দুবাই আজ বিশ্বের অন্যতম পরিচিত শহর। সুউচ্চ আকাশচুম্বী ভবন, বিলাসবহুল শপিং মল, কৃত্রিম দ্বীপ, বিশাল বন্দর আর আন্তর্জাতিক ব্যবসার কেন্দ্র হিসেবে শহরটির পরিচিতি এখন গোটা পৃথিবীতে। কিন্তু প্রায় এক শতক আগের দুবাই ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জায়গা।
তখনও ‘দুবাই’ নামটি আজকের মতো অর্থনৈতিক শক্তির প্রতীক হয়ে ওঠেনি। বরং পারস্য উপসাগরের এই অঞ্চল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তৃত রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। আর এই সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ পরিচালিত হতো ব্রিটিশ ভারতের প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে।
এ কারণেই ইতিহাসের একটি মজার প্রশ্ন সামনে আসে—দুবাই, আবুধাবি, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত কিংবা ওমান কি কখনও ভারতের সঙ্গে যুক্ত থাকার সম্ভাবনা তৈরি করেছিল?
এর সরাসরি উত্তর হলো, দুবাই বা উপসাগরীয় আরব অঞ্চলগুলো ব্রিটিশ ভারতের সরাসরি ভূখণ্ড ছিল না। তবে ব্রিটিশ ভারতের সঙ্গে তাদের প্রশাসনিক, রাজনৈতিক, সামরিক ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ এতটাই ঘনিষ্ঠ ছিল যে ১৯৪৭ সালের আগে এই অঞ্চলগুলোর দায়িত্ব ভারত সরকারের কাঠামোর মধ্য দিয়ে পরিচালিত হতো। ব্রিটিশ শাসনের শেষ পর্যায়ে সেই ব্যবস্থার পরিবর্তনই পরবর্তী ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কাছে পারস্য উপসাগর ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। ভারত, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্য ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে উপসাগরের অবস্থান ছিল কৌশলগত।
ব্রিটিশরা ভারতের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর ধীরে ধীরে উপসাগরীয় অঞ্চলেও নিজেদের রাজনৈতিক প্রভাব বাড়াতে থাকে। স্থানীয় শাসকদের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তি ও সমঝোতার মাধ্যমে ব্রিটিশরা এই অঞ্চলের পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তার ওপর প্রভাব বিস্তার করত।
এই ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল ‘পারস্য উপসাগর রেসিডেন্সি’। দীর্ঘ সময় ধরে এই রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে ব্রিটিশ ভারতের প্রশাসন ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। ব্রিটিশ নথিপত্রেও পারস্য উপসাগরে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং ভারত সরকারের ভূমিকার উল্লেখ পাওয়া যায়।
অর্থাৎ, বিষয়টি এমন নয় যে দুবাই তখন ভারতের একটি জেলা ছিল। বরং বলা যায়, ব্রিটিশ ভারতের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার একটি অংশ উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর কার্যকর ছিল।
এই পার্থক্যটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।
এই ঐতিহাসিক সম্পর্কের সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ ছিল মুদ্রা।
উপসাগরীয় অঞ্চলের বেশ কয়েকটি এলাকায় ভারতীয় রুপি দীর্ঘ সময় ধরে স্থানীয় লেনদেনে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো। বাহরাইনের ক্ষেত্রেও ভারতীয় রুপি দীর্ঘদিন সবচেয়ে প্রচলিত মুদ্রাগুলোর একটি ছিল। পরে স্থানীয় মুদ্রা চালু হওয়ার পর সেই পরিস্থিতি বদলে যায়।
এর পেছনে ছিল স্বাভাবিক বাণিজ্যিক বাস্তবতা।
ভারত ও পারস্য উপসাগরের মধ্যে বহু শতাব্দী ধরে বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল। গুজরাট, বোম্বে বা বর্তমান মুম্বাইসহ ভারতের পশ্চিম উপকূলের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আরব উপসাগরের বন্দরগুলোর যোগাযোগ ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী।
মুক্তো, খেজুর, মসলা, কাপড় এবং নানা ধরনের পণ্য নিয়ে ভারতীয় ও আরব ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিয়মিত লেনদেন চলত।
ফলে ভারতীয় রুপি শুধু ভারতের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল না। উপসাগরীয় বাণিজ্যিক পরিসরেও এর ব্যবহার দেখা যেত।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সামরিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার কারণেও ভারত ও উপসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় ভারতীয় সেনা ও কর্মীদের ব্যবহার করা হতো। উপসাগরীয় অঞ্চলও এর বাইরে ছিল না।
তবে এখানেও একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা দরকার। ভারতীয় সেনা সেখানে অবস্থান করলেই অঞ্চলটি ভারতের অংশ হয়ে যায়নি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সামরিক কাঠামোয় ভারতীয় বাহিনীকে বিভিন্ন কৌশলগত এলাকায় ব্যবহার করা হতো।
অর্থাৎ, সামরিক উপস্থিতি ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বৃহত্তর ব্যবস্থার অংশ, ভারতের ভূখণ্ড সম্প্রসারণের প্রমাণ নয়।
এখানেই ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারত থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতা সামনে রেখে ব্রিটিশ প্রশাসনকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে হয়।
এর ফলে প্রশ্ন ওঠে—ভারতের স্বাধীনতার পর উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সম্পর্ক কীভাবে চলবে?
ব্রিটিশ সরকারের সিদ্ধান্ত ছিল, ভারত স্বাধীন হওয়ার পর উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর আগে ভারত সরকারের মাধ্যমে পরিচালিত যেসব ক্ষমতা প্রয়োগ করা হতো, সেগুলো নতুনভাবে ব্রিটিশ সরকারের অধীনে স্থানান্তর করা হবে।
১৯৪৯ সালের ব্রিটিশ আইনি নথিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্টের আগে এসব অঞ্চলের ক্ষেত্রে ভারতের গভর্নর-জেনারেল কিছু ক্ষমতা প্রয়োগ করতেন। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর সেই ক্ষমতাগুলো অন্যত্র স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের পরিবর্তনটি ছিল প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস।
এটাই পরবর্তীকালে উপসাগরীয় আরব অঞ্চলগুলোর পৃথক রাজনৈতিক পরিচয়কে আরও স্পষ্ট করে।
এখানে ইতিহাসকে একটু সাবধানে দেখা দরকার।
দুবাইকে ভারতের অংশ করার মতো কোনো বাস্তব রাজনৈতিক পরিকল্পনা ছিল—এমন দাবি করার মতো শক্ত প্রমাণ নেই। একইভাবে ‘ব্রিটিশরা শেষ মুহূর্তে দুবাইকে ভারতের বাইরে রেখে দিল’—এমন সরল ব্যাখ্যাও পুরো ইতিহাসকে তুলে ধরে না।
দুবাই তখন একটি স্থানীয় শাসনব্যবস্থার অধীনে থাকা উপসাগরীয় আরব অঞ্চল। ব্রিটিশদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল চুক্তিভিত্তিক ও কৌশলগত।
ভারত স্বাধীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই সম্পর্কের প্রশাসনিক কাঠামো বদলে যায়।
তাই ইতিহাসের সঠিক ব্যাখ্যা হলো—দুবাই ভারতের অংশ ছিল না; কিন্তু ব্রিটিশ ভারতের সঙ্গে তার প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল। ভারত স্বাধীন হওয়ার সময় সেই সম্পর্কের অবসান ঘটে এবং অঞ্চলটি পৃথক উপসাগরীয় রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে নিজের ভবিষ্যৎ পথ ধরে।
এই পার্থক্যটিই অনেক সময় সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা ঐতিহাসিক দাবিতে হারিয়ে যায়।
এর একটি বড় কারণ হলো ‘ব্রিটিশ ভারত’ এবং ‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভারতীয় প্রভাবাধীন অঞ্চল’—এই দুটি বিষয়কে এক করে দেখা।
ব্রিটিশ ভারতের মধ্যে সরাসরি শাসিত প্রদেশ ছিল। আবার ছিল দেশীয় রাজ্য, যেগুলো সরাসরি ব্রিটিশ ভারতের প্রদেশ ছিল না। এসব রাজ্যের ওপর ব্রিটিশদের নানা ধরনের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত প্রভাব ছিল।
১৯৪৭ সালের আগে ভারতীয় উপমহাদেশে শত শত দেশীয় রাজ্য ছিল। তারা ব্রিটিশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও সরাসরি ব্রিটিশ প্রদেশের মতো পরিচালিত হতো না।
তাই কোনো অঞ্চলে ব্রিটিশ প্রভাব থাকা মানেই সেই অঞ্চল ভারতের ভূখণ্ড ছিল—এমন সিদ্ধান্ত ইতিহাসসম্মত নয়।
উপসাগরীয় অঞ্চলের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
১৯৪৭ সালের পর ব্রিটিশরা উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর নিজেদের রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখে।
এর ফলে ভারত ও উপসাগরীয় অঞ্চলগুলোর প্রশাসনিক সম্পর্ক শেষ হলেও বাণিজ্যিক ও সামাজিক যোগাযোগ পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
বরং ভারতীয় ব্যবসায়ী, শ্রমিক এবং বণিকদের সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলের যোগাযোগ আরও বিভিন্নভাবে চলতে থাকে।
পরবর্তী কয়েক দশকে উপসাগরীয় অঞ্চলের রাজনৈতিক কাঠামোও দ্রুত বদলাতে থাকে।
বিশেষ করে ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে তেলসম্পদকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চল অর্থনৈতিকভাবে দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
এরপর একে একে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো নিজেদের আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলে।
১৯৭১ সাল উপসাগরীয় অঞ্চলের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই সময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলে সরাসরি রাজনৈতিক উপস্থিতি আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। একই বছর ছয়টি আমিরাত—আবুধাবি, দুবাই, শারজাহ, আজমান, উম্ম আল কুয়াইন ও ফুজাইরাহ—মিলে সংযুক্ত আরব আমিরাত বা ইউএই গঠন করে। পরে রাস আল খাইমাহও ফেডারেশনে যোগ দেয়।
দুবাই তখন আর কোনো বৃহত্তর ব্রিটিশ-ভারতীয় প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ নয়। বরং নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে নতুন ফেডারেশনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
আর কয়েক দশকের মধ্যে সেই দুবাইই পরিণত হয় বিশ্বের অন্যতম বড় আন্তর্জাতিক ব্যবসা, পর্যটন ও বিমান যোগাযোগের কেন্দ্রে।
এই জায়গাটিই সবচেয়ে বেশি কৌতূহল তৈরি করে।
যদি ব্রিটিশ ভারত স্বাধীন হওয়ার সময় উপসাগরীয় অঞ্চলগুলোর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অন্যভাবে নির্ধারিত হতো, তাহলে আজকের দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র নিঃসন্দেহে ভিন্ন হতে পারত।
কিন্তু ইতিহাসে ‘যদি’ দিয়ে সম্ভাবনা তৈরি করা যায়, বাস্তব ঘটনা বদলানো যায় না।
বাস্তবে ভারত স্বাধীন হওয়ার সময় দুবাই বা অন্যান্য উপসাগরীয় আরব অঞ্চল ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়নি।
বরং ব্রিটিশ ভারতের সঙ্গে তাদের প্রশাসনিক সম্পর্ক শেষ হয়ে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা হয়।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের ভারত ছাড়ার সময় শুধু ভারত-পাকিস্তান বিভাজনই বড় প্রশ্ন ছিল না। দেশীয় রাজ্যগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েও বড় অনিশ্চয়তা ছিল।
ভারতীয় উপমহাদেশে প্রায় ৫৬৫টি দেশীয় রাজ্য ছিল বলে ঐতিহাসিক নথিতে উল্লেখ পাওয়া যায়। এগুলোর অনেকগুলো ব্রিটিশ ভারতের সরাসরি অংশ না হলেও ব্রিটিশ প্রভাবাধীন ছিল।
ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর এসব রাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক আলোচনা, কূটনীতি এবং বিভিন্ন সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে অধিকাংশ দেশীয় রাজ্য ভারত বা পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হয়।
এই প্রক্রিয়াই আজকের ভারতীয় উপমহাদেশের মানচিত্র তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সব তথ্য একসঙ্গে রাখলে ছবিটা পরিষ্কার হয়।
দুবাই কখনও ভারতের একটি প্রদেশ ছিল না। তবে ব্রিটিশ আমলে পারস্য উপসাগরের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার সঙ্গে ভারত সরকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। উপসাগরীয় অঞ্চলে ভারতীয় মুদ্রার ব্যাপক ব্যবহার ছিল এবং ভারতীয় বাণিজ্যিক ও সামরিক যোগাযোগও ছিল শক্তিশালী। ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর-জেনারেলও ১৯৪৭ সালের আগে কিছু ক্ষমতা প্রয়োগ করতেন।
ভারত স্বাধীন হওয়ার সময় সেই ক্ষমতার কাঠামো পরিবর্তিত হয়।
ফলে দুবাই ও অন্যান্য উপসাগরীয় অঞ্চল ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বদলে পৃথক রাজনৈতিক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যায়।
পরবর্তীকালে ব্রিটিশ প্রভাবও কমতে থাকে এবং উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো নিজেদের স্বাধীন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিচয় গড়ে তোলে।
আজকের দুবাই সেই দীর্ঘ ইতিহাসেরই ফল।
রাজনৈতিকভাবে দুবাই ভারতের অংশ হয়নি। কিন্তু ভারতীয়দের সঙ্গে দুবাইয়ের সম্পর্ক আজও অত্যন্ত শক্তিশালী।
ব্যবসা, পর্যটন, বিমান যোগাযোগ, রিয়েল এস্টেট, শ্রমবাজার এবং বিনিয়োগ—বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
দুবাইয়ের জনজীবনেও ভারতীয় প্রবাসীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
অর্থাৎ ইতিহাস একসময় দুই অঞ্চলকে প্রশাসনিকভাবে কাছাকাছি এনেছিল। পরে রাজনৈতিকভাবে তারা আলাদা পথে চলে গেছে। কিন্তু সেই পুরনো বাণিজ্যিক ও সামাজিক যোগাযোগের অনেকটাই আজও টিকে আছে।
‘দুবাই ভারতের অংশ হতে পারত’—এই শিরোনাম নিঃসন্দেহে কৌতূহল তৈরি করে। কিন্তু ইতিহাসকে চমকপ্রদ করার জন্য তথ্যের সূক্ষ্ম পার্থক্য বাদ দেওয়া ঠিক নয়।
সত্য হলো, দুবাই ভারতের অংশ ছিল না। তবে ব্রিটিশ আমলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলগুলোর সঙ্গে ব্রিটিশ ভারতের প্রশাসনিক, রাজনৈতিক, সামরিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল গভীর। ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার সঙ্গে সেই পুরনো প্রশাসনিক কাঠামোর বড় পরিবর্তন ঘটে। ব্রিটিশ নথিতেও ভারতের গভর্নর-জেনারেলের আগে প্রয়োগ করা ক্ষমতাগুলো অন্যত্র স্থানান্তরের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে।
তারপর কয়েক দশকে উপসাগরীয় অঞ্চলগুলো নিজেদের আলাদা রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করে। তেল, বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের হাত ধরে সেই অঞ্চলগুলোর অর্থনৈতিক উত্থান ঘটে।
আর দুবাই?
একসময় যে শহরটি ছিল উপসাগরীয় বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, সেটিই পরবর্তীকালে বিশ্বের অন্যতম পরিচিত নগরীতে পরিণত হয়।
তাই দুবাইয়ের ইতিহাস শুধু ‘ভারতের অংশ হতে পারত কি না’—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এই ইতিহাস আমাদের দেখায়, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামো, ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা, উপসাগরীয় রাজনীতি এবং পরবর্তী তেলভিত্তিক অর্থনৈতিক উত্থান কীভাবে একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল।
ইতিহাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হয়তো এখানেই—একটি সিদ্ধান্ত শুধু একটি দেশের মানচিত্র বদলায় না; কখনও কখনও বদলে দেয় গোটা অঞ্চলের ভবিষ্যৎ।

