যুদ্ধের আবহ, জ্বালানি নিয়ে উদ্বেগ এবং বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তার মধ্যেই ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে ‘বিকশিত ভারত’-এ পরিণত করার লক্ষ্য আরও একবার সামনে আনলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লা থেকে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, ভারতকে আর ছোট লক্ষ্য নিয়ে এগোলে হবে না। দেশের ভবিষ্যতের জন্য বড় স্বপ্ন দেখতে হবে এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে আত্মনির্ভর ভারত, দেশীয় উৎপাদন, প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতার বিষয়। একইসঙ্গে গত ১২ বছরে ভারতের অগ্রগতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরে তিনি দাবি করেন, দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে এবং ভারত দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনীতির দিকে এগিয়ে চলেছে।
লালকেল্লার মঞ্চ থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, ছোট স্বপ্ন নিয়ে আর এগিয়ে চলার সময় নেই। ভারতের সামনে এখন বড় লক্ষ্য নির্ধারণের সময় এসেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বড় স্বপ্ন মানুষের চিন্তার পরিধি বাড়ায় এবং কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও নতুন পথ খুঁজে নেওয়ার শক্তি তৈরি করে।
তিনি বলেন, একটি দেশ তখনই বড় লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে, যখন তার নাগরিকদের মধ্যে স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা, দৃঢ় সংকল্প এবং নিজেদের সামর্থ্যের ওপর আস্থা থাকে। প্রতিকূলতা যতই কঠিন হোক, সংকল্প অটুট থাকলে সেখান থেকেও এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করা সম্ভব।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের অবদানের কথাও তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, দলিত, প্রান্তিক মানুষ থেকে শুরু করে গ্রাম ও শহরের বাসিন্দা, দরিদ্র, মধ্যবিত্ত, যুবক, প্রবীণ, নারী ও পুরুষ—দেশের সব অংশের মানুষ নিজেদের জায়গা থেকে ভারতের অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখছেন।
ভারতের স্বাধীনতার ১০০ বছর পূর্তিকে সামনে রেখে ২০৪৭ সালের মধ্যে দেশকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়েছে মোদি সরকার। স্বাধীনতা দিবসের ভাষণেও সেই ‘বিকশিত ভারত’ পরিকল্পনার কথা সামনে আনেন প্রধানমন্ত্রী।
গত ১২ বছরের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের উল্লেখ করে তিনি জানান, এই সময়ে দেশের অর্থনীতি ও অবকাঠামোসহ একাধিক ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছে। তাঁর দাবি, প্রায় ২৫ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার বাইরে উঠে এসেছেন।
প্রধানমন্ত্রী আরও দাবি করেন, ভারত বর্তমানে বিশ্বের দ্রুততম উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর অন্যতম। তাঁর বক্তব্যে পরিষ্কার, আগামী দিনের ভারতের অর্থনৈতিক শক্তিকে আরও বাড়ানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করাও সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রতিরক্ষা খাতের উৎপাদন নিয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর দাবি, গত কয়েক বছরে ভারতে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় চার গুণ বেড়েছে।
দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে বিদেশের ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, শুধু বড় অস্ত্র বা সামরিক সরঞ্জাম তৈরি করলেই হবে না। ছোট যন্ত্রাংশ থেকে শুরু করে বড় পণ্য—সবকিছু দেশের মাটিতে উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
একইসঙ্গে পণ্যের মানের সঙ্গে কোনও আপস না করার ওপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতের তৈরি পণ্য শুধু দেশের বাজারে ব্যবহারের জন্য নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রতিযোগিতা করার মতো মানসম্পন্ন হতে হবে।
মোদি তাঁর ভাষণে ‘আত্মনির্ভর ভারত’ বা Atmanirbhar Bharat-এর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
দেশকে দীর্ঘদিন অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীল করে রাখা যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’, ‘স্বদেশি’ এবং ‘লোকাল ফর লোকাল’-এর মতো উদ্যোগের মাধ্যমে দেশীয় উৎপাদনকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা ছিল, ভারতীয় নাগরিকদের নিজেদের দেশের তৈরি পণ্য ব্যবহারে উৎসাহিত করতে হবে এবং একইসঙ্গে দেশীয় শিল্পকে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার উপযোগী করে তুলতে হবে।
প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান বিশ্বে সেমিকন্ডাক্টর বা চিপের গুরুত্বের কথাও উঠে আসে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে। মোদি বলেন, আধুনিক বিশ্বের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থার সঙ্গেই চিপ প্রযুক্তি জড়িয়ে রয়েছে।
স্মার্টফোন, কম্পিউটার, গাড়ি, চিকিৎসা সরঞ্জাম থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক পণ্য তৈরিতে সেমিকন্ডাক্টর অপরিহার্য। ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে বিদেশের ওপর নির্ভরতা কমানো ভারতের জন্য কৌশলগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রী জানান, ভারতে ইতিমধ্যে কয়েকটি বড় সেমিকন্ডাক্টর কারখানা স্থাপনের কাজ এগিয়েছে এবং উৎপাদন শুরুর কথাও তাঁকে জানানো হয়েছে। আগামী কয়েক বছরে আরও কয়েকটি সেমিকন্ডাক্টর কারখানা চালু করার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
বিশ্বের প্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক্স শিল্পে ভারতের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাজার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের প্রভাবেও জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই মোদি বলেন, আন্তর্জাতিক সংকটের সময় ভারতকে নিজের প্রয়োজন মেটানোর মতো সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। জ্বালানি থেকে সার—প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহে সম্ভাব্য সমস্যার মোকাবিলায় ভারত প্রস্তুত রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বিরোধীদের সমালোচনা করে বলেন, যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হলে দেশে গ্যাস পাওয়া যাবে না, পেট্রল পাম্পে জ্বালানি থাকবে না কিংবা কৃষকরা ইউরিয়া পাবেন না—এমন আশঙ্কা ছড়ানো হয়েছিল। কিন্তু তাঁর দাবি, সাধারণ মানুষের যাতে এসব সমস্যার মুখে পড়তে না হয়, সে জন্য সরকার আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছিল।
মোদির বক্তব্যে কৃষকদের প্রসঙ্গও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পায়। সার, বিশেষ করে ইউরিয়া সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, কৃষকদের প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে সংকটের সময়ে দেশের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা। তাঁর মতে, বিশ্ব পরিস্থিতি যতই অস্থির হোক, ভারতের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে স্থিতিশীল রাখতে দেশকে নিজেদের শক্তির ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে হবে।
মোদির ভাষণের সামগ্রিক বার্তায় স্পষ্ট, ২০৪৭ সালের ‘বিকশিত ভারত’ গড়তে প্রযুক্তি, শিল্প, প্রতিরক্ষা, কৃষি এবং দেশীয় উৎপাদনকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে চায় তাঁর সরকার।
বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এবং শিল্প উৎপাদনে স্বনির্ভরতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি ভারতীয় পণ্যের গুণমান বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা তৈরি করার কথাও বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতের ভবিষ্যৎ শুধু বড় অর্থনীতির দেশ হওয়ায় সীমাবদ্ধ নয়। দেশকে এমনভাবে এগিয়ে নিতে হবে, যাতে সংকটের সময় প্রয়োজনীয় পণ্য ও প্রযুক্তির জন্য অন্য দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করতে না হয়।
লালকেল্লা থেকে মোদির এই ভাষণে তাই একদিকে যেমন ২০৪৭ সালের ‘বিকশিত ভারত’-এর স্বপ্ন সামনে এসেছে, অন্যদিকে যুদ্ধ ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সময়ে আত্মনির্ভর ভারত গড়ার বার্তাও জোরালো হয়েছে। বড় স্বপ্ন, দৃঢ় সংকল্প এবং নিজস্ব সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়েই ভারতকে আগামী দিনের আরও শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী।

