বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় একটি ইতিবাচক বার্তা নিয়ে এসেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে রাজস্ব আদায়ে দেশের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়েছে সংস্থাটি। জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সময়ে এনবিআরের মোট রাজস্ব আদায় দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৬০ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা, যা আগের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে।
এই অর্জন শুধু সংখ্যার হিসাবেই নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও কর ব্যবস্থাপনার উন্নতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। রাজস্ব আদায়ের এই ধারাবাহিক বৃদ্ধি দেশের উন্নয়ন ব্যয়, অবকাঠামো নির্মাণ এবং সরকারি সেবার কার্যক্রম সচল রাখতে বড় ভূমিকা রাখবে।
এনবিআরের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৩ লাখ ২৭ হাজার ৭৮৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। সেই তুলনায় চলতি অর্থবছরে রাজস্ব বেড়েছে ৩২ হাজার ৮৫৬ কোটি ২২ লাখ টাকা।
শতকরা হিসাবে এই প্রবৃদ্ধি ১০ দশমিক ০২ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও এই প্রবৃদ্ধি দেশের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।
রেকর্ড রাজস্ব আদায় হলেও এনবিআর এখনও নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেকটা পিছিয়ে আছে। চলতি অর্থবছরের জন্য সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা।
প্রথম ১১ মাসের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৪২ হাজার ৮৪ কোটি টাকা। কিন্তু অর্জিত হয়েছে ৩ লাখ ৬০ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা। অর্থাৎ এখনো ঘাটতি রয়েছে প্রায় ৮১ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা।
এই হিসেবে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের হার দাঁড়িয়েছে ৮১ দশমিক ৫৮ শতাংশ। এটি দেখায়, রাজস্ব আদায়ে অগ্রগতি থাকলেও পূর্ণ লক্ষ্যে পৌঁছাতে আরও জোরালো পদক্ষেপ প্রয়োজন।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এনবিআরের তিনটি প্রধান উৎস থেকেই রাজস্ব আদায়ে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি এসেছে।
কাস্টমস অনুবিভাগে রাজস্ব বেড়েছে ৭ দশমিক ০৮ শতাংশ। আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বৃদ্ধি এবং শুল্ক ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি এর পেছনে বড় কারণ হিসেবে কাজ করেছে।
ভ্যাট অনুবিভাগে আদায় বেড়েছে ১০ দশমিক ০৫ শতাংশ। ব্যবসা-বাণিজ্যে ডিজিটাল ভ্যাট ব্যবস্থাপনা এবং উৎসে ভ্যাট আদায়ের নজরদারি এই প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে।
সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে আয়কর অনুবিভাগে, যেখানে রাজস্ব বেড়েছে ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশ। ব্যক্তি ও করপোরেট করদাতাদের কাছ থেকে বাড়তি আদায় এই খাতকে শক্তিশালী করেছে।
চলতি জুন মাসের প্রথম ২০ দিনেই এনবিআর আরও ২৯ হাজার ৩১১ কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করেছে। এর ফলে ২০ জুন পর্যন্ত মোট রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা।
এটি ইতোমধ্যেই আগের অর্থবছরের পুরো বছরের মোট রাজস্ব আদায়ের রেকর্ড অতিক্রম করেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা।
অর্থাৎ অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই নতুন ইতিহাস তৈরি করেছে এনবিআর।
এনবিআরের কর্মকর্তারা আশাবাদী, জুন মাসের শেষ ১০ দিনে আরও প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা আদায় সম্ভব হবে।
যদি সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়, তাহলে চলতি অর্থবছরের মোট রাজস্ব আদায় ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। যদিও তা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা কম হবে, তবে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪৩ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আদায় নিশ্চিত হবে।
এটি দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়ের রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত হবে।
রাজস্ব সংগ্রহের গতি বাড়াতে এনবিআর ইতোমধ্যেই মাঠপর্যায়ে তিনটি আলাদা টাস্কফোর্স গঠন করেছে। আয়কর, ভ্যাট এবং কাস্টমস বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়ে এই টিমগুলো কাজ করছে।
তাদের প্রধান দায়িত্ব হলো আদালত, ট্রাইব্যুনাল, আপিল বিভাগ এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর)-এ আটকে থাকা কর মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা।
এছাড়া কর ফাঁকি শনাক্ত করে বকেয়া রাজস্ব উদ্ধারেও এই টাস্কফোর্স সক্রিয় রয়েছে।
এনবিআর জানিয়েছে, স্বয়ংক্রিয় অডিট পদ্ধতি, উৎসে আয়কর ও ভ্যাট আদায় জোরদার, পোস্ট ক্লিয়ারেন্স অডিট এবং রিস্ক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালুর ফলে রাজস্ব আদায়ে গতি এসেছে।
বিশেষ করে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ করদাতাদের ওপর সমন্বিত অডিট পরিচালনা করায় রাজস্ব ফাঁকি কমেছে এবং আদায়ের হার বেড়েছে।
এই আধুনিক কর ব্যবস্থাপনা ভবিষ্যতে আরও বড় সাফল্য এনে দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি মানে সরকারের হাতে উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য বেশি অর্থ থাকা। সড়ক, সেতু, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি এনবিআর একই ধারা ধরে রাখতে পারে এবং কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়ায়, তাহলে আগামী বছরগুলোতে রাজস্ব আদায়ে আরও বড় সাফল্য আসতে পারে।
সব মিলিয়ে, চলতি অর্থবছরে এনবিআরের এই রেকর্ড রাজস্ব আদায় বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য আশাব্যঞ্জক এক মাইলফলক হয়ে উঠেছে।

