ফুটবল ইতিহাসে আরও একটি অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের জন্ম দিলেন লিওনেল মেসি। বিশ্বকাপ মঞ্চে অসংখ্য রেকর্ডের মালিক এই আর্জেন্টাইন মহাতারকা এবার নিজের নাম লিখলেন সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে গোল করে তিনি ছাড়িয়ে গেলেন জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোজেকে এবং বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বাধিক গোলের নতুন রেকর্ড গড়লেন।
অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচে প্রথমার্ধেই জালের দেখা পান মেসি। সেই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপে তাঁর মোট গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ১৭-তে। এর আগে ১৬ গোল নিয়ে শীর্ষে ছিলেন ক্লোজে। দীর্ঘদিনের সেই রেকর্ড ভেঙে ফুটবলপ্রেমীদের সামনে নতুন ইতিহাস উপহার দিলেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক।
অস্ট্রিয়া ম্যাচে রেকর্ড গড়ার নাটকীয় মুহূর্ত
ম্যাচের শুরু থেকেই রেকর্ড গড়ার সুযোগ ছিল মেসির সামনে। নবম মিনিটে আর্জেন্টিনার ফরোয়ার্ড লাউতারো মার্টিনেজকে ফাউল করলে প্রথমে পেনাল্টি না দিলেও পরে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR)-এর সহায়তায় সিদ্ধান্ত বদলান ম্যাচ অফিসিয়াল। ফলে পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা।
সবাই ভেবেছিল সেখানেই ইতিহাস গড়ে ফেলবেন মেসি। কিন্তু অবাক করা এক মুহূর্তে তিনি সুযোগ হাতছাড়া করেন। তাঁর নেওয়া শট পোস্টের বাইরে চলে যায়। ফলে অপেক্ষা আরও কিছুটা দীর্ঘ হয়।
তবে মেসির মতো খেলোয়াড়কে বেশিক্ষণ আটকে রাখা সম্ভব নয়। ম্যাচের ৩৯তম মিনিটে বাঁ প্রান্ত থেকে এনজো ফার্নান্দেজের নিখুঁত পাস পেয়ে দারুণ ফিনিশিংয়ে গোল করেন তিনি। সেই গোলেই ভেঙে যায় ক্লোজের দীর্ঘদিনের রেকর্ড।
২০০৬ বিশ্বকাপে শুরু হয়েছিল মেসির যাত্রা
বিশ্বকাপে মেসির যাত্রা শুরু হয় ২০০৬ সালে। তরুণ বয়সেই তিনি নিজের প্রতিভার জানান দেন। সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে প্রথম বিশ্বকাপ গোল করেন তিনি।
মাত্র ১৮ বছর ৩৫৭ দিন বয়সে গোল করে বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হওয়ার কীর্তিও গড়েছিলেন মেসি। তখন থেকেই বোঝা গিয়েছিল, ভবিষ্যতে তিনি ফুটবল বিশ্বকে অনেক বড় কিছু উপহার দিতে যাচ্ছেন।
২০১০ বিশ্বকাপ: হতাশার অধ্যায়
দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ মেসির জন্য ছিল কঠিন এক অভিজ্ঞতা। পুরো বিশ্বের প্রত্যাশার চাপ ছিল তাঁর কাঁধে। কিন্তু সেই টুর্নামেন্টে নিজের সেরা ছন্দ খুঁজে পাননি তিনি।
আর্জেন্টিনা কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরে বিদায় নেয়। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় ছিল, পুরো টুর্নামেন্টে একটি গোলও করতে পারেননি মেসি। তাঁর বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের সবচেয়ে হতাশাজনক অধ্যায় হিসেবে এখনও সেই আসর স্মরণ করা হয়।
২০১৪: স্বপ্নভঙ্গের বেদনা
ব্রাজিল বিশ্বকাপে মেসি ছিলেন দুর্দান্ত। তাঁর নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা পৌঁছে যায় ফাইনালে। পুরো টুর্নামেন্টে চারটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন তিনি।
গ্রুপ পর্বে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে দুটি গোলসহ একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন মেসি। কিন্তু ফাইনালে জার্মানির কাছে পরাজিত হয়ে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন ভেঙে যায়। ট্রফি হাতছাড়া হলেও সেই আসরে তাঁর পারফরম্যান্স বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়।
২০১৮: সীমিত সাফল্যের বিশ্বকাপ
রাশিয়া বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার যাত্রা খুব বেশি দূর এগোয়নি। গ্রুপ পর্বে আইসল্যান্ডের বিরুদ্ধে পেনাল্টি মিস করেছিলেন মেসি। শেষ পর্যন্ত নাইজেরিয়ার বিপক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ গোল করলেও দলকে বেশি দূর নিয়ে যেতে পারেননি।
প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে শক্তিশালী ফ্রান্সের কাছে হেরে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা। ফলে বিশ্বকাপ জয়ের অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হয়।
কাতার বিশ্বকাপ: পূর্ণতা পাওয়া এক স্বপ্ন
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে তিনি জিতে নেন ফুটবলের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ট্রফি।
পুরো টুর্নামেন্টে সাতটি গোল করেন মেসি। সৌদি আরব ও মেক্সিকোর বিপক্ষে গ্রুপ পর্বে গোল করার পাশাপাশি নকআউট পর্বের প্রতিটি ধাপেও গোল করেন তিনি। অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, ক্রোয়েশিয়া এবং ফ্রান্সের বিপক্ষে তাঁর অসাধারণ পারফরম্যান্স আর্জেন্টিনাকে শিরোপা এনে দেয়।
বিশেষ করে ফাইনালে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে দুটি গোল করে তিনি নিজের কিংবদন্তি মর্যাদা আরও দৃঢ় করেন।
নতুন বিশ্বকাপে রেকর্ডের পর রেকর্ড
চলমান বিশ্বকাপেও দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছেন মেসি। প্রথম ম্যাচেই আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক করে ক্লোজের রেকর্ড স্পর্শ করেছিলেন তিনি।
এরপর অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে গোল করে ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে নিজের নাম প্রতিষ্ঠা করেন। এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক।
লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ উত্তরাধিকার
লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ ক্যারিয়ার শুধু গোলের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। প্রায় দুই দশক ধরে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স, নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা এবং ম্যাচ জেতানোর ক্ষমতা তাঁকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে।
বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড তাঁর অসাধারণ ক্যারিয়ারে নতুন এক পালক যোগ করল। ভবিষ্যতে এই রেকর্ড কেউ ভাঙতে পারবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এই মুহূর্তে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে লিওনেল মেসির নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে গেল ফুটবলের ইতিহাসে।

