বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে উঠেই অনেকের ধারণা ছিল, ইংল্যান্ডের সামনে অপেক্ষা করছে তুলনামূলক সহজ এক প্রতিপক্ষ। কারণ প্রতিপক্ষের নাম ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো (ডিআর কঙ্গো)। তবে বাস্তবতা বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। আফ্রিকার এই দলটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিজেদের শক্তিশালী ও সংগঠিত দল হিসেবে গড়ে তুলেছে। শক্ত রক্ষণ, দ্রুত পাল্টা আক্রমণ এবং ইউরোপের বড় বড় লিগে খেলা একাধিক ফুটবলারের উপস্থিতি ইংল্যান্ডের জন্য ম্যাচটিকে কঠিন করে তুলতে পারে।
বিশ্বকাপের এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তাই ইংল্যান্ডকে শতভাগ মনোযোগী থাকতে হবে। ডিআর কঙ্গোকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
ডিআর কঙ্গোকে অনেকে নতুন শক্তি মনে করলেও আফ্রিকান ফুটবলে তাদের ইতিহাস বেশ গৌরবময়। জায়ের নামে তারা দুইবার আফ্রিকা কাপ অব নেশনস জিতেছে। এছাড়া সাব-সাহারান আফ্রিকার প্রথম দেশ হিসেবে বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতাও অর্জন করেছিল।
বর্তমান দলটি অতীতের ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক ফুটবলের সমন্বয় ঘটিয়ে এগিয়ে চলেছে। ফিফা র্যাঙ্কিংয়েও তারা ৪১ নম্বরে অবস্থান করছে, যা স্কটল্যান্ডের থেকেও এক ধাপ এগিয়ে। সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিক ভালো পারফরম্যান্স তাদের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ডিআর কঙ্গোর সাম্প্রতিক ফলাফল দেখলেই বোঝা যায়, তারা বড় দলগুলোর জন্য কতটা কঠিন প্রতিপক্ষ।
বিশ্বকাপে তারা পর্তুগালের সঙ্গে ড্র করেছে। আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে সেনেগালকে হারিয়েছে। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে নাইজেরিয়া ও ক্যামেরুনের মতো শক্তিশালী দলকে পরাজিত করেছে। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে ডেনমার্কের বিপক্ষেও গোলশূন্য ড্র করেছে।
সব মিলিয়ে ধারাবাহিকভাবে বড় দলের বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ফুটবল খেলেই নকআউটে নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করেছে তারা।
ফরাসি কোচ সেবাস্তিয়ান দেসাব্রের অধীনে ডিআর কঙ্গো একটি অত্যন্ত শৃঙ্খলাবদ্ধ দল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। তার ফুটবল দর্শনের মূল ভিত্তি শক্তিশালী রক্ষণ।
দেসাব্রে নিজেই বলেছেন, “দৃঢ় রক্ষণই আমাদের দলের ভিত্তি।”
গত বছরের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে দলটি ১৬টি ম্যাচ খেলেছে। এর মধ্যে মাত্র একবার তারা এক ম্যাচে একাধিক গোল হজম করেছে। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় প্রতিপক্ষের জন্য তাদের রক্ষণ ভাঙা কতটা কঠিন।
বল দখলে না থাকলে পুরো দল নিচে নেমে রক্ষণ সামলায়। আর বল পেলেই দ্রুত পাল্টা আক্রমণে উঠে আসে। এই কৌশলই তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
ডিআর কঙ্গোর স্কোয়াডে এমন অনেক ফুটবলার আছেন, যারা ইউরোপের বড় বড় ক্লাবে খেলেন।
আক্রমণের নেতৃত্বে রয়েছেন ইয়োয়ানে উইসা। ক্লাব ফুটবলে নিজের গতি, পরিশ্রম ও গোল করার দক্ষতার জন্য পরিচিত এই ফরোয়ার্ড বিশ্বকাপেও দারুণ ছন্দে রয়েছেন। ইতোমধ্যে তিনি তিনটি গোল করেছেন।
মিডফিল্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন নোয়া সিদিকি। তার পরিশ্রম ও বল নিয়ন্ত্রণ দলের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করছে।
রক্ষণভাগেও রয়েছে অভিজ্ঞতার ছাপ। সাবেক ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ডিফেন্ডার অ্যারন ওয়ান-বিসাকা এবং অ্যাক্সেল তুয়ানজেবে দলের অন্যতম ভরসা। একসময় ৫০ মিলিয়ন পাউন্ড ট্রান্সফার ফিতে ওয়ান-বিসাকাকে দলে নিয়েছিল ইউনাইটেড।
এছাড়া ডিফেন্সে আছেন চ্যান্সেল এমবেম্বা এবং আর্থার মাসুয়াকুর মতো অভিজ্ঞ ফুটবলাররা, যারা ইউরোপীয় ফুটবলে দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের প্রমাণ করেছেন।
ডিআর কঙ্গোর কোচ সেবাস্তিয়ান দেসাব্রের জীবন কাহিনিও বেশ ব্যতিক্রমী।
ফুটবলে পুরোপুরি যুক্ত হওয়ার আগে তিনি ফ্রান্সে ফুলের ব্যবসা করতেন। সেই কারণেই তার ডাকনাম হয়ে যায় “দ্য ফ্লোরিস্ট”।
তবে মাঠে তিনি একেবারেই ভিন্ন চরিত্রের। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের ক্লাব ও জাতীয় দলের সঙ্গে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। সেই অভিজ্ঞতাই কাজে লাগিয়ে ডিআর কঙ্গোকে তিনি একটি সুশৃঙ্খল ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দলে পরিণত করেছেন।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে খেলোয়াড়দের উদ্দেশে অনুপ্রেরণামূলক বার্তা দিয়েছেন ডিআর কঙ্গোর প্রেসিডেন্ট ফেলিক্স শিসেকেদি।
তিনি খেলোয়াড়দের শৃঙ্খলা, সাহস, বুদ্ধিমত্তা ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে মাঠে নামার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে পুরো দেশ যে দলের পাশে রয়েছে, সেই বার্তাও পৌঁছে দেন।
এ ধরনের সমর্থন খেলোয়াড়দের মানসিকভাবে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে।
ডিআর কঙ্গোর সবচেয়ে পরিচিত সমর্থকদের একজন মিশেল এনকুকা এমবোলাডিঙ্গা। দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী প্যাট্রিস লুমুম্বাকে সম্মান জানিয়ে তার বিশেষ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিত।
তবে এবার যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি না পাওয়ায় তিনি দলের খেলা সরাসরি দেখতে পারেননি। ফলে গ্যালারিতে তার উপস্থিতি থাকছে না।
কাগজে-কলমে ইংল্যান্ড শক্তিশালী দল হলেও মাঠের লড়াই এত সহজ হবে না।
ডিআর কঙ্গো শুরু থেকেই রক্ষণ শক্ত করে খেলবে এবং সুযোগ পেলেই দ্রুত আক্রমণে যাবে। ফলে ইংল্যান্ডকে ধৈর্য ধরে খেলতে হবে এবং খুব কম সুযোগ থেকেই গোল বের করার চেষ্টা করতে হবে।
তবে ম্যাচ যত গড়াবে, গোলের খোঁজে ডিআর কঙ্গোকেও সামনে উঠে আসতে হবে। তখনই ইংল্যান্ডের দ্রুতগতির আক্রমণভাগ আরও বেশি জায়গা পেতে পারে।
ডিআর কঙ্গোকে দুর্বল প্রতিপক্ষ ভাবার সুযোগ নেই। সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স, শক্তিশালী রক্ষণ, ইউরোপে খেলা অভিজ্ঞ ফুটবলার এবং কৌশলী কোচ—সব মিলিয়ে তারা এখন একটি পরিণত দল।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ছোট কোনো দল বলে কিছু থাকে না। তাই ইংল্যান্ড যদি পরের রাউন্ডে যেতে চায়, তবে তাদের সেরাটা খেলতেই হবে। অন্যদিকে ডিআর কঙ্গো আরেকটি অঘটন ঘটিয়ে বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন নিয়েই মাঠে নামবে।


