রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) এক শিক্ষার্থীকে ট্রেনের টিকিট পরীক্ষক (টিটি) মারধর করেছেন—এমন অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাজশাহীতে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন রেললাইনে অবস্থান নিয়ে অবরোধ শুরু করলে রাজশাহীর সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের রেল যোগাযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। ফলে শত শত নয়, হাজারো যাত্রী চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সকাল থেকে শুরু হওয়া এই অবরোধের কারণে রাজশাহী রেলস্টেশন থেকে নির্ধারিত সময়ে কোনও ট্রেন ছেড়ে যেতে পারেনি। একই সঙ্গে রাজশাহীগামী ট্রেনগুলোর চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
শিক্ষার্থীদের দাবি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের এক শিক্ষার্থী পদ্মা এক্সপ্রেসে ভাড়া আদায়ের সময় রসিদ ছাড়া অর্থ নেওয়ার অভিযোগের প্রতিবাদ করেন। এ নিয়ে ট্রেনের টিকিট পরীক্ষক (টিটি) সুমনের সঙ্গে তার বাকবিতণ্ডা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, একপর্যায়ে টিটি ওই শিক্ষার্থীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন এবং পরে জোরপূর্বক একটি স্টেশনে ট্রেন থেকে নামিয়ে দেন। বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছালে সহপাঠীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরে শিক্ষার্থীরা অভিযুক্ত টিটির বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে রেলপথ অবরোধের কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
অবরোধে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, অভিযুক্ত টিটি সুমনকে দ্রুত উপস্থিত করে তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তাদের ভাষ্য, রেলের ভেতরে যাত্রীদের সঙ্গে অসদাচরণ কিংবা অনিয়ম কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
শিক্ষার্থীরা আরও ঘোষণা দেন, তাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদসংলগ্ন রেললাইন থেকে তারা সরে দাঁড়াবেন না। ফলে ট্রেন চলাচল অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে পড়ে।
রেলপথ অবরোধের সরাসরি প্রভাব পড়ে রাজশাহী রেলস্টেশনে। সকাল থেকে ঢাকাগামী বনলতা এক্সপ্রেস, সিল্কসিটি এক্সপ্রেসসহ নির্ধারিত কোনো ট্রেনই স্টেশন ছেড়ে যেতে পারেনি। অন্যদিকে রাজশাহীমুখী ট্রেনগুলোও বিভিন্ন স্টেশনে আটকে পড়ে।
এর ফলে দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই রেলপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত হয়। দীর্ঘ সময় ধরে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় যাত্রীদের মধ্যে চরম অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ তৈরি হয়।
হঠাৎ ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রাজশাহী রেলস্টেশনে অপেক্ষমাণ যাত্রীরা পড়েছেন চরম বিপাকে। কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্টেশনে অপেক্ষা করছেন, আবার অনেকে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে বিকল্প পরিবহনের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছেন।
ঢাকাগামী বনলতা এক্সপ্রেসের যাত্রী আমিনুল ইসলাম বলেন, সকাল থেকেই স্টেশনে অপেক্ষা করছেন, কিন্তু ট্রেন কখন ছাড়বে সে বিষয়ে কেউ নিশ্চিতভাবে কিছু জানাতে পারছেন না। জরুরি কাজে ঢাকায় যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও অনিশ্চয়তার কারণে তিনি বিপাকে পড়েছেন।
অন্যদিকে যাত্রী শারমিন আক্তার জানান, রাজধানীতে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অফিস মিটিং ছিল। ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। তিনি দ্রুত সমস্যার সমাধান করে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি দূর করার আহ্বান জানান।
রেলপথ অবরোধের পরপরই ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতিনিধিরা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। তারা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা শুরু করেন যাতে দ্রুত একটি সমাধানে পৌঁছানো যায় এবং ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে শিক্ষার্থীরা তাদের দাবিতে অনড় অবস্থান বজায় রাখায় অবরোধ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।
বাংলাদেশ রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) ফরিদ আহমেদ জানান, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান হবে এবং ট্রেন চলাচল আবারও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের মতে, যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীরা তখনও রেলপথ অবরোধ প্রত্যাহার করেননি। ফলে রাজশাহী রেলস্টেশনে আটকে থাকা যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বাড়তে থাকে এবং দেশের বিভিন্ন রুটে ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সমর্থন ও আলোচনার পরিবেশ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগ দ্রুত নিরসনের দাবিও জোরালো হয়ে উঠেছে। এখন সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের আলোচনার ফলাফলই নির্ধারণ করবে কবে নাগাদ রাজশাহীর সঙ্গে সারাদেশের রেল যোগাযোগ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হবে।

