খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img

বিদ্যুত চুক্তি বাতিল হচ্ছেনা,দাম কমাতে চলছে আলোচনা: জ্বালানিমন্ত্রী

বিগত সরকারের সময় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি এখনই বাতিল করার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে সরকার। কারণ এসব চুক্তির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে...
Homeদেশজুড়েটেকনাফে অপহরণ ও গোলাগুলির আতঙ্ক: এলাকা ছাড়ছে মানুষ

টেকনাফে অপহরণ ও গোলাগুলির আতঙ্ক: এলাকা ছাড়ছে মানুষ

সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের হন না। শিশুদের খেলাধুলা বন্ধ হয়ে গেছে, নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং বয়স্করা প্রতিনিয়ত উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

কক্সবাজারের টেকনাফ দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরনের নিরাপত্তা সংকট, মাদক পাচার, সীমান্তকেন্দ্রিক অপরাধ এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতার কারণে আলোচনায় রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের কচ্ছপিয়া ও নোয়াখালী পাহাড়ঘেঁষা
এলাকায় যে অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, তা এলাকার বাসিন্দাদের মনে নতুন করে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। দিনে ও রাতে গোলাগুলি, অপহরণ এবং মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনায় এখানে বসবাসরত মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অচল হওয়ার উপক্রম। পরিস্থিতি এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, বেশরি ভাগ পরিবার তাদের বাড়িঘর ফেলে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। শুধু সাধারণ মানুষই নয় ভয় পাচ্ছে তা নয়, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক মাস ধরে বাহারছড়া ইউনিয়নের পাহাড়ঘেঁষা এলাকাগুলোতে রাতের বেলায় প্রায় নিয়মিত গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের হন না। শিশুদের খেলাধুলা বন্ধ হয়ে গেছে, নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং বয়স্করা প্রতিনিয়ত উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। একসময় যেখানে সন্ধ্যার পরও মানুষের স্বাভাবিক চলাফেরা ছিল, সেখানে এখন রাত নামলেই পুরো এলাকায় নেমে আসে ভয়ের পরিবেশ।

অপহরণের ঘটনা স্থানীয় মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সম্প্রতি বাহারছড়া ইউনিয়নের উত্তর নয়াপাড়া এলাকায় পাহাড়ের পাদদেশ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশু আরাফাতকে অস্ত্রধারীরা অপহরণ করে নিয়ে যায়। পরিবারের সদস্যরা পরে মুক্তিপণ দিয়ে তাকে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন। তবে এমন ঘটনা স্থানীয়দের মনে গভীর আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। কারণ একটি শিশুও যখন নিরাপদ নয়, তখন সাধারণ মানুষ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ছেন।

আরও পড়ুন :  রেকর্ড ভেঙ্গে পাগলা মসজিদের দানবাক্সে মিলল প্রায় ১৬ কোটি টাকা

এর আগেও একই ইউনিয়নের নোয়াখালী জুম্মাপাড়া এলাকায় সশস্ত্র ব্যক্তিরা একটি বাড়িতে ঢুকে চিকিৎসক কামাল উদ্দিনকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, এমন ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়; বরং ক্রমেই নিয়মিত হয়ে উঠছে। একই এলাকার আরও কয়েকজন ব্যক্তি অপহরণের শিকার হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যরা মুক্তিপণ দিয়ে প্রিয়জনদের ফিরিয়ে আনতে পারলেও সবাই সেই সুযোগ পান না।

এখানে বসবাসকারীদের দাবি, কচ্ছপিয়া ও নোয়াখালী এলাকার পাহাড়ঘেঁষা জনপদে ৯/ ১০ হাজার মানুষ বসবাস করে। কিন্তু বর্তমান সময়ে সহিংসতা ও অপহরণের কারণে এখানে বসবাসরত মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে প্রায় অর্ধশতাধিক পরিবার ঘরবাড়ী ছেড়ে অন্যাত্র নিরাপদ স্থানে চরে গেছেন। আবার কিছু পরিবার আবার দিনের বেলা বাড়িতে থাকলেও রাত হলে অন্যত্র চলে যাচ্ছে।তারা নিজেদের বাড়িতে থেকেও নিরাপদ বোধ করছেন না।

গ্রামবাসীরা বলছেন, আগে মাঝে মাঝে গোলাগুলি বা অপহরণের খবর পাওয়া গেলেও এখন পরিস্থিতি অনেক বেশি ভয়াবহ। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো ঘটনা ঘটছে। ফলে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ক্রমেই বাড়ছে। অনেক অভিভাবক সন্তানদের নিয়ে নিরাপদ স্থানে চলে যাচ্ছেন। কারণ তারা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে পরিবার নিয়ে এলাকায় থাকা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এই সংকট শুধু সাধারণ মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। বাহারছড়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মোহাম্মদ ইলিয়াছ জানিয়েছেন, তার ওয়ার্ডে কয়েকশ পরিবার বসবাস করলেও বর্তমানে অনেক পরিবার এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। তিনি বলেন, দিন-রাত গোলাগুলি এবং অপহরণের ঘটনায় মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবেও তিনি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত।

আরও পড়ুন :  কারপাস জটিলতায় বেনাপোল বন্দর দিয়ে আমদানি বাণিজ্য বন্ধ

সাধারন মানুষ এখন আর রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বা প্রশাসনিক আশ্বাস শুনতে চায় না; তারা চায় বাস্তব নিরাপত্তা এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত কয়েক বছরে টেকনাফের বিভিন্ন পাহাড়ঘেঁষা এলাকায় অপহরণের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। গত তিন বছরে অন্তত ৩২০ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে গত এক বছরেই প্রায় ১৫৫ জনকে অপহরণ করা হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মুক্তিপণের বিনিময়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হলেও অনেক পরিবারকে বড় অঙ্কের অর্থ গুনতে হয়েছে। এসব ঘটনা মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ানোর পাশাপাশি এলাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও নষ্ট করছে।

অপহরণের পাশাপাশি সহিংস ঘটনাও বেড়েছে। কয়েক মাস আগে অপহরণের চেষ্টার সময় এক যুবক গুলিবিদ্ধ হন। একই এলাকায় এক তরুণী সশস্ত্র হামলায় নিহত হন। এছাড়া পাহাড়ি অঞ্চল থেকে একাধিক লাশ উদ্ধারের ঘটনাও মানুষের মনে ভয় আরও গভীর করেছে। এসব ঘটনার কারণে স্থানীয়রা মনে করছেন, অপরাধীরা দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

নোয়াখালী জুম্মাপাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ শাকের বলেন, তার আশপাশের বহু পরিবার ইতোমধ্যে এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। তিনি জানান, নিজের পরিবারের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে স্ত্রী ও সন্তানদের অন্যত্র ভাড়া বাসায় রেখেছেন।

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও। তাদের মতে, এলাকায় ব্যবসা পরিচালনা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেকেই সন্ধ্যার আগেই দোকানপাট বন্ধ করে দেন। মানুষের চলাচল কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে পুরো এলাকার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

আরও পড়ুন :  যশোরে গ্রেপ্তার হলো চট্টগ্রামের আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন

বিশ্লেষকরা মনে করেন, টেকনাফের এই পরিস্থিতির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় এখানে দীর্ঘদিন ধরে মাদক পাচার, অস্ত্র চোরাচালান এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা রয়েছে। পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকটের প্রভাবও স্থানীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। বিভিন্ন অপরাধী চক্র এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অপহরণ ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান যথেষ্ট হবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, শক্তিশালী আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং পাহাড়ঘেঁষা এলাকায় স্থায়ী নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা। তারা পুলিশ ফাঁড়ি বা চৌকি স্থাপনের দাবিও জানিয়েছেন, যাতে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায়।

বাহারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন খোকনের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তার ভাষায়, মানুষ ভয় নিয়ে দিন কাটাচ্ছে এবং অনেক পরিবার ইতোমধ্যে এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

কক্সবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী জানিয়েছেন, অপহরণ, মাদক এবং অন্যান্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সক্রিয় করার পাশাপাশি অপহরণপ্রবণ এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদারের বিষয়েও পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

টেকনাফ মডেল থানার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অপহরণকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করা হচ্ছে। বাহারছড়া এলাকায় পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে এবং যৌথ অভিযানের পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বড় পরিসরে অভিযান পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। সাথে সাথে স্থায়ী পুলিশ চৌকি বসানোর বিষয়টি আরোচনা চলছে।

আর্কাইভ