খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeএক্সক্লুসিভ১৬২ বছর সমুদ্রের তলায়! জাহাজ থেকে উদ্ধার পুরনো Guinness-এর বোতল, এখনও কি...

১৬২ বছর সমুদ্রের তলায়! জাহাজ থেকে উদ্ধার পুরনো Guinness-এর বোতল, এখনও কি পানযোগ্য?

স্টেফান পানিস পেশায় একজন ফটোগ্রাফার। তবে তাঁর কাজের জায়গা সাধারণ কোনো স্টুডিও বা শহরের রাস্তা নয়। তিনি পানির নিচের ছবি তুলতে বিশেষভাবে দক্ষ। সমুদ্রের তলদেশে ডুবে থাকা জাহাজ এবং ঐতিহাসিক নিদর্শন খুঁজে বের করাও তাঁর আগ্রহের অন্যতম বিষয়।

সমুদ্রের অন্ধকার তলদেশে একটি ডুবে যাওয়া জাহাজ। তার ভেতরে বছরের পর বছর ধরে পড়ে থাকা একটি পুরনো কাচের বোতল। বোতলটি তুলে পরিষ্কার করতেই দেখা গেল পরিচিত একটি নাম—Guinness। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হলো, বোতলটির বয়স প্রায় ১৬২ বছর।

বেলজিয়ামের আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফার স্টেফান পানিস ইংলিশ চ্যানেলে ডুবে থাকা একটি জাহাজের ধ্বংসাবশেষ থেকে এই বোতল উদ্ধার করেন। সেটি ১৮৬৪ সালের বলে ধারণা করা হচ্ছে। এখন গবেষকরা বোতলের ভেতরের তরল পরীক্ষা করছেন। সবচেয়ে চমকপ্রদ প্রশ্ন হলো, ১৬২ বছর সমুদ্রের তলায় থাকার পরও কি ওই তরল পানযোগ্য থাকতে পারে?

গবেষকদের কাছে বিষয়টি শুধু পুরনো একটি পানীয় উদ্ধারের ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ১৯ শতকের পানীয় তৈরির প্রযুক্তি, পুরনো খামিরের জেনেটিক তথ্য এবং বিখ্যাত Guinness-এর ইতিহাস জানার বিরল সুযোগ।

স্টেফান পানিস পেশায় একজন ফটোগ্রাফার। তবে তাঁর কাজের জায়গা সাধারণ কোনো স্টুডিও বা শহরের রাস্তা নয়। তিনি পানির নিচের ছবি তুলতে বিশেষভাবে দক্ষ। সমুদ্রের তলদেশে ডুবে থাকা জাহাজ এবং ঐতিহাসিক নিদর্শন খুঁজে বের করাও তাঁর আগ্রহের অন্যতম বিষয়।

ইংলিশ চ্যানেলে ডাইভিং করার সময় তিনি ডুবে থাকা Mindoro নামের একটি জাহাজের ধ্বংসাবশেষে পৌঁছান। সেখানেই তাঁর চোখে পড়ে একটি পুরনো কাচের বোতল।

বোতলটি জাহাজের কার্গোর অংশে ছিল। পানিস সেটি তুলে পানির ওপরে নিয়ে আসেন। বোতলটির গায়ে দীর্ঘদিনের ময়লা ও সামুদ্রিক আস্তরণ জমে থাকায় প্রথমে সেটির পরিচয় বোঝা যাচ্ছিল না।

পরে বোতলটি পরিষ্কার করার পর দৃশ্যমান হয়ে ওঠে লেখা “Guinness Extra Stout London”। তখনই বোতলটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে যায়।

যে জাহাজের ধ্বংসাবশেষ থেকে বোতলটি পাওয়া গেছে, সেটি ১৮৬৪ সালে ডুবে যায়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, Mindoro ১৮৬৪ সালের ২৭ নভেম্বর ডোভারের উপকূল থেকে প্রায় তিন মাইল দূরে অন্য একটি জাহাজের সঙ্গে সংঘর্ষে ডুবে যায়। জাহাজটি লন্ডন থেকে ভ্যাঙ্কুভারের দিকে যাত্রা করছিল।

অর্থাৎ জাহাজটি যখন সমুদ্রের তলায় চলে যায়, তখন বোতলটির বয়সও ছিল প্রায় সেই সময়ের। সেই হিসেবে ২০২৬ সালে উদ্ধার করা বোতলটির বয়স দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১৬২ বছর।

এত দীর্ঘ সময় সমুদ্রের তলায় থাকার পরও বোতলটির কাচ এবং ভেতরের তরল সংরক্ষিত থাকার বিষয়টি গবেষকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

বেলজিয়ামের গবেষকরা বোতলের ভেতরের নমুনা পরীক্ষা করছেন। প্রাথমিকভাবে পানযোগ্য থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না। তবে এখনই কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারছেন না যে এটি নিরাপদে পান করা যাবে।

মূল উদ্বেগের জায়গা হলো বোতলের মুখে থাকা পুরনো কর্ক।

ডুবুরি স্টেফান পানিসের বক্তব্য অনুযায়ী, যদি সমুদ্রের পানি কর্কের ভেতর দিয়ে বোতলে প্রবেশ না করে থাকে, তাহলে পানীয়টি এত বছর পরও সংরক্ষিত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই সম্ভাবনা নিশ্চিত করতে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা প্রয়োজন।

অর্থাৎ ‘১৬২ বছর পরও পানযোগ্য’ এখনও এটি চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত নয়। বরং গবেষকদের হাতে থাকা একটি সম্ভাবনা।

এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সমুদ্রের তলায় কোনো বোতল অক্ষত অবস্থায় থাকা আর তার ভেতরের পানীয় মানুষের পান করার জন্য নিরাপদ থাকা দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।

সমুদ্রের তলায় থাকা সাধারণত কোনো পানীয় সংরক্ষণের আদর্শ পদ্ধতি নয়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ পরিস্থিতি বোতলটির ভেতরের তরলকে দীর্ঘদিন তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে থাকতে পারে।

প্রথমত, বোতলটি ছিল মোটা কাচের তৈরি। ফলে বাইরের চাপ ও পরিবেশের প্রভাব থেকে এটি কিছুটা সুরক্ষা পেয়েছে।

দ্বিতীয়ত, বোতলটি জাহাজের কার্গোর মধ্যে ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে এটি সরাসরি আলো থেকে দূরে ছিল।

তৃতীয়ত, বোতলের মুখ কর্ক দিয়ে বন্ধ করা ছিল। যদি সেই সিল দীর্ঘদিন কার্যকর থেকে থাকে এবং সমুদ্রের পানি ভেতরে ঢুকতে না পারে, তাহলে বাইরের পরিবেশের সঙ্গে তরলের সরাসরি যোগাযোগ অনেকটাই কমে যায়।

এই কারণগুলোই গবেষকদের আশাবাদী করছে। তবে বোতলের ভেতরের রাসায়নিক ও জীবাণুবৈজ্ঞানিক অবস্থা পরীক্ষা না করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়।

১৬২ বছরের পুরনো Guinness-এর এই বোতলের মূল্য শুধু একটি প্রাচীন পানীয় হিসেবে নয়।

গবেষকদের অন্যতম আগ্রহ হলো বোতলের ভেতরে থাকা অণুজীব এবং খামিরের জেনেটিক উপাদান পরীক্ষা করা।

নমুনা পাঠানো হয়েছে বেলজিয়ামের KU Leuven বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজিস্টদের কাছে। গবেষকদের আশা, পুরনো পানীয়ের মধ্যে সংরক্ষিত জেনেটিক উপাদান থেকে ১৯ শতকের Guinness তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

যদি পর্যাপ্ত DNA উদ্ধার করা সম্ভব হয়, তাহলে গবেষকরা ভবিষ্যতে ১৮৬০-এর দশকের Guinness-এর কাছাকাছি একটি পানীয় পুনরায় তৈরি করার চেষ্টা করতে পারেন।

এটি হলে আবিষ্কারটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

কারণ তখন গবেষকরা শুধু পুরনো একটি বোতল সংরক্ষণ করবেন না; বরং ১৬২ বছর আগের একটি পানীয়ের স্বাদ ও তৈরির পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করতে পারবেন।

স্টেফান পানিস জানিয়েছেন, গবেষকরা যদি পুরনো খামিরের যথেষ্ট জেনেটিক তথ্য উদ্ধার করতে পারেন, তাহলে একটি ছোট পরিমাণের ‘রিব্রু’ বা পুনরায় তৈরি করা পানীয় বানানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

ভাবুন, ১৮৬৪ সালে যে ধরনের Guinness তৈরি করা হয়েছিল, তার কাছাকাছি একটি পানীয় আধুনিক সময়ে আবার তৈরি করা হলো।

এটি পানীয় শিল্পের ইতিহাসের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় একটি পরীক্ষা হতে পারে।

তবে এটিও এখনো পরিকল্পনার পর্যায়ে। গবেষণার ফলাফল কী আসে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে।

সম্ভবত না।

ডুবুরি পানিসের ধারণা, জাহাজের ধ্বংসাবশেষে আরও বোতল থাকতে পারে। যে কাঠের বাক্সের মধ্যে বোতলগুলো রাখা ছিল, সেটির আকার দেখে তাঁর ধারণা, সেখানে সম্ভবত প্রায় ২৪টি বোতল থাকতে পারে। এমনকি একই জাহাজে একাধিক বাক্সও থাকতে পারে বলে তিনি মনে করছেন।

যদি সত্যিই আরও বোতল পাওয়া যায়, তাহলে গবেষকদের হাতে আরও বেশি নমুনা আসবে।

একটি বোতলের ক্ষেত্রে যে প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া কঠিন, একাধিক বোতল পরীক্ষা করলে সেগুলোর তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে।

কোন বোতলের কর্ক ভালো ছিল, কোনটিতে সমুদ্রের পানি ঢুকেছিল, কোথায় পানীয়ের রাসায়নিক পরিবর্তন হয়েছে—এসবও তখন বোঝা যেতে পারে।

এই আবিষ্কারের খবর Guinness-এর মালিক প্রতিষ্ঠান Diageo-এর কাছেও পৌঁছেছে।

কোম্পানিটির আর্কাইভ টিম ডুবুরিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং আবিষ্কারটির বিষয়ে আরও তথ্য সংগ্রহ করছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এ ধরনের আবিষ্কার তাদের ব্র্যান্ডের অতীত ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

Guinness-এর ইতিহাস ১৮ শতক পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে ১৮৬৪ সালের একটি আসল বোতল গবেষণার জন্য পাওয়া গেলে সেটি ব্র্যান্ডটির ঐতিহাসিক বিবরণ বোঝার ক্ষেত্রেও বিশেষ মূল্য বহন করে।

সমুদ্রের তলায় দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষিত পানীয় নিয়ে এর আগেও গবেষকদের আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে পুরনো জাহাজডুবির স্থান থেকে উদ্ধার হওয়া মদ বা বিয়ার কখনও কখনও ঐতিহাসিক পানীয় তৈরির পদ্ধতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে।

তবে কোনো বোতল অক্ষত দেখালেই তার ভেতরের তরল পানযোগ্য এমন ধারণা করা নিরাপদ নয়। পুরনো পানীয়ের ক্ষেত্রে রাসায়নিক পরিবর্তন, জীবাণু, বোতলের সিল এবং পরিবেশগত দূষণ—সবকিছু পরীক্ষা করতে হয়।

তাই ১৬২ বছরের পুরনো Guinness-এর ক্ষেত্রেও গবেষকদের পরীক্ষার ফলই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আবিষ্কারক নিজেও জানিয়েছেন, তিনি চূড়ান্ত পরীক্ষার ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করবেন।

যদি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে পানীয়টি নিরাপদ, তবেই তিনি সেটির স্বাদ নেওয়ার কথা বিবেচনা করবেন।

অর্থাৎ কৌতূহল থাকলেও তিনি সরাসরি বোতল খুলে পান করার ঝুঁকি নিচ্ছেন না।

এটাই স্বাভাবিক। ১৬২ বছর ধরে সমুদ্রের তলায় থাকা কোনো পানীয়কে শুধু বোতল অক্ষত দেখে পান করা বৈজ্ঞানিকভাবে নিরাপদ সিদ্ধান্ত নয়।

এই আবিষ্কারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক সম্ভবত এখানেই।

একটি বোতল ১৮৬৪ সালের একটি সময়কে বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছে। বোতলটি যখন তৈরি হয়েছিল, তখন পৃথিবীর প্রযুক্তি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিল্প এবং পানীয় তৈরির পদ্ধতি আজকের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল।

তারপর একটি জাহাজ সমুদ্রের তলায় চলে গেল। সময় পেরিয়ে গেল এক শতাব্দীরও বেশি। মানুষ বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, বিশ্ব বদলেছে। কিন্তু সমুদ্রের অন্ধকারে একটি কাচের বোতল পড়ে রইল।

শেষ পর্যন্ত একজন ডুবুরি সেটি তুলে আনলেন।

এখন সেই বোতল গবেষকদের সামনে একটি প্রশ্ন রেখে দিয়েছে ১৮৬৪ সালের Guinness-এর ভেতরে আসলে কী ছিল, আর এত বছর পর তার কতটা এখনও টিকে আছে?

উত্তর মিলবে পরীক্ষাগারে।

আর যদি পুরনো খামিরের DNA সত্যিই উদ্ধার করা যায়, তাহলে হয়তো ১৬২ বছর আগের Guinness-এর স্বাদও আধুনিক সময়ে নতুন করে ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হবে।

তবে আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই আবিষ্কারকে শুধুই ‘পুরনো বিয়ারের বোতল’ হিসেবে না দেখে একটি ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক নিদর্শন হিসেবে পরীক্ষা করা। কারণ এর ভেতরে হয়তো লুকিয়ে আছে ১৯ শতকের পানীয় তৈরির এমন তথ্য, যা আজকের গবেষকদের জন্য অমূল্য।

আর্কাইভ