খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeট্রেন্ডিং নিউজসীতার ব্লাউজ কি ইতিহাসবিরোধী? জানুন প্রাচীন ভারতের নারীদের পোশাকের আসল ইতিহাস

সীতার ব্লাউজ কি ইতিহাসবিরোধী? জানুন প্রাচীন ভারতের নারীদের পোশাকের আসল ইতিহাস

ট্রেলারে সীতা, কৈকেয়ী ও শূর্পণখার পোশাকে দেখা গেছে নকশাদার, সেলাই করা ঊর্ধ্বাঙ্গের পোশাক। তার সঙ্গে রয়েছে সুন্দরভাবে কুঁচি করা শাড়ি। এই সাজ দেখে কারও মনে হয়েছে, পৌরাণিক যুগের চরিত্রদের এতটা আধুনিক পোশাকে দেখানো ঠিক হয়নি।

সীতা, কৈকেয়ী কিংবা শূর্পণখার মতো পৌরাণিক চরিত্রকে পর্দায় কেমন পোশাকে দেখানো হবে, তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। ২০২৬ সালের ফ্যান্টাসি ড্রামা ‘রামায়ণ’-এর ট্রেলার প্রকাশ্যে আসার পর দর্শকদের একাংশের প্রশ্ন, ত্রেতা যুগের কাহিনিতে নারীদের আধুনিক ধাঁচের সেলাই করা ব্লাউজ পরানো কতটা ঐতিহাসিকভাবে গ্রহণযোগ্য?

ট্রেলারে সীতা, কৈকেয়ী ও শূর্পণখার পোশাকে দেখা গেছে নকশাদার, সেলাই করা ঊর্ধ্বাঙ্গের পোশাক। তার সঙ্গে রয়েছে সুন্দরভাবে কুঁচি করা শাড়ি। এই সাজ দেখে কারও মনে হয়েছে, পৌরাণিক যুগের চরিত্রদের এতটা আধুনিক পোশাকে দেখানো ঠিক হয়নি।

কিন্তু প্রশ্নটি আসলে আরও বড়। ভারতীয় নারীরা কবে থেকে সেলাই করা ঊর্ধ্বাঙ্গের পোশাক পরতে শুরু করলেন? ব্লাউজের ইতিহাস কতটা পুরনো? আর রামায়ণের সময় নারীদের পোশাক কেমন ছিল?

আজ শাড়ির সঙ্গে ব্লাউজকে প্রায় অবিচ্ছেদ্য মনে হলেও এর ইতিহাস খুব বেশি পুরনো নয়।

প্রাচীন ভারতীয় পোশাকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সেলাইহীন কাপড়। বৈদিক যুগ থেকে দীর্ঘ সময় ধরে নারী-পুরুষ উভয়ের পোশাকেই কাপড় জড়িয়ে পরার রীতি বেশি প্রচলিত ছিল।

সাধারণভাবে নিম্নাঙ্গের পোশাক হিসেবে ব্যবহার করা হত **‘অন্তরীয়’। আর ঊর্ধ্বাঙ্গে থাকত ‘উত্তরীয়’, যা অনেকটা চাদর বা ওড়নার মতো করে শরীরে জড়ানো হত।

অর্থাৎ আজকের মতো আলাদা করে তৈরি করা ব্লাউজ বা শার্ট জাতীয় পোশাক তখন দৈনন্দিন পোশাকের স্বাভাবিক অংশ ছিল না।

প্রাচীন ভারতে নারীদের শরীর ঢাকার জন্য বিভিন্ন ধরনের বস্ত্র ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়।

এর মধ্যে ‘স্তনপট্ট’ ছিল একটি উল্লেখযোগ্য পোশাক। এটি মূলত কাপড়ের একটি সরু অংশ, যা বুকের চারপাশে জড়িয়ে বা বেঁধে রাখা হত। তার ওপর আবার উত্তরীয় জড়ানো হতে পারত।

আরও পড়ুন :  ধমনীতে কোলেস্টেরল জমা রুখতে রান্নাঘরের ৫ উপাদান, কমবে হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা

তবে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে পোশাকের ধরন এক ছিল না। সময়, অঞ্চল, সামাজিক অবস্থান এবং সম্প্রদায় অনুযায়ী পোশাকের রীতিতে পরিবর্তন দেখা গেছে।

তাই প্রাচীন ভারতীয় নারীরা সবাই একই ধরনের পোশাক পরতেন—এমন ধারণাও ঠিক নয়।

পরবর্তী সময়ে ভারতীয় পোশাকের ইতিহাসে আসে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। গুপ্ত যুগ ও মধ্যযুগে কঞ্চুকী বা কাঁচুলি ব্যবহারের নজির পাওয়া যায়।

এটি আধুনিক ব্লাউজের সঙ্গে পুরোপুরি এক নয়। বরং শরীরের ঊর্ধ্বাংশ ঢাকার জন্য ব্যবহৃত এক ধরনের বক্ষবন্ধনী বা পোশাক।

মধ্যযুগীয় ভারতীয় সাহিত্যেও নারীদের কাঁচুলি ব্যবহারের উল্লেখ রয়েছে। বাংলা সাহিত্যের চণ্ডীমঙ্গলসহ বিভিন্ন মঙ্গলকাব্যেও কাঁচুলি পরার বিবরণ পাওয়া যায়।

তবে এই পোশাক সমাজের সব স্তরের নারীর জন্য সমানভাবে প্রচলিত ছিল না।

ভারতের সামাজিক ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পোশাকের ক্ষেত্রেও শ্রেণিভেদ।

কিছু অঞ্চলে নিম্নবর্গীয় নারীদের শরীর ঢাকার জন্য একাধিক কাপড় ব্যবহারের সামাজিক অধিকারও ছিল না। তাঁরা কখনও গয়না, পুঁতি, পাতা বা অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করে ঊর্ধ্বাঙ্গ আচ্ছাদিত করতেন।

ভারতের বিভিন্ন আদিবাসী ও প্রত্যন্ত অঞ্চলেও দীর্ঘদিন ধরে শাড়ি বা একটি মাত্র কাপড় শরীরে জড়িয়ে রাখার রীতি ছিল।

এমনকি বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়েও ভারতের বহু গ্রামীণ পরিবারে নারীরা বাড়ির ভিতরে নিয়মিত ব্লাউজ পরতেন না। শাড়ির আঁচল দিয়েই ঊর্ধ্বাঙ্গ ঢেকে রাখতেন।

ভারতে শাড়ির সঙ্গে সেলাই করা পোশাক ব্যবহারের ইতিহাস ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে।

আঠারো শতকের দিকে শহরের অভিজাত পরিবারের কিছু নারী শাড়ির নিচে সেমিজ পরতে শুরু করেন বলে পোশাকের ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায়।

সেমিজ ছিল পাতলা কাপড়ের তৈরি লম্বা পোশাক। ইউরোপে এটি মূলত অন্তর্বাস হিসেবে ব্যবহৃত হলেও ভারতে তার ব্যবহার ও পরার ধরন আলাদা হয়ে যায়।

আরও পড়ুন :  এনার্জি ড্রিঙ্ক নয়! মেসির গোপন পানীয় ‘ইয়ারবা মাতে’র চমকপ্রদ উপকারিতা

এরপর ধীরে ধীরে শাড়ির সঙ্গে সেলাই করা ঊর্ধ্বাঙ্গের পোশাকের ব্যবহার বাড়তে থাকে।

শাড়ির সঙ্গে ব্লাউজ ও পেটিকোট ব্যবহারের জনপ্রিয়তার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম জ্ঞানদানন্দিনী দেবী।

তিনি ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেজ বৌঠান। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে স্বামীর কর্মসূত্রে বোম্বাইয়ে থাকার সময় তিনি পারসি নারীদের পোশাক পরার ধরন দেখেছিলেন।

সেই পোশাকের ধরন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি নিজের মতো করে শাড়ি পরার একটি নতুন পদ্ধতি তৈরি করেন। পরে সেটিই ‘ব্রাহ্মিকা শাড়ি’ নামে পরিচিত হয়।

এই শাড়ি পরার ধরনে নিচে পেটিকোট এবং উপরে সেলাই করা জ্যাকেট বা ব্লাউজ ব্যবহার করা হত।

ফলে শাড়ি পরার পদ্ধতিতে এল বড় পরিবর্তন। ধীরে ধীরে শহুরে মধ্যবিত্ত ও শিক্ষিত সমাজেও এই পোশাকের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে।

ব্লাউজ একবার শাড়ির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর সেটিও স্থির থাকেনি। সময়ের সঙ্গে বদলেছে তার নকশা, হাতা, গলার কাট এবং কাপড়।

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ব্লাউজের হাতা অনেক সময় কব্জি পর্যন্ত লম্বা থাকত। উঁচু গলা ও লেসের কাজও ছিল জনপ্রিয়।

পরে ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকে হাতা ছোট হতে শুরু করে। পাফ স্লিভও জনপ্রিয় হয়।

পরবর্তী সময়ে সিনেমা ও ফ্যাশন সংস্কৃতির প্রভাবে বোট নেক, ব্যাকলেস, টাইট-ফিটিংসহ নানা ধরনের ব্লাউজ সামনে আসে।

আজকের দিনে আবার ক্রপ টপ, ব্রালেট, অফ-শোল্ডার কিংবা কাঁচুলি-ধাঁচের পোশাকও শাড়ির সঙ্গে জনপ্রিয় হয়েছে।

অর্থাৎ ব্লাউজ নিজেই একটি দীর্ঘ ফ্যাশন বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এসেছে।

এখানেই বিতর্কের মূল জায়গা।

রামায়ণের কাহিনির সময়কালকে প্রচলিত হিন্দু যুগবিভাগ অনুযায়ী ত্রেতা যুগে স্থাপন করা হয়। কিন্তু ত্রেতা যুগে ঠিক কী ধরনের পোশাক প্রচলিত ছিল, তার নির্ভুল ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।

আরও পড়ুন :  ভালোবাসার জয়! ৭ বছরের নিরলস সেবার পর স্বামীর মুখে প্রথম শব্দ ‘আই লাভ ইউ’

রামায়ণের কাহিনি বহু শতাব্দী ধরে মৌখিক ও লিখিত ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন লেখক ও কবি এই কাহিনিকে নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে উপস্থাপন করেছেন।

বাল্মীকি রামায়ণ, কৃত্তিবাসী রামায়ণ কিংবা তুলসীদাসের রামচরিতমানস সব ক্ষেত্রেই বর্ণনা ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে পার্থক্য রয়েছে।

তাই আধুনিক সিনেমায় রামায়ণের চরিত্রদের পোশাককে একেবারে নির্ভুল ঐতিহাসিক পোশাক হিসেবে বিচার করা বেশ কঠিন।

পৌরাণিক কাহিনিকে সিনেমায় রূপ দেওয়ার সময় নির্মাতাদের সামনে দুটি বিষয় থাকে। একদিকে থাকে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বিশ্বাসযোগ্যতা, অন্যদিকে থাকে আধুনিক দর্শকের কাছে চরিত্রকে দৃশ্যত আকর্ষণীয় করে তোলার প্রয়োজন।

সিনেমার পোশাক তাই সবসময় ইতিহাসের হুবহু প্রতিলিপি হয় না।

‘রামায়ণ’-এর ট্রেলারে সীতা বা কৈকেয়ীকে সেলাই করা ব্লাউজ পরানো হয়েছে বলে সেটিকে সরাসরি ‘ভুল’ বলা যেমন কঠিন, তেমনই সেটিকে ত্রেতা যুগের নির্ভুল পোশাক বলাও ঠিক হবে না।

কারণ রামায়ণের ঐতিহাসিক সময়কাল এবং সেই সময়ের পোশাক সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্যের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

সবশেষে বলা যায়, সীতা-কৈকেয়ীর ব্লাউজ নিয়ে বিতর্ক যতটা পোশাকের, তার চেয়ে বেশি ইতিহাস বনাম সিনেমাটিক কল্পনার। দর্শক চাইলে ঐতিহাসিক নির্ভুলতার প্রশ্ন তুলতেই পারেন। আবার নির্মাতারাও নিজেদের শিল্পীসত্তা অনুযায়ী চরিত্রের পোশাক কল্পনা করতে পারেন।

কারণ পৌরাণিক কাহিনি যখন আধুনিক সিনেমার পর্দায় আসে, তখন সেটি কেবল ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি থাকে না তার সঙ্গে যুক্ত হয় শিল্প, কল্পনা এবং সমকালীন দর্শকের দৃষ্টিভঙ্গিও।

আর্কাইভ