ইসরায়েলের জন্য বরাদ্দকৃত ৩৩০ কোটি ডলারের মার্কিন সহায়তা বাতিলের প্রস্তাব ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ডেমোক্র্যাট পার্টির ভেতর এই ইস্যুতে গভীর মতপার্থক্য সামনে এসেছে। দলটির প্রগতিশীল ও মধ্যপন্থী নেতাদের মধ্যে প্রকাশ্যে বিভাজন দেখা যাচ্ছে, যা আসন্ন ভোটকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
সম্প্রতি একটি অভ্যন্তরীণ রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ডেমোক্র্যাট নেতৃত্ব দলের সদস্যদের ব্যক্তিগত বিবেচনা ও নৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, বিষয়টি নিয়ে দলীয় অবস্থান এখনো পুরোপুরি একমত নয়।
এই প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হলো ইসরায়েলের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সামরিক ও মানবিক সহায়তার ধারা বন্ধ করা। প্রস্তাবটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের আলোচনা শুরু হয়েছে।
সমালোচকদের মতে, গাজায় চলমান মানবিক সংকট এবং ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের এই অর্থায়ন পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাদের দাবি, মার্কিন করদাতাদের অর্থ যুদ্ধ নয়, বরং শান্তি প্রতিষ্ঠায় ব্যয় হওয়া উচিত।
অন্যদিকে সমর্থকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান মিত্র ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। তাই এই সহায়তা বন্ধ করা হলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
মার্কিন কংগ্রেসের অভিজ্ঞ সদস্য বেনি থম্পসন বলেছেন, ইসরায়েলকে ঘিরে এমন উত্তপ্ত ও নজিরবিহীন বিতর্ক তিনি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে খুব কমই দেখেছেন।
তার এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট, ডেমোক্র্যাট পার্টির অভ্যন্তরে বিষয়টি শুধু নীতিগত নয়, রাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।
আইনপ্রণেতা রাশিদা তলাইব জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহেই প্রতিনিধি পরিষদে এই প্রস্তাবের ওপর ভোট হতে পারে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ডেমোক্র্যাটদের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি এবং রিপাবলিকানদের বিরোধিতার কারণে বিলটি পাস হওয়ার সম্ভাবনা কম।
ডেমোক্র্যাট পার্টির প্রগতিশীল অংশের নেতারা এই বিলের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন। বিশেষ করে আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-করতেজ এবং রাশিদা তলাইব প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন।
তাদের মতে, ইসরায়েলকে দেওয়া এই বিপুল সহায়তা বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি। তারা বিশ্বাস করেন, যুক্তরাষ্ট্রকে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক ন্যায়ের প্রশ্নে আরও কঠোর অবস্থান নিতে হবে।
এই অবস্থান তরুণ ভোটারদের মধ্যেও বেশ সমর্থন পাচ্ছে, যা আগামী নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
ডেমোক্র্যাটদের মধ্যপন্থী অংশ এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির শীর্ষ সদস্য গ্রেগ মিকস স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তিনি বিলটির বিরুদ্ধে ভোট দেবেন।
তার মতে, ইসরায়েলকে প্রয়োজনীয় সামরিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত করা হলে তা দেশটির নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হবে।
একইভাবে হাউস আর্মড সার্ভিসেস কমিটির প্রধান ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি অ্যাডাম স্মিথও বিলটির বিরোধিতা করেছেন। তিনি বলেছেন, এই প্রস্তাব পাস হলে শুধু সামরিক সহায়তা নয়, মানবিক অনুদানও বন্ধ হয়ে যাবে। এটি বাস্তবসম্মত নয় এবং কৌশলগতভাবে ক্ষতিকর হতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতিনিধি পরিষদে এই বিলের চূড়ান্ত ভোট শুধু ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নয়, বরং ডেমোক্র্যাট পার্টির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনাও নির্ধারণ করতে পারে।
একদিকে প্রগতিশীলরা মানবাধিকারের প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নিতে চাইছে, অন্যদিকে মধ্যপন্থীরা কৌশলগত জোট বজায় রাখাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
এই ভোটের ফলাফল হয়তো সরাসরি সহায়তা বাতিল করবে না, কিন্তু এটি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের বার্তা দেবে।
দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় মিত্র। প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়ে আসছে ওয়াশিংটন। তবে বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এই সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই বিতর্ক আরও গভীর হয়, তাহলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
সব মিলিয়ে, ৩৩০ কোটি ডলারের এই সহায়তা নিয়ে বিতর্ক শুধু অর্থের প্রশ্ন নয়; এটি মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বড় পরীক্ষাও হয়ে উঠেছে।
সূত্র: আল জাজিরা

