সন্ধ্যার পর আচমকাই বদলে গেল কলকাতার আবহাওয়া। দিনের শুরুতে ছিল রোদের তেজ, সঙ্গে ছিল প্রবল আর্দ্রতাজনিত অস্বস্তি। কিন্তু সন্ধ্যা গড়াতেই আকাশের চেহারা পাল্টে যায়। শুরু হয় মুষলধারে বৃষ্টি। একটানা অতি ভারী বৃষ্টিতে রাতের কলকাতার বিস্তীর্ণ এলাকা কার্যত জলমগ্ন হয়ে পড়ে। উত্তর কলকাতা থেকে দক্ষিণ কলকাতা, এমনকি সল্টলেক ও সেক্টর ফাইভের একাধিক রাস্তাতেও জমে যায় জল।
বৃষ্টির তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, শহরের কয়েকটি এলাকায় অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল পরিমাণ বৃষ্টির জল জমে যায়। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বেলগাছিয়া এলাকায় এক ঘণ্টায় প্রায় ১৩০ মিলিমিটার বৃষ্টির খবর পাওয়া গিয়েছে। মধ্য কলকাতার ঠনঠনিয়া এলাকাতেও এক ঘণ্টায় প্রায় ১০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে বলে জানা যায়। ফলে নিকাশি ব্যবস্থার উপর তৈরি হয় ব্যাপক চাপ।
সন্ধ্যার পর শুরু হওয়া এই বৃষ্টির কারণে রাতের দিকে কর্মক্ষেত্র থেকে বাড়ি ফেরা মানুষজনকে চরম দুর্ভোগের মুখে পড়তে হয়। বহু রাস্তা জলের তলায় চলে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হয়। কোথাও কোথাও জল ঠেলে গাড়ি এগোতে দেখা যায়, আবার বেশ কিছু রাস্তায় যান চলাচল প্রায় থমকে যায়।
এদিন সকাল থেকেই কলকাতা ও আশপাশের এলাকায় রোদের তেজ ছিল। আকাশে মেঘ থাকলেও দিনের বড় অংশে বৃষ্টির তেমন প্রভাব দেখা যায়নি। বরং বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বেশি থাকায় অস্বস্তিকর গরম অনুভূত হচ্ছিল।
প্রবল ঘাম এবং ভ্যাপসা আবহাওয়ার মধ্যেই দিন কাটছিল শহরবাসীর। অনেকেই দিনের শেষে বৃষ্টির আশায় ছিলেন। কিন্তু সন্ধ্যার পর যে এতটা ভারী বৃষ্টি হবে, তা পরিস্থিতিকে দ্রুত বদলে দেয়।
রাত আটটা থেকে সাড়ে আটটা নাগাদ কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। প্রথমে বৃষ্টির বেগ দেখে অনেকেই মনে করেছিলেন, বর্ষার স্বাভাবিক বৃষ্টির মতো কিছুক্ষণ পর হয়তো তা কমে যাবে। কিন্তু বাস্তবে দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টির তীব্রতা প্রায় একই রকম ছিল।
প্রায় দু’ঘণ্টা ধরে প্রবল বৃষ্টির পর রাত সাড়ে ১০টার দিকে বৃষ্টির বেগ কিছুটা কমে আসে। কিন্তু ততক্ষণে শহরের বিস্তীর্ণ অংশে জল জমে যায়।
কলকাতার বৃষ্টির ভয়াবহতা বোঝাতে বেলগাছিয়ার পরিসংখ্যানটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ওই এলাকায় মাত্র এক ঘণ্টায় প্রায় ১৩০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
এত অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ বৃষ্টির জল নেমে আসায় শহরের নিকাশি ব্যবস্থার উপর স্বাভাবিকভাবেই চাপ তৈরি হয়। একই চিত্র দেখা যায় মধ্য কলকাতার ঠনঠনিয়া এলাকাতেও। সেখানে এক ঘণ্টায় প্রায় ১০০ মিলিমিটার বৃষ্টির খবর পাওয়া যায়।
শহরের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অল্প সময়ে এত বেশি বৃষ্টি হলে রাস্তা থেকে দ্রুত জল সরিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তার উপর রাতের ব্যস্ত সময়ে জল জমে যাওয়ায় যান চলাচলেও সমস্যা তৈরি হয়।
অতি ভারী বৃষ্টির সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে কলকাতার বিভিন্ন এলাকায়। উত্তর কলকাতার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা ও সংলগ্ন এলাকায় জল জমে যায়।
মানিকতলা, শ্যামবাজার, সেন্ট্রাল, গিরিশ পার্ক, উল্টোডাঙা, আহিরীটোলা, টালা ও বেলগাছিয়ার মতো এলাকাগুলিতে রাস্তায় জল জমে থাকার খবর পাওয়া যায়।
কোথাও জল রাস্তার বড় অংশ ঢেকে দেয়। ফলে পথচারীদের চলাচলে সমস্যা তৈরি হয়। অনেক জায়গায় গাড়ির গতিও কমে যায়। জল জমে থাকা রাস্তায় যানবাহন চলাচলের সময় তৈরি হয় দীর্ঘ যানজট।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অফিস ও অন্যান্য কাজ শেষে বাড়ি ফেরার সময় শহরবাসীর দুর্ভোগ আরও বাড়ে। জল জমে থাকা রাস্তায় গণপরিবহণের গতি কমে যাওয়ায় যাত্রীদের অপেক্ষা করতে হয়। ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়েও অনেকে সমস্যায় পড়েন।
শুধু উত্তর কলকাতা নয়, দক্ষিণ কলকাতার বেশ কিছু এলাকাতেও অতি ভারী বৃষ্টির প্রভাব পড়ে। বিভিন্ন রাস্তায় জল জমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের চলাচল ব্যাহত হয়।
শহরের বিভিন্ন অংশে একই সময়ে বৃষ্টি হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। রাতের দিকে কলকাতার একাধিক রাস্তা জলমগ্ন হয়ে পড়ে।
বৃষ্টির কারণে কোথাও রাস্তার জল দ্রুত নামতে পারেনি। ফলে রাত সাড়ে ১০টার পরেও বিভিন্ন এলাকায় জল জমে থাকার খবর পাওয়া যায়।
এই পরিস্থিতিতে বাড়ি ফেরার পথে সাধারণ মানুষকে জল পেরিয়ে যেতে হয়েছে। অনেককে দীর্ঘ সময় রাস্তায় আটকে থাকতে হয়েছে বলেও জানা যায়।
কলকাতার পাশাপাশি বিধাননগর ও সংলগ্ন এলাকাতেও বৃষ্টির প্রভাব পড়ে। সল্টলেকের বিভিন্ন অংশে জল জমে যায়। সেক্টর ফাইভের একাধিক রাস্তাতেও বৃষ্টির জল জমে থাকার খবর পাওয়া যায়।
চিনার পার্ক এবং হলদিরাম সংলগ্ন এলাকাতেও জল জমে পরিস্থিতি জটিল হয়। কর্মক্ষেত্র থেকে বাড়ি ফেরার সময়ে এই এলাকাগুলিতে বহু মানুষ সমস্যায় পড়েন।
বিশেষ করে রাতের ব্যস্ত সময়ে জল জমে যাওয়ায় যানবাহনের গতি কমে যায়। কিছু জায়গায় জল ঠেলে গাড়ি চলাচল করতে দেখা যায়। আবার কোথাও যানজট তৈরি হয়।
রাত সাড়ে ১০টার পর কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমে এলেও পুরোপুরি বৃষ্টি থেমে যায়নি। ফলে জল নামার পাশাপাশি নতুন করে বৃষ্টির জল জমার আশঙ্কাও তৈরি হয়।
শহরের রাস্তা থেকে জল সরানোর কাজ শুরু করা হয়। বিভিন্ন জায়গায় পাম্প চালিয়ে জমে থাকা জল বের করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে রাতের মধ্যে সব জায়গা থেকে জল নেমে যাবে কি না, তা নিয়ে পরিস্থিতির দিকে নজর রাখতে হচ্ছে। কারণ আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৃষ্টি একেবারে বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
অতি ভারী বৃষ্টির পর কলকাতার বিভিন্ন জলমগ্ন রাস্তা থেকে জল সরানোর কাজ শুরু হয়েছে। যেখানে জল বেশি জমেছে, সেখানে পাম্প ব্যবহার করে জল বের করার চেষ্টা চলছে।
শহরের নিকাশি ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বাভাবিকভাবে জল বেরিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পাম্পিং স্টেশনগুলির মাধ্যমেও জল সরানোর কাজ চলছে।
তবে অল্প সময়ে অতিরিক্ত পরিমাণ বৃষ্টি হলে জল সরতে সময় লাগে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় নিকাশি ব্যবস্থার উপর চাপ বেশি থাকে, সেখানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।
কলকাতার এই অতি ভারী বৃষ্টির মধ্যেই আবহাওয়া দপ্তরের তরফে কমলা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ফলে আগামী সময়েও বৃষ্টির পরিস্থিতির উপর নজর রাখার প্রয়োজন রয়েছে।
হাওয়া অফিসের তরফে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির পাশাপাশি ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথাও জানানো হয়েছে।
অর্থাৎ শুধু জল জমাই নয়, খারাপ আবহাওয়ার কারণে আরও কিছু সমস্যা তৈরি হতে পারে। ঝড়ো হাওয়ার সময় গাছের ডাল ভেঙে পড়া, যান চলাচলে বিঘ্ন বা বিদ্যুৎ পরিষেবায় সাময়িক সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
প্রতি বর্ষাতেই কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় জল জমার সমস্যা নতুন করে সামনে আসে। এদিনের অতি ভারী বৃষ্টিও সেই সমস্যাকে ফের চোখের সামনে নিয়ে এল।
স্বল্প সময়ে বিপুল বৃষ্টিপাত হলে শহরের রাস্তা থেকে দ্রুত জল সরানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। একদিকে বৃষ্টির জল, অন্যদিকে নিকাশি ব্যবস্থার উপর অতিরিক্ত চাপ—দুইয়ের ফলে জলজট দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
এদিনের ঘটনায় বিশেষ করে যে বিষয়টি নজরে এসেছে, তা হলো অল্প সময়ের মধ্যে অত্যন্ত বেশি পরিমাণ বৃষ্টি। বেলগাছিয়ায় এক ঘণ্টায় ১৩০ মিলিমিটার এবং ঠনঠনিয়ায় এক ঘণ্টায় ১০০ মিলিমিটার বৃষ্টির মতো পরিসংখ্যান শহরের পরিস্থিতির তীব্রতা স্পষ্ট করে।
দিনের বেলায় ভারী বৃষ্টি হলে অনেকেই পরিস্থিতি বুঝে বাড়ি থেকে বের হন। কিন্তু সন্ধ্যার পর হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হওয়ায় বহু মানুষ তখন রাস্তায় ছিলেন।
অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য কাজ শেষ করে বাড়ি ফেরার সময়ই শুরু হয় প্রবল বৃষ্টি। ফলে রাস্তার উপর জল জমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষকে বাড়তি সমস্যায় পড়তে হয়।
কেউ জল পেরিয়ে হেঁটে যান, কেউ গাড়িতে আটকে থাকেন। আবার কোথাও যানজটের কারণে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগে গন্তব্যে পৌঁছতে।
শহরের ব্যস্ততম সময়ের সঙ্গে অতি ভারী বৃষ্টির এই সংযোগ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে।
কলকাতায় অতি ভারী বৃষ্টির পর আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরবর্তী কয়েক ঘণ্টার আবহাওয়া। কারণ বৃষ্টি পুরোপুরি থামেনি এবং কমলা সতর্কতাও জারি রয়েছে।
ফলে নতুন করে ভারী বৃষ্টি হলে ইতিমধ্যেই জলমগ্ন এলাকাগুলিতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। অন্যদিকে বৃষ্টি কমে গেলে জমে থাকা জল দ্রুত সরানোর সুযোগ তৈরি হবে।
শহরবাসীর কাছে তাই আপাতত আবহাওয়ার আপডেটের দিকে নজর রাখাই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে রাতের দিকে অপ্রয়োজনে জলমগ্ন রাস্তা দিয়ে চলাচল না করাই নিরাপদ।
কলকাতার এই বৃষ্টির ঘটনায় আবারও স্পষ্ট হলো, বর্ষাকালে অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হলে মহানগরের স্বাভাবিক জীবন কত দ্রুত ব্যাহত হতে পারে। দিনের শুরুতে রোদের তেজ ও আর্দ্রতার অস্বস্তি থেকে রাতের অতি ভারী বৃষ্টি—মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই বদলে গেল শহরের চিত্র।
উত্তর থেকে দক্ষিণ কলকাতা, সল্টলেক থেকে সেক্টর ফাইভ—বহু এলাকায় জল জমে যাওয়ায় রাতের শহর কার্যত থমকে যায়। এখন নজর থাকবে বৃষ্টি কতটা কমে এবং জমে থাকা জল কত দ্রুত নেমে যায় তার দিকে। একই সঙ্গে কমলা সতর্কতা থাকায় আগামী সময়ের আবহাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কলকাতায় অতি ভারী বৃষ্টি, জলমগ্ন রাস্তা, যানজট এবং দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার এই পরিস্থিতিতে আগামী কয়েক ঘণ্টা শহরবাসীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

