আইপিএলে দিল্লি ক্যাপিটালসের হয়ে খেলা পশ্চিমবঙ্গের ক্রিকেটার অভিষেক পোড়েলের বিরুদ্ধে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শারীরিক সম্পর্ক এবং ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। ২৩ বছর বয়সী এই উইকেটকিপার-ব্যাটারকে গ্রেফতারের পর তিন দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন চুঁচুড়া জেলা ও মহকুমা আদালত।
অভিযোগ করেছেন এক তরুণী, যিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছাত্রী বলে জানা গেছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই তরুণীর দাবি, প্রায় তিন বছর ধরে তাঁর সঙ্গে অভিষেক পোড়েলের সম্পর্ক ছিল এবং তাঁকে বিয়ের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল। পরে সম্পর্কে সমস্যা তৈরি হলে তিনি পুলিশের দ্বারস্থ হন।
ঘটনাটি সামনে আসার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শারীরিক সম্পর্ক করলে ভারতের আইনে সেটি কখন অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে?
বিষয়টি সরল নয়। কারণ, শুধুমাত্র সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া বা শেষ পর্যন্ত বিয়ে না হওয়াই সব ক্ষেত্রে ধর্ষণ বা অপরাধ প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়। অভিযোগের শুরু থেকেই প্রতারণার উদ্দেশ্য ছিল কি না, সম্পর্কের সময় সম্মতি কীভাবে নেওয়া হয়েছিল এবং অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ কী বলছে—এসব বিষয় আদালতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, গত ২৩ জুন হুগলির মগরা থানায় অভিযোগ দায়ের করেন এক তরুণী। তাঁর দাবি, প্রায় তিন বছর ধরে অভিষেক পোড়েলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল।
অভিযোগকারিণীর দাবি, সম্পর্ক চলাকালীন তাঁকে বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ক্রিকেটার। পরবর্তীতে দুজনের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হয় এবং অভিষেক সেই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসেন বলে অভিযোগ।
পুলিশ প্রথমে ব্যবস্থা না নেওয়ায় ওই তরুণী কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন বলে জানা গেছে। এরপর আদালতের নির্দেশের পর সোমবার গভীর রাতে কলকাতা থেকে অভিষেক পোড়েলকে গ্রেফতার করা হয়।
মঙ্গলবার তাঁকে চুঁচুড়া আদালতে পেশ করা হলে বিচারক তিন দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেন।
হুগলি গ্রামীণ পুলিশের সুপার কুনওয়ার ভূষণ সিং জানিয়েছেন, এক তরুণী নির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের করেছিলেন এবং সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই আইনি পদক্ষেপ করা হয়েছে।
অভিষেক পোড়েলের পরিবারের পক্ষ থেকে বা তাঁর আইনজীবীর তরফে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনও বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মামলায় তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ধারাও যুক্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগকারিণীর দাবি, তাঁদের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবি ক্রিকেটার নিজের মোবাইল ফোনে সংরক্ষণ করতেন।
এই অভিযোগের ভিত্তিতেই তথ্যপ্রযুক্তি আইনের বিভিন্ন ধারার প্রয়োগ হয়েছে বলে স্থানীয় প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি অভিযোগ ওঠা এবং আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। তদন্তের পর প্রমাণ সংগ্রহ এবং আদালতের বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমেই শেষ পর্যন্ত অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হবে।
ভারতে ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে নতুন ফৌজদারি আইন কার্যকর হয়েছে। এর মধ্যে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা বা BNS-এ বিয়ের প্রতিশ্রুতি সংক্রান্ত যৌন সম্পর্কের জন্য পৃথক বিধান রাখা হয়েছে।
BNS-এর ধারা ৬৯ অনুযায়ী, ধর্ষণের পর্যায়ে না পড়া এমন ক্ষেত্রে কোনও ব্যক্তি প্রতারণামূলক উপায়ে কোনও নারীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলে অপরাধ হতে পারে। এর মধ্যে বিয়ের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, চাকরি বা পদোন্নতির মিথ্যা প্রতিশ্রুতির মতো বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এই অপরাধে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং জরিমানার বিধান রয়েছে।
অর্থাৎ, নতুন আইনে বিয়ের প্রতিশ্রুতিকে কেন্দ্র করে যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট আইনি কাঠামো তৈরি হয়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে কোনও প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে গেলেই BNS-এর ৬৯ ধারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হবে।
এখানেই রয়েছে পুরো বিষয়টির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি দিক।
আইন বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সম্পর্কের শুরু থেকেই যদি কোনও ব্যক্তির বিয়ে করার কোনও ইচ্ছা না থাকে, কিন্তু সেই মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে অন্য ব্যক্তিকে শারীরিক সম্পর্কে রাজি করানো হয়, তাহলে বিষয়টি অপরাধের পর্যায়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে, দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মতিতে সম্পর্ক তৈরি হওয়ার পর কোনও কারণে সেই সম্পর্ক ভেঙে গেলে বা পরবর্তীতে বিয়ে না হলে সেটিকে সবসময় একইভাবে দেখা হবে না।
অর্থাৎ আদালতকে দেখতে হবে, বিয়ের প্রতিশ্রুতিটি শুরু থেকেই মিথ্যা ছিল কি না।
যদি দেখা যায়, সম্পর্কের শুরুতে সত্যিই বিয়ের ইচ্ছা ছিল, কিন্তু পরবর্তীতে পরিস্থিতি বদলে যাওয়ায় বিয়ে হয়নি, তাহলে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে BNS-এর ৬৯ ধারার অপরাধ হয়ে যায় না।
ভারতের পুরনো ফৌজদারি আইন, অর্থাৎ Indian Penal Code বা IPC-তে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যৌন সম্পর্কের জন্য আলাদা কোনও নির্দিষ্ট ধারা ছিল না।
এই ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি অনুযায়ী IPC-এর ধারা ৩৭৬ বা ধর্ষণ সংক্রান্ত বিধান এবং ধারা ৪১৭-এর প্রতারণার বিধান ব্যবহার করা হতো।
নতুন BNS কার্যকর হওয়ার পর বিয়ের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে যৌন সম্পর্কের বিষয়টি আরও নির্দিষ্টভাবে আইনের আওতায় এসেছে।
বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সম্পর্ক এবং ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে ভারতের আদালতগুলোতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন মামলার পর্যবেক্ষণে বারবার একটি বিষয় উঠে এসেছে—শুধু বিয়ে না হওয়া বা প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া দিয়ে প্রতিটি ঘটনা ধর্ষণ হয়ে যায় না।
আদালতকে দেখতে হয়, যৌন সম্পর্কের সম্মতি নেওয়ার সময় অভিযুক্তের বিয়ের প্রতিশ্রুতিটি আদৌ সত্য ছিল কি না।
অর্থাৎ সম্পর্কের শুরু থেকেই যদি বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার সময় প্রতারণার উদ্দেশ্য থাকে, তাহলে পরিস্থিতি একরকম। আবার দুজনের মধ্যে দীর্ঘদিনের সম্মতিপূর্ণ সম্পর্ক থাকার পর পরবর্তীতে বিয়ে না হলে বিষয়টি অন্যভাবে বিচার করতে হবে।
এ কারণেই এ ধরনের মামলায় তদন্ত এবং প্রমাণের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ সম্পর্কে থাকলে এবং একাধিকবার পারস্পরিক সম্মতিতে শারীরিক সম্পর্কে জড়ালে পরবর্তীতে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার বিষয়টি আদালত আলাদাভাবে বিবেচনা করতে পারে।
তবে এর মানে এই নয় যে দীর্ঘ সম্পর্ক থাকলেই অভিযোগ খারিজ হয়ে যাবে।
প্রতিটি মামলার তথ্য আলাদা। অভিযোগকারিণীর বক্তব্য, মেসেজ, ফোন রেকর্ড, সম্পর্কের প্রকৃতি, বিয়ের প্রতিশ্রুতির প্রমাণ এবং অভিযুক্তের আচরণ—সবকিছু বিবেচনায় নিতে পারে আদালত।
সুতরাং ‘দীর্ঘ সম্পর্ক ছিল’ এবং ‘তাই ধর্ষণ হতে পারে না’—এমন সরল আইনি সূত্র নেই।
অভিষেক পোড়েলকে তিন দিনের পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এই সময়ে তদন্তকারীরা অভিযোগের বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখতে পারেন।
অভিযোগকারিণীর বক্তব্য, তাঁদের সম্পর্কের সময়কার যোগাযোগ, বিয়ের প্রতিশ্রুতির বিষয়ে কোনও প্রমাণ, ডিজিটাল তথ্য এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিষয় তদন্তের অংশ হতে পারে।
এরপর তদন্তের অগ্রগতি এবং সংগৃহীত প্রমাণের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গ্রেফতার মানেই অভিযুক্ত দোষী প্রমাণিত নন। আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি আইনের চোখে অভিযুক্ত হিসেবেই বিবেচিত হবেন।
এই মামলাতেও শেষ পর্যন্ত আদালতই ঠিক করবে অভিযোগের আইনি ভিত্তি কতটা শক্তিশালী এবং কোন ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হয় কি না।
বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শারীরিক সম্পর্কের অভিযোগের ক্ষেত্রে মূল বিতর্ক তৈরি হয় ‘সম্মতি’ এবং ‘প্রতারণা’র সীমারেখা নিয়ে।
একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী যদি বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে সম্মতি দিয়ে সম্পর্কে জড়ান, পরে সেই সম্পর্ক ভেঙে যায়—তাহলে সেটি কি প্রতারণা, নাকি একটি ব্যর্থ সম্পর্ক?
আবার যদি কেউ শুরু থেকেই বিয়ে করার কোনও ইচ্ছা না রেখে শুধুমাত্র শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেন, তাহলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা।
এই পার্থক্য নির্ধারণের জন্য আদালতকে ঘটনাপ্রবাহ এবং প্রমাণ বিশ্লেষণ করতে হয়।
তাই আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের মামলা সাধারণত অত্যন্ত তথ্য ও প্রমাণনির্ভর।
অভিষেক পোড়েলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা এখনও আদালতে প্রমাণিত হয়নি। তদন্তের মাধ্যমে এখন মূলত যে বিষয়গুলো স্পষ্ট হওয়ার অপেক্ষা, তার মধ্যে রয়েছে সম্পর্কের শুরুতে বিয়ের প্রতিশ্রুতির প্রকৃতি কী ছিল, সেই প্রতিশ্রুতি আদৌ মিথ্যা ছিল কি না এবং অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ কী বলছে।
একই সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবি সংক্রান্ত অভিযোগও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
এই মামলার পরবর্তী শুনানি এবং তদন্তের ফলেই বিষয়গুলো আরও পরিষ্কার হবে।
সব মিলিয়ে, ভারতের বর্তমান আইনে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যৌন সম্পর্কের অভিযোগকে একেবারে গুরুত্বহীন বলা যায় না। আবার শুধু বিয়ে না হওয়া বা সম্পর্ক ভেঙে যাওয়াকেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধর্ষণ বলা যায় না। বিয়ের প্রতিশ্রুতি শুরু থেকেই প্রতারণামূলক ছিল কি না, সম্মতির প্রকৃতি কী ছিল এবং কী প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই শেষ পর্যন্ত আইনি সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
উল্লেখ্য, অভিষেক পোড়েলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ আদালতে এখনও প্রমাণিত নয়। তাঁর বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার ফলাফলের ওপরই চূড়ান্ত আইনি অবস্থান নির্ভর করবে।

