খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeস্পোটস ওয়ার্ল্ডফিফা বিশ্বকাপ স্পেশালএকের পর এক প্রতিপক্ষ গুঁড়িয়ে দিচ্ছে ফ্রান্স! এমবাপেদের এই দল কি বিশ্বকাপ...

একের পর এক প্রতিপক্ষ গুঁড়িয়ে দিচ্ছে ফ্রান্স! এমবাপেদের এই দল কি বিশ্বকাপ জিতেই ছাড়বে?

সুইডেন ম্যাচে তাঁর ভলি অল্পের জন্য গোল না হলেও সেটি ছিল ম্যাচের অন্যতম সেরা মুহূর্ত। পুরো ম্যাচে ৯৩ বার বল স্পর্শ করে তিনি প্রমাণ করেছেন, মাঠের প্রতিটি অংশে তাঁর উপস্থিতি ছিল।

ফুটবল বিশ্বকাপ যত এগোচ্ছে, ততই পরিষ্কার হচ্ছে একটি বিষয় বর্তমান টুর্নামেন্টে সবচেয়ে ধারাবাহিক, আক্রমণাত্মক এবং আত্মবিশ্বাসী দল ফ্রান্স। যেখানে একের পর এক শক্তিশালী দল ছোট প্রতিপক্ষের বিপক্ষে হোঁচট খাচ্ছে, সেখানে কিলিয়ান এমবাপের নেতৃত্বে ফরাসিরা প্রতিটি ম্যাচে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করছে। গোলের পর গোল, দুর্দান্ত পাসিং, গতিময় আক্রমণ এবং সংগঠিত রক্ষণ—সব মিলিয়ে এই দলকে হারানোর উপায় খুঁজে পাচ্ছে না প্রতিপক্ষরা।

২০১৮ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এবং ২০২২ সালের রানার্সআপ হিসেবে এবারও অন্যতম শিরোপাপ্রত্যাশী দল ছিল ফ্রান্স। সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে মাঠে। গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচেই জয় তুলে নিয়ে তারা নকআউটে পৌঁছেছে দারুণ আত্মবিশ্বাস নিয়ে।

শুধু জয় নয়, আক্রমণাত্মক ফুটবলেও অন্যদের ছাপিয়ে গেছে দিদিয়ের দেশঁর দল। গ্রুপ পর্বে সর্বাধিক ১০ গোল করে তারা বুঝিয়ে দিয়েছে, শিরোপা জয়ের লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নেমেছে ব্লু ব্রিগেড।

রাউন্ড অব ৩২-এ সুইডেনের বিপক্ষে ফ্রান্স যে আধিপত্য দেখিয়েছে, তা সাম্প্রতিক বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সুইডেনের দলে ইউরোপের শীর্ষ লিগে খেলা একাধিক ফুটবলার থাকলেও তারা কার্যত বলের দখলই রাখতে পারেনি। পুরো ম্যাচে ফ্রান্স গোলমুখে ২৫টি শট নেয়, যার মধ্যে ১২টি ছিল লক্ষ্যে। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে একের পর এক আক্রমণে ব্যতিব্যস্ত করে রাখেন এমবাপে, উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে এবং ব্র্যাডলি বার্কোলা।

এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে, শুধু জয় নয় সম্পূর্ণ আধিপত্য প্রতিষ্ঠাই এখন ফ্রান্সের লক্ষ্য।

বর্তমান ফরাসি দলের প্রাণভোমরা নিঃসন্দেহে কিলিয়ান এমবাপে। প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভাঙতে তাঁর গতি, ড্রিবলিং এবং গোল করার দক্ষতার তুলনা খুব কম ফুটবলারের মধ্যেই দেখা যায়।

সুইডেনের বিপক্ষে শুরুতেই পোস্টে শট লাগলেও আত্মবিশ্বাস হারাননি তিনি। পরে জোড়া গোল করে দলকে বড় জয় এনে দেন।

চলতি বিশ্বকাপে ইতোমধ্যেই ছয় গোল করে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে শীর্ষে উঠে এসেছেন এমবাপে। বিশ্বকাপে তাঁর মোট গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮, যা এসেছে মাত্র ১৮ ম্যাচে। ম্যাচপ্রতি একটি করে গোল করার এই ধারাবাহিকতা তাঁকে বর্তমান ফুটবলের অন্যতম ভয়ংকর ফরোয়ার্ডে পরিণত করেছে।

কোচ দিদিয়ের দেশঁর আস্থার প্রতিদান প্রতিটি ম্যাচেই দিচ্ছেন এমবাপে।

গোল করার দায়িত্ব যদি এমবাপের কাঁধে থাকে, তবে পুরো দলের আক্রমণ পরিচালনার মূল দায়িত্ব পালন করছেন মাইকেল ওলিসে।

মিডফিল্ড থেকে আক্রমণ গড়ে তোলা, ডান ও বাঁ প্রান্তে বল ছড়িয়ে দেওয়া, ফাঁকা জায়গা তৈরি করা কিংবা নিজেই গোলের সুযোগ তৈরি—সবক্ষেত্রেই অসাধারণ দক্ষতা দেখাচ্ছেন তিনি।

সুইডেন ম্যাচে তাঁর ভলি অল্পের জন্য গোল না হলেও সেটি ছিল ম্যাচের অন্যতম সেরা মুহূর্ত। পুরো ম্যাচে ৯৩ বার বল স্পর্শ করে তিনি প্রমাণ করেছেন, মাঠের প্রতিটি অংশে তাঁর উপস্থিতি ছিল।

ফরাসি কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরি পর্যন্ত মন্তব্য করেছেন, এমবাপে যদি দলের সবচেয়ে মূল্যবান ফুটবলার হন, তবে ওলিসেই দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়।

আধুনিক ফুটবলে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো শক্তিশালী মিডফিল্ড। সেই জায়গাতেই অন্যদের তুলনায় এগিয়ে ফ্রান্স।

মাইকেল ওলিসের পাশাপাশি ব্র্যাডলি বার্কোলা এবং ডেজিরে ডুয়ে অসাধারণ সমন্বয়ে খেলছেন। তিনজনই তরুণ, দ্রুতগতির এবং বল নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত দক্ষ।

বার্কোলার গতি প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের বারবার সমস্যায় ফেলছে। অন্যদিকে ডুয়ে মিডফিল্ডে ভারসাম্য বজায় রেখে আক্রমণ ও রক্ষণ—দুই দিকেই সমান অবদান রাখছেন।

কোচ দেশঁ এই তরুণ ত্রয়ীকেই দলের ভবিষ্যৎ এবং বর্তমান শক্তির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছেন।

ফ্রান্সের ফুটবলারদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো তাদের অবস্থান পরিবর্তনের ক্ষমতা।

একজন উইঙ্গার মাঝমাঠে চলে আসছেন, মিডফিল্ডার উঠে যাচ্ছেন আক্রমণে, আবার স্ট্রাইকার নেমে এসে বল বিলি করছেন। ফলে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা বুঝতেই পারছেন না কাকে মার্ক করবেন।

সুইডেনের তারকা ফুটবলার ভিক্টর গিওকেরেসও স্বীকার করেছেন, ফ্রান্সের ফুটবলাররা এত দ্রুত অবস্থান বদল করেন যে তাদের আটকানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

২০২২ বিশ্বকাপের পর হুগো লরিস, রাফায়েল ভারান, আঁতোয়ান গ্রিজম্যান এবং অলিভিয়ের জিরুর মতো অভিজ্ঞ ফুটবলাররা জাতীয় দল ছেড়েছেন।

তবে তাদের অনুপস্থিতি একটুও অনুভব করতে দিচ্ছে না নতুন প্রজন্ম। বরং তরুণদের গতি, উদ্যম এবং আত্মবিশ্বাস ফ্রান্সকে আরও গতিশীল করে তুলেছে।

দলটির বেঞ্চ শক্তিও অসাধারণ। ফলে প্রয়োজনে বদলি খেলোয়াড়রাও ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য রাখেন।

এই বিশ্বকাপই কোচ দিদিয়ের দেশঁর শেষ বড় টুর্নামেন্ট। অধিনায়ক এবং কোচ—দুই ভূমিকাতেই তিনি ফ্রান্সকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছেন।

বিশ্বকাপ চলাকালীন নিজের মাকে হারানোর কঠিন ব্যক্তিগত শোকের মধ্যেও তিনি দলের দায়িত্ব ছাড়েননি। শেষকৃত্য সম্পন্ন করে আবার দলের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন।

সুইডেনের বিপক্ষে গোল করার পর এমবাপের ছুটে গিয়ে দেশঁকে জড়িয়ে ধরা যেন প্রমাণ করে, এই দল শুধু দেশের জন্য নয়, তাদের কোচের জন্যও খেলছে।

ফ্রান্সের দাপুটে ফুটবল দেখে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন বহু কিংবদন্তি।

সুইডেনের কোচ গ্রাহাম পটার বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে এর চেয়ে ভালো দল তিনি দেখেননি।

১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপজয়ী প্যাট্রিক ভিয়েরা মনে করেন, বর্তমান ফ্রান্সের সঙ্গে তুলনা করা যায় শুধু তাঁদের বিশ্বজয়ী দলকেই।

অন্যদিকে ইংল্যান্ডের সাবেক তারকা ইয়ান রাইটের মতে, সাম্প্রতিক বিশ্বকাপে এতটা আধিপত্য বিস্তারকারী দল খুব কমই দেখা গেছে।

যদিও এখন পর্যন্ত ফ্রান্স তুলনামূলক সহজ প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলেছে। নকআউট পর্বে মরক্কো, এরপর সম্ভাব্যভাবে স্পেন, পর্তুগাল কিংবা ক্রোয়েশিয়ার মতো শক্তিশালী দলের মুখোমুখি হতে পারে তারা।

সেই ম্যাচগুলোই আসলে নির্ধারণ করবে, বর্তমান ছন্দ কতটা ধরে রাখতে পারে এমবাপেরা।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—যদি এই একই গতি, আত্মবিশ্বাস এবং দলগত সমন্বয় বজায় থাকে, তাহলে ফ্রান্সকে থামানো যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে।

বর্তমান বিশ্বকাপে ফ্রান্স শুধু জিতছে না, তারা আধুনিক ফুটবলের এক অনন্য উদাহরণও তৈরি করছে। এমবাপের বিস্ফোরক গতি, ওলিসের সৃজনশীলতা, তরুণ মিডফিল্ডের প্রাণশক্তি এবং দেশঁর কৌশলী নেতৃত্ব—সবকিছু মিলিয়ে ফ্রান্স এখন শিরোপার সবচেয়ে শক্তিশালী দাবিদার।

এখন ফুটবলপ্রেমীদের একটাই প্রশ্ন—এই দুর্দান্ত ছন্দে থাকা ফ্রান্সকে থামানোর মতো দল কি আদৌ আছে?