খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img

রোনালদোর ক্ষোভে মাঠ ছাড়া! ইংল্যান্ডের গোলবন্যা, ঘানার নাটকীয় জয়

বিশ্বকাপের শুরুতেই ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এসেছে রোমাঞ্চ, নাটকীয়তা আর চমক। একদিকে ইংল্যান্ড তাদের প্রথম ম্যাচেই শক্তিশালী ক্রোয়েশিয়াকে ৪-২ গোলে হারিয়ে দারুণ বার্তা দিয়েছে। অন্যদিকে ঘানা...
Homeস্পোটস ওয়ার্ল্ডবিশ্বকাপমার্কিন-বাংলাদেশ বাণিজ্যচুক্তি: কৃষক ও খামারিদের জন্য বড় সংকেত?

মার্কিন-বাংলাদেশ বাণিজ্যচুক্তি: কৃষক ও খামারিদের জন্য বড় সংকেত?

খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষিনীতি এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি (অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড-এআরটি) দেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্য খাতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে কৃষি খাতকে ঘিরে উদ্বেগ এখন সবচেয়ে বেশি। কারণ এই চুক্তির বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি এবং মার্কিন কৃষিপণ্যের জন্য বাংলাদেশের বাজার আরও উন্মুক্ত করার বিষয়টি।

অর্থনীতিবিদ ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্পমেয়াদে কিছু শিল্পখাত কাঁচামাল আমদানিতে সুবিধা পেলেও দীর্ঘমেয়াদে দেশের কৃষক, খামারি এবং কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষিনীতি এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশকে প্রতি বছর প্রায় ৩৫০ কোটি ডলার মূল্যের কৃষিপণ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় ৭ লাখ টন গম, ২৬ লাখ টনের বেশি সয়াবিন ও সয়াজাত পণ্য, ভুট্টা, তুলা, পশুখাদ্য এবং অন্যান্য কৃষিভিত্তিক কাঁচামাল।

এটি বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। এতদিন এসব পণ্য বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিযোগিতামূলক দামে আমদানি করা হতো। কিন্তু এখন নির্দিষ্ট উৎস থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য আমদানির বাধ্যবাধকতা দেশের আমদানি নীতির নমনীয়তা কমিয়ে দিতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য ওঠানামা যাই হোক না কেন, নির্ধারিত আমদানির চাপ বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলতে পারে।

বাংলাদেশের কৃষি খাত মূলত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ওপর নির্ভরশীল। দেশের প্রায় দেড় কোটির বেশি কৃষক পরিবার সীমিত জমি ও সীমিত পুঁজি নিয়ে কৃষি উৎপাদনে যুক্ত। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি ব্যবস্থা উন্নত প্রযুক্তি, বিশাল ভর্তুকি এবং বৃহৎ খামার ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

আরও পড়ুন :  ঈদযাত্রায় মাঝপথে বাড়তি ভাড়া আদায়ের চেষ্টা, কঠোর নজরদারিতে সরকার: সড়কমন্ত্রী

এই বাস্তবতায় মার্কিন কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম। ফলে শুল্ক হ্রাস বা শুল্কমুক্ত সুবিধা পেলে এসব পণ্য বাংলাদেশের বাজারে কম দামে প্রবেশ করবে। এতে দেশীয় কৃষকরা মূল্য প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবেন।

বিশেষ করে ভুট্টা, গম, সয়াবিন এবং পশুখাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে ভুট্টা চাষ দ্রুত বেড়েছে। মূলত পোলট্রি ও মৎস্য খাতের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে এই খাত বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু বিপুল পরিমাণ সস্তা মার্কিন ভুট্টা বাজারে এলে দেশীয় উৎপাদকদের উৎপাদন ব্যয় তোলা কঠিন হয়ে যেতে পারে।

এতে অনেক কৃষক ভুট্টা চাষ থেকে সরে যেতে পারেন, যা দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় উৎপাদন কমিয়ে দেবে।

চুক্তির ইতিবাচক দিকও রয়েছে। পোলট্রি, ডেইরি এবং মৎস্য খাতের জন্য পশুখাদ্যের কাঁচামাল যেমন সয়াবিন মিল, ডিডিজিএস, ভুট্টা সহজলভ্য হতে পারে। এতে খাদ্য উৎপাদন ব্যয় কিছুটা কমবে।

খামারিরা এতে কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন। তবে প্রশ্ন হলো, এই সুবিধা শেষ পর্যন্ত ভোক্তা ও ক্ষুদ্র উৎপাদকদের কাছে কতটা পৌঁছাবে।

কারণ বাজারে বড় ব্যবসায়ীরা অনেক সময় কম দামের সুবিধা নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেন।

বাংলাদেশ গত দুই দশকে খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। ধান উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পাশাপাশি ভুট্টা, মাছ, ডিম, পোলট্রি ও শাকসবজি উৎপাদনেও বড় অগ্রগতি হয়েছে।

কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমদানিনির্ভরতা বাড়লে এই অগ্রগতির ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

আরও পড়ুন :  মেসিকে স্পেনের জার্সিতে খেলানোর পরিকল্পনা! এক ভিডিও ক্যাসেট বদলে দিয়েছিল ফুটবল ইতিহাস

খাদ্য নিরাপত্তা শুধু বিদেশ থেকে খাদ্য কিনে আনার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না। বরং নিজের দেশের উৎপাদন ধরে রাখাই সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা।

যদি কৃষক উৎপাদনে আগ্রহ হারান, তাহলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে সংকট তৈরি হলে দেশকে বড় সমস্যায় পড়তে হতে পারে।

এই বাণিজ্যচুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কৃষি বায়োটেকনোলজি ও খাদ্য নিরাপত্তা মানদণ্ড। চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি (এসপিএস) মানদণ্ডকে বাংলাদেশকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

এর ফলে জেনেটিক্যালি মডিফায়েড বা জিএম ফসলের বাজার প্রবেশ আরও সহজ হতে পারে।

কৃষি বিজ্ঞানীদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার জরুরি হলেও জিএম খাদ্যের ক্ষেত্রে ভোক্তার জানার অধিকার, লেবেলিং ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যগত দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনায় রাখা জরুরি।

বাংলাদেশে এই বিষয়টি এখনো সংবেদনশীল এবং জনমত বিভক্ত।

শুধু কৃষকই নয়, কৃষিভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠানও এই চুক্তির প্রভাবে চাপে পড়তে পারে। দেশের ভোজ্যতেল, পশুখাদ্য, বীজ, কৃষি যন্ত্রপাতি ও কৃষিপ্রক্রিয়াজাত শিল্পে স্থানীয় বিনিয়োগ ক্রমেই বাড়ছে।

কিন্তু মার্কিন পণ্য সহজে বাজারে প্রবেশ করলে দেশীয় উদ্যোক্তারা কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়বেন।

যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো প্রযুক্তি ও মূলধনের দিক থেকে অনেক এগিয়ে। ফলে স্থানীয় বাজারে তাদের আধিপত্য বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

চুক্তির ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে কিছু ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে তুলা আমদানিতে সুবিধা পেলে উৎপাদন ব্যয় কমতে পারে।

এতে রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে।

একই সঙ্গে কৃষি প্রযুক্তি, উন্নত বীজ, গবেষণা সহযোগিতা এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাত প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগও বাড়তে পারে।

আরও পড়ুন :  মেসির শেষ বিশ্বকাপের লড়াই: আর্জেন্টিনার আশার প্রতীক কি এখনও ‘মেসি ও আরও ১০ জন’?

সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার সতর্ক করে বলেছেন, মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্যের আমদানি সহজ হলে দেশের লাখ লাখ খামারি বড় ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।

বাংলাদেশে গরু-ছাগল পালন, দুধ ও মাংস উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি দুই কোটির বেশি মানুষ জড়িত। কম দামে মার্কিন মাংস বাজারে এলে দেশীয় খামারিরা অসম প্রতিযোগিতায় পড়ে যাবেন।

এছাড়া আমদানিকৃত প্রাণিজ পণ্যের মাধ্যমে সংক্রামক ও জুনোটিক রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

তার মতে, খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে বাংলাদেশকে নিজস্ব পরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বজায় রাখতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো— কৃষকের স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত থাকবে।

বাংলাদেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষের জীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে জড়িত। তাই কৃষি খাত শুধু অর্থনীতির অংশ নয়, এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হচ্ছে, কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানো, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থা উন্নত করা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সুরক্ষামূলক নীতি অব্যাহত রাখা জরুরি।

সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই বাণিজ্যচুক্তি বাংলাদেশের জন্য যেমন নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি বড় চ্যালেঞ্জও নিয়ে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, সরকার কীভাবে জাতীয় স্বার্থ, কৃষকের ন্যায্যমূল্য এবং খাদ্য নিরাপত্তার ভারসাম্য বজায় রাখে।


Discover more from News Bangla24x7

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Table of contents [hide]

আর্কাইভ