যাতন করা হতো।

অনেককে মাস কিংবা বছরের পর বছর গোপনে আটকে রাখার পর বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। আবার অনেকের ক্ষেত্রে হত্যার পর মরদেহ গোপন করার অভিযোগও তদন্তে উঠে এসেছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর উদ্ধার হওয়া কয়েকজন ভুক্তভোগী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করেন।

তাদের মধ্যে ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাশেম আরমান অন্যতম। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে টিএফআই সেলে গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিচারিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

চিফ প্রসিকিউটর জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত গুম ও হত্যার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ থাকা ২৫০ জনেরও বেশি ব্যক্তির খোঁজ পাওয়া যায়নি।

নিখোঁজদের তালিকায় সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস আলী এবং সুমন নামের একজন ভুক্তভোগীর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তকারীরা বলছেন, নিখোঁজদের প্রকৃত পরিণতি উদঘাটনে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।