গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের কাছে মাত্র ৪৮ ঘণ্টারও কম সময়ে পৃথক অভিযানে ২০২ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করেছে দেশটির কোস্ট গার্ড। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অর্ধশতাধিক বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন। এছাড়াও সুদান ও মিসরের নাগরিকদেরও উদ্ধার করা হয়েছে।
লিবিয়া উপকূল থেকে ছোট নৌকায় করে ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করছিলেন তাঁরা। সমুদ্রপথে বিপজ্জনক এই যাত্রার সময় নৌকাগুলির অবস্থান শনাক্ত হওয়ার পর গ্রিসের কোস্ট গার্ড ও ইউরোপীয় সীমান্ত সংস্থা ফ্রন্টেক্স যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে।
গ্রিক সংবাদমাধ্যম ডিমোক্রেটিয়ার বরাত দিয়ে মিডল ইস্ট মনিটরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার সকালে ক্রিটের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের আইয়েরাপেত্রা এলাকার কাছে একটি নৌকার সন্ধান পায় ফ্রন্টেক্সের একটি বিমান।
নৌকাটিতে তখন ৪০ জন অভিবাসী ছিলেন।
বিষয়টি জানার পর গ্রিক কোস্ট গার্ড দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। উদ্ধার অভিযানে একটি মাছ ধরার নৌকাও সহায়তা করে। শেষ পর্যন্ত নৌকায় থাকা প্রত্যেককেই নিরাপদে উদ্ধার করা হয়।
এরপর তাঁদের আইয়েরাপেত্রা বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে শুরু হয় পরিচয় যাচাই এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া।
৪০ জনকে উদ্ধারের কয়েক ঘণ্টা আগেই ক্রিটের কাছে আরও দুটি নৌকা থেকে মোট ১১২ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করা হয়েছিল।
প্রথম নৌকায় ছিলেন ৫৬ জন। তাঁদের মধ্যে ৩১ জন সুদানের নাগরিক এবং ২৫ জন বাংলাদেশি।
দ্বিতীয় নৌকাতেও ছিলেন ৫৬ জন। তাঁদের মধ্যে ৪৭ জন বাংলাদেশি এবং ৯ জন মিসরের নাগরিক ছিলেন।
পরবর্তীতে আরও ৪০ জনকে উদ্ধার করায় ৪৮ ঘণ্টারও কম সময়ে উদ্ধার হওয়া অভিবাসীর মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ২০২ জনে।
উদ্ধার হওয়া অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশিদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।
প্রথম দুই নৌকা থেকেই মোট ৭২ জন বাংলাদেশি নাগরিককে উদ্ধার করা হয়। এর সঙ্গে পরবর্তী ৪০ জনের জাতীয়তার বিস্তারিত তথ্য আলাদা করে উল্লেখ করা হয়নি।
এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিচ্ছে, লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টায় বাংলাদেশি নাগরিকদের একটি অংশও ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথ ব্যবহার করছেন।
উদ্ধার করার পর অভিবাসীদের ক্রিটের হেরাক্লিয়ন বন্দরের একটি অস্থায়ী আবাসনকেন্দ্রে রাখা হয়েছে।
সেখানে তাঁদের পরিচয় যাচাই এবং পরবর্তী প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তাঁদের সাময়িক থাকার ব্যবস্থা নিয়েও কাজ করছে স্থানীয় প্রশাসন।
ক্রিটে সাম্প্রতিক সময়ে অভিবাসীদের আগমন বেড়ে যাওয়ায় তাঁদের আশ্রয়, খাবার, চিকিৎসা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ বাড়ছে।
উত্তর আফ্রিকার লিবিয়া উপকূল থেকে ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে ক্রিট দ্বীপের দক্ষিণ উপকূল এই অভিবাসন রুটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
লিবিয়া থেকে যাত্রা করা নৌকাগুলি তুলনামূলক ছোট এবং অনেক ক্ষেত্রেই সমুদ্রযাত্রার জন্য নিরাপদ নয়। ফলে মাঝসমুদ্রে নৌকা বিকল হওয়া, জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়া কিংবা খারাপ আবহাওয়ার মতো নানা বিপদের মুখে পড়েন যাত্রীরা।
এই কারণেই ক্রিটের উপকূলে গ্রিক কোস্ট গার্ডকে প্রায় নিয়মিত উদ্ধার অভিযানে নামতে হচ্ছে।
অভিবাসীদের অনেকেই উন্নত জীবন, কর্মসংস্থান এবং নিরাপদ ভবিষ্যতের আশায় ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু বৈধ পথে ইউরোপে প্রবেশের সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেকেই পাচারকারীদের সাহায্যে বিপজ্জনক সমুদ্রপথ বেছে নেন।
ছোট নৌকায় অতিরিক্ত মানুষ তোলা হয়। পর্যাপ্ত খাবার, পানি বা নিরাপত্তা সরঞ্জামও অনেক সময় থাকে না। ফলে যাত্রাপথেই তৈরি হয় প্রাণহানির ঝুঁকি।
তবু উন্নত জীবনের আশায় অনেকে এই ভয়ংকর পথ বেছে নিচ্ছেন।
ক্রিটের আশপাশে অভিবাসীদের নৌকা শনাক্ত করতে গ্রিক কোস্ট গার্ডের পাশাপাশি ফ্রন্টেক্সও নজরদারি চালায়। আকাশপথে নজরদারি থেকে নৌকাগুলির অবস্থান শনাক্ত করা হলে দ্রুত উদ্ধারকারী দল পাঠানো হয়।
সাম্প্রতিক ৪৮ ঘণ্টায় ২০২ জনকে নিরাপদে উদ্ধার করা সেই সমন্বিত তৎপরতারই উদাহরণ।
তবে উদ্ধার হওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকায় ক্রিটের স্থানীয় পরিকাঠামোর ওপর চাপও বাড়ছে। ভবিষ্যতে এই অভিবাসন পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, সেটিই এখন গ্রিসের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

