খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeবিশ্ব সংবাদইউরোপে ভয়াবহ দাবানল: ২ লাখ ৭০ হাজার মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে, বোর্দোর দিকে...

ইউরোপে ভয়াবহ দাবানল: ২ লাখ ৭০ হাজার মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে, বোর্দোর দিকে আগুন

হঠাৎ মোবাইল ফোনে জরুরি সতর্কবার্তা আসে। সেখানে অবিলম্বে এলাকা খালি করে একমাত্র সড়ক ব্যবহার করে বেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে গাড়িতে করে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন তারা।

ইউরোপজুড়ে ভয়াবহ দাবানল নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। পশ্চিম ফ্রান্স, স্পেন এবং স্কটল্যান্ডের বিভিন্ন অঞ্চলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আগুনের কারণে ইতোমধ্যেই প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফ্রান্সের বোর্দো শহরের উপকণ্ঠ পর্যন্ত আগুন পৌঁছে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে স্পেনে জারি করা হয়েছে জাতীয় জরুরি অবস্থা, আর স্কটল্যান্ডের কেয়ার্নগর্মস ন্যাশনাল পার্কে আগুনকে ‘মেজর ইনসিডেন্ট’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, টানা তাপপ্রবাহ, অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রা এবং শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে ইউরোপের বনাঞ্চল এখন বারুদের স্তূপে পরিণত হয়েছে। ফলে একবার আগুন লাগলে তা নিয়ন্ত্রণে আনা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে।

পশ্চিম ফ্রান্সের জিরন্দ (Gironde) অঞ্চলে কয়েকদিন ধরে ভয়াবহ দাবানল জ্বলছে। দমকল বাহিনী আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে দিন-রাত কাজ করলেও পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি।

বাতাসের দিক পরিবর্তনের কারণে আগুন দ্রুত বোর্দো শহরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সম্ভাব্য বিপদের কথা বিবেচনা করে প্রশাসন আগুন ও শহরের মাঝামাঝি এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

আগুন নেভানোর কাজে বড় কার্গো বিমান ব্যবহার করে বিশেষ অগ্নিনির্বাপক রাসায়নিক ছিটানো হচ্ছে। পাশাপাশি ফরাসি সেনাবাহিনীকেও উদ্ধার ও নিয়ন্ত্রণ অভিযানে যুক্ত করা হয়েছে।

দাবানলের ভয়াবহতা এতটাই বেশি যে অনেক মানুষ মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন।

ব্রিটিশ পর্যটক ডেভিড মর্টন ও তাঁর পরিবার ফ্রান্সের ক্যাপ ফেরে উপদ্বীপে অবস্থান করছিলেন। প্রধান আগুনের কেন্দ্র থেকে মাত্র ৫০০ গজ দূরে ছিলেন তারা।

তিনি জানান, আগুনের শিখা বনাঞ্চলের বিশাল পাইন গাছের চেয়েও উঁচু হয়ে উঠেছিল। কয়েক তলা ভবনের সমান উচ্চতার সেই আগুন দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।

হঠাৎ মোবাইল ফোনে জরুরি সতর্কবার্তা আসে। সেখানে অবিলম্বে এলাকা খালি করে একমাত্র সড়ক ব্যবহার করে বেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে গাড়িতে করে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন তারা।

লন্ডনের ২১ বছর বয়সী জ্যাক মরিসনও ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।

তার ভাষ্য, ফরাসি নিরাপত্তা বাহিনী বাড়ি বাড়ি গিয়ে সবাইকে দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। পুরো পরিস্থিতি যেন কোনো দুর্যোগভিত্তিক চলচ্চিত্রের দৃশ্য।

অনেক মানুষ স্কুল, গুদামঘর কিংবা অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে রাত কাটাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার সৈকতে লাগেজ নিয়ে অপেক্ষা করছেন কখন নিরাপদে অন্যত্র যেতে পারবেন।

স্থানীয়দের কাছ থেকে তিনি শুনেছেন, কিছু বাড়ি মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ভয়াবহ হলেও এই ধরনের দাবানলের সঙ্গে অনেক মানুষ ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছেন বলে জানান তিনি।

দাবানলের কারণে বহু পর্যটক তাদের ছুটির পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন।

ইংল্যান্ডের লিডসের বাসিন্দা মার্ক ডোরে পরিবার নিয়ে ফ্রান্সে ক্যাম্পিং করতে গিয়েছিলেন। তারা পারেন্তিস-অঁ-বর্ন এলাকার একটি ক্যাম্পসাইটে ছিলেন।

রাতে ক্যাম্পসাইটের অনুষ্ঠানে সংগীত উপভোগ করার সময় হঠাৎ ঘোষণা আসে যে সবাইকে অবিলম্বে এলাকা ছাড়তে হবে। এরপর তিনি স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে দর্দোন অঞ্চলে চলে যান।

ফ্রান্সের পাশাপাশি স্পেনেও দাবানল ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে।

রাজধানী মাদ্রিদের বাইরে বিস্তীর্ণ এলাকায় একাধিক আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। কর্তৃপক্ষ মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে যেন বিভিন্ন দাবানল একত্রিত হয়ে আরও বড় বিপর্যয় সৃষ্টি না করে।

ইতোমধ্যেই মাদ্রিদের পশ্চিমে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

মাদ্রিদ অঞ্চলের প্রশাসনিক প্রধান ইসাবেল দিয়াজ আয়ুসো একে অঞ্চলের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানল হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপে একের পর এক তাপপ্রবাহ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

রেকর্ড ভাঙা তাপমাত্রা বনভূমি ও ঝোপঝাড়কে অত্যন্ত শুষ্ক করে ফেলেছে। ফলে সামান্য আগুনও দ্রুত ভয়াবহ দাবানলে পরিণত হচ্ছে।

চলতি বছর শুধু স্পেনেই প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর বনাঞ্চল আগুনে পুড়ে গেছে। এর বিস্তৃতি বিশ্বের অনেক বড় শহরের সমান।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইউরোপের বিভিন্ন দেশ একযোগে সহায়তার হাত বাড়িয়েছে।

ইতালি, গ্রিস, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, ক্রোয়েশিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র এবং স্লোভাকিয়া ইতোমধ্যেই পানি নিক্ষেপকারী বিমান ও হেলিকপ্টার পাঠিয়েছে। এসব উড়োজাহাজ ফ্রান্স ও স্পেনের বিভিন্ন দাবানল এলাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

ইউরোপীয় দেশগুলোর এই সমন্বিত উদ্যোগকে বড় ধরনের মানবিক সহযোগিতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

দাবানলের প্রভাব শুধু ফ্রান্স ও স্পেনেই সীমাবদ্ধ নয়। স্কটল্যান্ডের কেয়ার্নগর্মস ন্যাশনাল পার্কেও বড় ধরনের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে।

পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় সেখানে ‘মেজর ইনসিডেন্ট’ ঘোষণা করা হয়েছে। আগুনের ধোঁয়া প্রায় ৫৯ মাইল দূরের অ্যাবারডিন শহর থেকেও দেখা গেছে।

স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার জন সুইনি জনগণকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, বাতাসের দিক পরিবর্তনের কারণে আগুনের গতিপথও বদলেছে। ফলে নেথি ব্রিজ এলাকার ওপর তাৎক্ষণিক ঝুঁকি কিছুটা কমলেও পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। স্থল ও আকাশপথে উদ্ধার অভিযান জোরদার করা হয়েছে এবং আগুনের বিস্তার ঠেকাতে নতুন ফায়ার ব্রেক তৈরি করা হচ্ছে।

ফ্রান্সে দাবানল চললেও দেশটির আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ববিষয়ক মন্ত্রী এলেওনোর ক্যারোই পর্যটকদের আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, পুরো ফ্রান্স নয়, কেবল নির্দিষ্ট কিছু এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশের অধিকাংশ অঞ্চল এখনো নিরাপদ রয়েছে। তাই ভ্রমণ পরিকল্পনা বাতিল করার প্রয়োজন নেই। তবে যেখানেই ভ্রমণ করুন না কেন, স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা ও আবহাওয়ার সতর্কতা নিয়মিত অনুসরণ করা জরুরি।

অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তরও এখন পর্যন্ত ফ্রান্স বা স্পেনে ভ্রমণের বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপে দাবানলের সংখ্যা ও তীব্রতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দীর্ঘস্থায়ী খরা, অতিরিক্ত তাপমাত্রা এবং কম বৃষ্টিপাত বনাঞ্চলকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব যদি দ্রুত কমানো না যায়, তাহলে ভবিষ্যতে ইউরোপে এ ধরনের ভয়াবহ দাবানল আরও ঘন ঘন দেখা যেতে পারে। তাই শুধু জরুরি উদ্ধার অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আর্কাইভ