বুক ধড়ফড় করা, সামান্য পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে যাওয়া, রাতে অস্বাভাবিক ঘাম হওয়া কিংবা সিঁড়ি ভাঙার সময় বুকে চাপ অনুভব—এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে অনেকেরই প্রথমে মনে হয়, একটি ইসিজি করালেই হয়তো হৃদ্যন্ত্রের অবস্থা জানা যাবে। চিকিৎসকের পরামর্শে ইসিজি করানো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু এই একটি পরীক্ষার রিপোর্ট স্বাভাবিক এলেই যে হৃদ্যন্ত্র পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত, তা নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসিজি হৃদ্রোগ নির্ণয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক পরীক্ষা হলেও এটি হৃদ্যন্ত্রের সব ধরনের সমস্যা শনাক্ত করতে পারে না। বিশেষ করে কোনও ব্যক্তির করোনারি ধমনিতে সংকোচন বা ব্লকেজ থাকলেও বিশ্রামের সময় করা ইসিজিতে তা সবসময় ধরা পড়ে না।
তাই হৃদ্রোগের ঝুঁকি বোঝার ক্ষেত্রে শুধু ইসিজির উপর নির্ভর না করে ব্যক্তির বয়স, পারিবারিক ইতিহাস, রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, রক্তে শর্করার মাত্রা, ধূমপানের অভ্যাস, ওজন এবং শারীরিক উপসর্গ—সবকিছু বিবেচনা করা জরুরি।
ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম বা ইসিজি হৃদ্যন্ত্রের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপের একটি রেকর্ড। হৃদ্যন্ত্র যখন স্পন্দিত হয়, তখন তার মধ্যে বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি হয়। ইসিজির মাধ্যমে সেই সংকেতের পরিবর্তন দেখা যায়।
এই পরীক্ষায় হৃদ্স্পন্দনের গতি ও ছন্দ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। অনিয়মিত হৃদ্স্পন্দন, কিছু ধরনের রিদমের সমস্যা, আগের হার্ট অ্যাটাকের কিছু চিহ্নসহ বেশ কিছু অস্বাভাবিকতা ইসিজিতে ধরা পড়তে পারে।
তবে সমস্যা হলো, ইসিজি মূলত পরীক্ষার সময়কার বৈদ্যুতিক কার্যকলাপের একটি ছবি দেয়। ফলে হৃদ্যন্ত্রের রক্তনালিতে থাকা সব ধরনের সংকোচন বা ব্লকেজ এই পরীক্ষায় ধরা পড়বে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
অর্থাৎ, কারও ইসিজি স্বাভাবিক হলেও তার হৃদ্রোগের ঝুঁকি একেবারে শূন্য হয়ে যায় না।
হৃদ্যন্ত্রে রক্ত সরবরাহ করে করোনারি ধমনী। এই ধমনিতে চর্বি, কোলেস্টেরল ও অন্যান্য পদার্থ জমে ধীরে ধীরে সংকোচন তৈরি হতে পারে। অনেক সময় এই সমস্যা শুরুতে কোনও স্পষ্ট উপসর্গও তৈরি করে না।
বিশ্রামের সময় করা ইসিজি স্বাভাবিক আসতে পারে, অথচ শারীরিক পরিশ্রমের সময় হৃদ্যন্ত্রের বেশি অক্সিজেন প্রয়োজন হলে সমস্যা প্রকাশ পেতে পারে।
তাই বুক ধড়ফড়, বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা অস্বাভাবিক ক্লান্তির মতো উপসর্গ থাকলে শুধু একটি স্বাভাবিক ইসিজি দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে যাওয়াটা ঠিক নয়।
কারও পরিবারে অল্প বয়সে হৃদ্রোগের ইতিহাস থাকলে কিংবা ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল বা ধূমপানের মতো ঝুঁকি থাকলেও চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত পরীক্ষা করা হতে পারে।
হৃদ্রোগের ঝুঁকি মূল্যায়নে আলোচিত রক্ত পরীক্ষাগুলোর মধ্যে সি-রিঅ্যাকটিভ প্রোটিন বা CRP অন্যতম। শরীরে কোথাও প্রদাহ বা ইনফ্ল্যামেশন হলে রক্তে CRP-এর মাত্রা বেড়ে যেতে পারে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার—CRP বেড়ে গেলেই যে হৃদ্রোগ হয়েছে, এমন নয়। শরীরে সংক্রমণ বা অন্য কোনও প্রদাহজনিত সমস্যার কারণেও CRP বাড়তে পারে।
বিশেষ ধরনের পরীক্ষা, যেমন high-sensitivity CRP বা hs-CRP, কিছু ক্ষেত্রে হৃদ্রোগের ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মূল্যায়নে ব্যবহার করা হয়। চিকিৎসকেরা সাধারণত অন্যান্য ঝুঁকির সঙ্গে এই পরীক্ষার ফল মিলিয়ে দেখেন।
তাই শুধু CRP-এর একটি সংখ্যা দেখে নিজের হৃদ্রোগের ঝুঁকি নির্ধারণ করা উচিত নয়।
CRP মূলত শরীরে প্রদাহের মাত্রা সম্পর্কে ধারণা দেয়। হৃদ্যন্ত্রের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ রক্তনালির সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
তবে CRP-এর মাত্রা কেন বেড়েছে, সেটিও বোঝা জরুরি। কোনও সংক্রমণ বা সাময়িক প্রদাহ থাকলে পরীক্ষার ফল পরিবর্তিত হতে পারে।
এই কারণে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া শুধু CRP রিপোর্ট হাতে নিয়ে হৃদ্রোগের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।
হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুস শরীরের দৈনন্দিন কাজের সময় কতটা কার্যকরভাবে কাজ করছে, তা বোঝার জন্য কিছু ক্ষেত্রে ছয় মিনিট হাঁটার পরীক্ষা বা Six-Minute Walk Test ব্যবহার করা হয়।
এই পরীক্ষায় নির্দিষ্ট সময় ধরে একজন ব্যক্তিকে হাঁটানো হয় এবং তিনি কতটা দূরত্ব অতিক্রম করতে পারছেন, হাঁটার সময় শ্বাসকষ্ট হচ্ছে কি না, বুকে অস্বস্তি হচ্ছে কি না কিংবা অতিরিক্ত ক্লান্তি দেখা দিচ্ছে কি না—এসব বিষয় পর্যবেক্ষণ করা হয়।
এটি বিশেষ করে কিছু হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসের রোগে রোগীর শারীরিক সক্ষমতা মূল্যায়নে কাজে লাগতে পারে।
তবে সবার জন্য একই দূরত্বকে ‘স্বাভাবিক’ ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বয়স, উচ্চতা, শারীরিক সক্ষমতা, পূর্বের রোগ এবং অন্যান্য শারীরিক অবস্থার উপর হাঁটার সক্ষমতা নির্ভর করে।
তাই ছয় মিনিটে কত মিটার হাঁটলেন, শুধু সেই সংখ্যার ভিত্তিতে হৃদ্যন্ত্র সুস্থ বা অসুস্থ বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
ছয় মিনিট হাঁটার সময় শুধু দূরত্ব নয়, শরীরের প্রতিক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
হাঁটার সময় যদি বুকে চাপ বা ব্যথা, অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত দুর্বলতা কিংবা অস্বাভাবিক বুক ধড়ফড় শুরু হয়, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
এ ধরনের উপসর্গ থাকলে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী আরও পরীক্ষা করতে পারেন।
বিশেষ করে আগে থেকেই হৃদ্রোগের ঝুঁকি থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে নিজের ইচ্ছায় কঠিন শারীরিক পরীক্ষা করার বদলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
ধমনিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের সঙ্গে হৃদ্রোগের সম্পর্ক নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চলছে। বিভিন্ন ধরনের inflammatory marker বা প্রদাহের সূচক পরীক্ষা করে শরীরে প্রদাহজনিত অবস্থার কিছু ধারণা পাওয়া যায়।
তবে ‘ইনফ্ল্যামেটরি মার্কার টেস্ট’ নামে একটি নির্দিষ্ট পরীক্ষা দিয়ে একাই হৃদ্রোগের উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায় না।
CRP বা hs-CRP-এর মতো নির্দিষ্ট পরীক্ষার পাশাপাশি চিকিৎসকেরা রোগীর অন্যান্য ঝুঁকি ও পরীক্ষার ফল বিবেচনা করেন।
তাই ৪০ বছর বয়স পার হলেই প্রত্যেক ব্যক্তিকে একই ধরনের পরীক্ষা করাতে হবে—এমন সাধারণ নিয়ম নেই। কার কোন পরীক্ষা প্রয়োজন, তা বয়স, উপসর্গ এবং ঝুঁকির ওপর নির্ভর করে।
হৃদ্রোগের ঝুঁকি মূল্যায়নে ইসিজির পাশাপাশি রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা পরীক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর জন্য লিপিড প্রোফাইল করা হয়।
LDL কোলেস্টেরল, HDL কোলেস্টেরল, ট্রাইগ্লিসারাইডসহ বিভিন্ন মান দেখে চিকিৎসক হৃদ্রোগের ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা নিতে পারেন।
এছাড়া রক্তে শর্করার মাত্রাও গুরুত্বপূর্ণ। ডায়াবেটিস হৃদ্রোগের একটি বড় ঝুঁকি। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী ফাস্টিং ব্লাড সুগার বা HbA1c-এর মতো পরীক্ষা করা হতে পারে।
ইকোকার্ডিয়োগ্রাম বা ইকো হলো হৃদ্যন্ত্রের আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষা। এর মাধ্যমে হৃদ্যন্ত্রের গঠন ও কাজ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।
হৃদ্যন্ত্রের পাম্প করার ক্ষমতা, ভাল্ভের কার্যকারিতা এবং কিছু ধরনের কাঠামোগত সমস্যা ইকোর মাধ্যমে দেখা যায়।
তবে ইকোও সব ধরনের করোনারি ব্লকেজ শনাক্ত করার পরীক্ষা নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক স্ট্রেস টেস্ট, সিটি করোনারি অ্যাঞ্জিওগ্রাফি বা অন্য কোনও পরীক্ষা বিবেচনা করতে পারেন।
যাঁদের পরিবারে অল্প বয়সে হৃদ্রোগের ইতিহাস রয়েছে, তাঁদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
এছাড়া উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, ধূমপান, স্থূলতা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং দীর্ঘদিনের অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তবে বয়স কম হলেই হৃদ্রোগ হবে না—এমন নিশ্চয়তাও নেই। বর্তমানে তুলনামূলক কম বয়সী মানুষের মধ্যেও হৃদ্রোগের ঘটনা সামনে আসছে।
তাই বয়সের উপর নির্ভর করে নিশ্চিন্ত না হয়ে নিজের ঝুঁকিগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।
হঠাৎ বুকের মাঝখানে চাপ বা ব্যথা, ব্যথা হাত, কাঁধ, পিঠ বা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়া, শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, বমি বমি ভাব কিংবা অস্বাভাবিক দুর্বলতা—এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে বিষয়টি জরুরি হিসেবে নিতে হবে।
বিশেষ করে কয়েক মিনিট ধরে উপসর্গ থাকলে বা বারবার ফিরে এলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
শুধু আগের কোনও স্বাভাবিক ইসিজি রিপোর্টের উপর নির্ভর করে অপেক্ষা করা ঠিক নয়। কারণ হৃদ্রোগের পরিস্থিতি সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে।
শুধু নিয়মিত পরীক্ষা করালেই হৃদ্রোগের ঝুঁকি পুরোপুরি এড়ানো যায় না। জীবনযাপনও এখানে বড় ভূমিকা রাখে।
নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, পরিমিত খাবার, অতিরিক্ত লবণ ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি কমানো, ধূমপান এড়ানো, পর্যাপ্ত ঘুম এবং ওজন নিয়ন্ত্রণ হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
যাঁদের উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস রয়েছে, তাঁদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তা নিয়ন্ত্রণে রাখা দরকার।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিজের শরীরের অস্বাভাবিক পরিবর্তনকে অবহেলা না করা।
ইসিজি হৃদ্রোগ নির্ণয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং সহজলভ্য পরীক্ষা। কিন্তু ইসিজি স্বাভাবিক মানেই হৃদ্যন্ত্রে কোনও সমস্যা নেই—এমন ধারণা ঠিক নয়।
CRP বা hs-CRP, প্রয়োজন অনুযায়ী ছয় মিনিট হাঁটার পরীক্ষা এবং অন্যান্য প্রদাহজনিত সূচক হৃদ্রোগের ঝুঁকি মূল্যায়নে কিছু ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। এর পাশাপাশি লিপিড প্রোফাইল, রক্তে শর্করা, ইকোকার্ডিয়োগ্রামসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী করা যেতে পারে।
তবে কোনও একটি পরীক্ষার ফল দেখে নিজে নিজে হৃদ্রোগের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। উপসর্গ, বয়স, পারিবারিক ইতিহাস এবং অন্যান্য ঝুঁকি বিবেচনা করেই চিকিৎসক ঠিক করবেন কোন পরীক্ষা প্রয়োজন।
হৃদ্যন্ত্রের ক্ষেত্রে সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো—উপসর্গকে গুরুত্ব দেওয়া, ঝুঁকির বিষয়গুলো জানা এবং প্রয়োজন হলে সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।

