শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) নবীন শিক্ষার্থীদের র্যাগিংয়ের নামে অশালীন ও মানসিকভাবে আঘাতমূলক কর্মকাণ্ডে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ভর্তি হওয়া প্রথম বর্ষের চার শিক্ষার্থীকে কয়েক ঘণ্টা আটকে রেখে বিভিন্ন ধরনের অভিনয়, নাচ ও অশালীন আচরণে বাধ্য করার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর অংশ হিসেবে উঠে এসেছে চেয়ারকে ‘মেয়ে’ কল্পনা করে একজন নবীন শিক্ষার্থীকে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কবিতার তালে অভিনয় করতে বাধ্য করার ঘটনা। এ ঘটনায় ক্যাম্পাসে ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একজন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী দাবি করেছেন, ঘটনার পর তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন এবং এখনো সেই অভিজ্ঞতার ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারেননি।
গত সোমবার (১০ আগস্ট) রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দ মুজতবা আলী হলের কাছাকাছি বড়গুল রিপন ছাত্রাবাসে এ ঘটনা ঘটে। সেখানে শাবিপ্রবির প্রথম বর্ষের চার শিক্ষার্থীকে প্রায় চার ঘণ্টা আটকে রেখে র্যাগিং করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
ভুক্তভোগীদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথমে তাদের বিভিন্ন ধরনের নাচ করতে বলা হয়। কেউ নির্দেশ অনুযায়ী অভিনয় করতে গিয়ে হাসলে কিংবা ভুল করলে তাকে শাস্তিস্বরূপ অস্বস্তিকর ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকতে বলা হয়। পরে তাদের দিয়ে নানা ধরনের কান্নার অভিনয়ও করানো হয়।
এরপর র্যাগিংয়ের ধরন আরও আপত্তিকর হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, একজনকে গামছার মাধ্যমে মেয়ে এবং অন্যজনকে ছেলে সাজিয়ে প্রপোজ করার অভিনয় করানো হয়। একই সঙ্গে তাদের বিভিন্ন অশালীন ও প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী কবিতা উচ্চস্বরে পড়তে বাধ্য করা হয়।
ভুক্তভোগীদের একজন জানিয়েছেন, তাকে একটি চেয়ারের সামনে দাঁড় করিয়ে চেয়ারটিকে একজন মেয়ের মতো কল্পনা করতে বলা হয়। এরপর যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কবিতার তালে তালে তাকে অভিনয় করতে বাধ্য করা হয়।
ওই শিক্ষার্থীর ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতিটি তার জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর ও মানসিকভাবে কষ্টদায়ক ছিল। তিনি কান্নায় ভেঙে পড়লেও অভিযুক্ত সিনিয়ররা তাকে অভিনয় চালিয়ে যেতে চাপ দেন বলে অভিযোগ করেছেন।
ঘটনার পর থেকে তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন বলেও দাবি করেন। তার ভাষ্য, র্যাগিংয়ের ওই অভিজ্ঞতা এখনো তার মনে ভয় ও অস্বস্তি তৈরি করছে।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে নতুন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পরিবর্তে এ ধরনের অপমানজনক ও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ আচরণ করা হলে তা শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ঘটনায় ছয়জন সিনিয়র শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। তারা হলেন ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের বাংলা বিভাগের গোলজার, ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের অর্থনীতি বিভাগের সোলাইমান, ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিল্প ও উৎপাদন প্রকৌশল বিভাগের সাব্বির, একই শিক্ষাবর্ষের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের মারুফ ও আবু রায়হান এবং পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের তীব্র।
অন্যদিকে অভিযোগকারী চার শিক্ষার্থী হলেন সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের নাসির, শিল্প ও উৎপাদন প্রকৌশল বিভাগের মো. গোলাম মোর্শেদ ও শাহাদাত হোসেন সাগর এবং বাংলা বিভাগের জিয়াউর রহমান। তারা সবাই ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ভুক্তভোগী জানান, এক সিনিয়র শিক্ষার্থীর জন্মদিন উপলক্ষে তাদের বসার কথা বলে ডেকে নেওয়া হয়েছিল। পরে সেখানে থাকা ছয় সিনিয়র শিক্ষার্থী তাদের র্যাগিং শুরু করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তার দাবি, প্রথমে চার নবীন শিক্ষার্থীকে নাচতে বাধ্য করা হয়। কেউ ভুল করলে বা হাসলে তাকে শাস্তি দেওয়া হতো। এরপর তাদের দিয়ে বিভিন্ন ধরনের কান্নার অভিনয় করানো হয়।
পরে পরিস্থিতি আরও অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে বলে দাবি করেন ওই শিক্ষার্থী। তার ভাষ্য অনুযায়ী, একজনকে গামছা ব্যবহার করে মেয়ে এবং অন্যজনকে ছেলে সাজিয়ে প্রপোজ করার অভিনয় করানো হয়। পাশাপাশি যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ শব্দ উচ্চারণ ও অশালীন কবিতা পড়তে বাধ্য করা হয়।
আরেক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, তাকে একটি চেয়ারকে নারী হিসেবে কল্পনা করে অভিনয় করতে বলা হয়। তিনি এতে অস্বস্তি প্রকাশ করলেও তাকে বারবার চাপ দেওয়া হয়। এ ঘটনার কারণে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন বলে জানান।
অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাদের কয়েকজন বক্তব্য দিয়েছেন।
অভিযুক্ত আবু রায়হান জানান, তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তবে অভিযোগে উল্লেখ করা সব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন না বলে দাবি করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, শিল্প ও উৎপাদন প্রকৌশল বিভাগের সাব্বির এসব কর্মকাণ্ড করেছেন।
অভিযুক্ত সোলাইমান কবিরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন কেটে দেন। সাব্বিরের কাছেও অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনিও ফোন কেটে দেন।
অন্য অভিযুক্ত মারুফ বলেন, তাদের নিজেদের মধ্যে বিষয়টি সমাধান করে নেওয়া হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তবে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ এবং কারা কোন ঘটনায় জড়িত ছিলেন, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়।
ঘটনার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মোখলেসুর রহমানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
তবে সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক বেলাল হোসেন শিকদার জানান, বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে অভিযোগ এসেছে। এ বিষয়ে বসে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

